পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ কি সমস্যার সমাধান দেবে

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পপ্রণেতারা দাবি করছেন যে এর ফলে গঙ্গানির্ভর এলাকার বিপুল উন্নতি ঘটবে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে সব পানি উন্নয়ন প্রকল্পের এ ধরনের বিপুল সাফল্যের দাবির কথা আমরা শুনে আসছি। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন নজরুল ইসলাম। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব

প্রতীকী ছবি

বিভিন্ন সূত্রে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হবে। এর মোট দৈর্ঘ্য হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এর মধ্যে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে (পানি নির্গমনের কপাট, প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১৮ মিটার ও প্রস্থ ১২ মিটার) এবং ১৮টি তলদেশ নির্গমনস্থল (আন্ডারস্লুইস, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১৮ মিটার ও  প্রস্থ ১৪ দশমিক ৫ মিটার)। এ ছাড়া থাকবে দুটি ফিশ পাস (মাছের যাত্রাপথ)।

ধারণা করা হচ্ছে, এই ব্যারাজের ফলে পানখা (বাংলাদেশের যে সীমান্তবিন্দু দিয়ে গঙ্গা ভারত থেকে প্রবেশ করে) থেকে পাংশা পর্যন্ত গঙ্গার পানির উচ্চতা প্রায় ১২ মিটার রাখা হবে এবং সঞ্চিত পানির পরিমাণ হবে ২৯০ কোটি ঘনমিটার। এই পানি দ্বারা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এর মধ্যে গড়াই-মধুমতীতে ৭৬০০ কিউমেক (ঘনমিটার/সেকেন্ড) এবং চন্দনা ও হিসনাতে ৩০০ কিউমেক করে পানি প্রবাহিত করা হবে। এ জন্য এসব নদীর মুখে ‘অফটেক’ (গ্রহণ) কাঠামো নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে সময় লাগবে সাত বছর (২০২৬-২০৩৩)।

আরও পড়ুন

২.

২০১৬ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা মূলত ব্যারাজের ফলে কী উপকার হতে পারে সেগুলোর ওপর মনোযোগ দিয়েছে। পক্ষান্তরে এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াগুলো হয় লঘু করে দেখা হয়েছে, কিংবা একেবারেই অগ্রাহ্য করা হয়েছে; যেমন ব্যারাজের কারণে উজানে পলিপতনের সমস্যা।

সমীক্ষায় বলা হয়, বছরের ৯ মাস যখন পানি সঞ্চিত রাখার জন্য ব্যারাজের বেশির ভাগ কপাট বন্ধ রাখা হবে, তখন সারা বছরের মাত্র ১৫ শতাংশ পলিবালুর আগমন ঘটবে। ফলে ব্যারাজের কারণে উজানে পলিপতন বেশি হবে না এবং ৬০ বছরে নদীতল মাত্র ৩ দশমিক ২৮ ফুট বৃদ্ধি পাবে।

প্রথমত, এই দাবি ফারাক্কার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফারাক্কার ক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণা দেখায়, গত ৫২ বছরে ফারাক্কার উজানে কোথাও কোথাও নদীতলের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, হতে পারে যে প্রস্তাবিত ব্যারাজে ১৮টি তলদেশ নির্গমনস্থলের সংযোজন পলির নিষ্কাশনের বিষয়ে সমীক্ষাপ্রণেতাদের বেশি আশাবাদী করে তুলেছে। লক্ষণীয়, প্রতিটি ১৮X১৪.৫ মিটার আকৃতির হওয়ায় তলদেশ নির্গমনস্থলের মোট প্রশস্ততা হবে ২৬১ মিটার, যা ব্যারাজের মোট দৈর্ঘ্যের (২১০০ মিটার) মাত্র এক-অষ্টমাংশ।

আরও পড়ুন

তদুপরি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে কাগজপত্রের হিসাব বাস্তবে মোটেও টেকে না। ফলে এই নির্গমনস্থলগুলোরও দ্রুতই পলিবালু দ্বারা রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। পানির নিচে হওয়ার কারণে এসব রুদ্ধ হওয়া নির্গমন পথ পরিষ্কার করাও কঠিন হবে।

সুতরাং, উজানে স্বল্প পলিপতন সম্পর্কে সমীক্ষায় প্রকাশিত আশাবাদ সত্য প্রমাণিত না–ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে উজানে পলিপতন অনুমিত পরিমাণের চেয়ে বেশি হবে; গঙ্গার তলদেশ ক্রমাগত ভরাট হবে এবং বন্যা ও পাড়ভাঙনের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে ভাটিতে পানিতে পলির পরিমাণ কম হওয়ায় নদী তার পলিসংক্রান্ত ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার জন্য আরও বেশি হারে পাড় ভাঙবে। ফলে ব্যারাজের উজান ও ভাটি উভয় স্থানেই পাড়ভাঙন বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভাটিতে পানির প্রবাহ হ্রাসের বিপদ। লক্ষণীয়, ভাটিতে পলির হ্রাস নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও পানির হ্রাস সম্পর্কে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই। কারণ, উজানে যতটুকু পানি গঙ্গার শাখা নদীগুলোর জন্য অপসারিত হবে, ভাটিতে গঙ্গার শাখা ও পদ্মায় ঠিক ততটুকু পরিমাণেই পানি হ্রাস পাবে। বাংলাদেশের জন্য এটা ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘জিরো সাম গেম’। অর্থাৎ উজানে এবং ভাটিতে পানির বিতরণ ভিন্ন করা যেতে পারে; কিন্তু পানির মোট পরিমাণের কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বস্তুত, সম্ভাব্যতা সমীক্ষাই এ বিষয়টি বেশ স্পষ্ট করে। সেখানে দেখা যায়, পাংশা পর্যন্ত ব্যারাজের কারণে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ১২ মিটার হবে। কিন্তু পাংশার পরই এই উচ্চতা বছরের বিভিন্ন মাসভেদে মাত্র ১ থেকে ৫ মিটারে নেমে আসবে। বলা বাহুল্য, এর প্রকট নেতিবাচক অভিঘাত হবে। অথচ পাংশার ভাটিতে প্রস্তাবিত ব্যারাজের কী অভিঘাত হবে, সে বিষয়ে সমীক্ষায় একটি বাক্যও চোখে পড়ে না। যেন পদ্মা নদী পাংশাতেই শেষ!

৩.

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পাউবোর এই মনোভাব বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাবের অনুরূপ। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি ভারতের অনেকের মনোভাব এমন যে গঙ্গা ফারাক্কাতেই শেষ। ভারতীয়দের এই মনোভাবের পেছনে একটা যুক্তি থাকতে পারে—কারণ, বাংলাদেশের ওপর ফারাক্কার কী অভিঘাত হচ্ছে, সেটা নিয়ে তারা অতটা ভাবিত নয়। ভারতের জন্য এটা ‘পজিটিভ সাম গেম’—যতটুকু পানি অপসারিত করতে পারে ততটুকুই তাদের লাভ; হারাবার কিছু নেই। কিন্তু পাংশার পরের এলাকাও তো বাংলাদেশ! সে এলাকার ওপর পদ্মা ব্যারাজের কী অভিঘাত হবে, সেটা কি এই প্রকল্প সম্পর্কে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন নয়?

প্রথমত, পাংশা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত নদ–নদীর ও ভূগর্ভস্থ পানির স্বল্পতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তার ফলে সে এলাকার শস্য ও মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে।

দ্বিতীয়ত, গোয়ালন্দের পর পদ্মার মোট প্রবাহ হ্রাস পাবে। বলা যেতে পারে, সেখানে যমুনার পানি এসে যোগ হওয়ায় পদ্মার মোট প্রবাহ ততটা হ্রাস পাবে না। কিন্তু আমরা জানি, নদী-সংযোগ প্রকল্পের অধীনে ভারত ক্রমাগতভাবে ব্রহ্মপুত্রের পানিও পশ্চিমাভিমুখে অপসারণে নিয়োজিত এবং সেই লক্ষ্যে তিস্তার ওপর নির্মিত গজলডোবা ব্যারাজ ব্যবহার করছে।

আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, প্রথমত, বাংলাদেশকে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। সেই লক্ষ্যে প্রথম কাজ হবে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার–সংক্রান্ত জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের সনদ স্বাক্ষর করা। ইতিপূর্বে বলা হতো, ভারতের প্রতি নতজানু নীতির কারণে আওয়ামী লীগ সরকার এই সনদ স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু তারপর অন্তর্বর্তী সরকার বহু চুক্তি স্বাক্ষর করলেও জাতিসংঘের এই সনদ স্বাক্ষর করেনি।

আরও উত্তরে চীন কর্তৃক তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের ওপর একটার পর একটা বাঁধ নির্মাণের ফলে হিমবাহগলন সূত্রে প্রাপ্ত পানির পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। এসবের ফলে যমুনা থেকে উৎপন্ন লৌহজং, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা ইত্যাদি নদীর উৎসমুখে ইতিমধ্যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজের ফলে গোয়ালন্দের পরে ইছামতী, আড়িয়াল খাঁ ও পদ্মার অন্যান্য শাখা এবং বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন নদীর প্রবাহ হ্রাস পাবে।

তৃতীয়ত, পদ্মায় পানি হ্রাসের ফলে মেঘনা মোহনায়ও পানি হ্রাস পাবে এবং তার ফলে লবণাক্ততা দেশের আরও গভীরে প্রবেশ করবে। বিশেষত উত্তর–পূর্বের হাওর এলাকার ভূমি-উচ্চতা এত কম যে মেঘনা মোহনার লবণাক্ততা হাওর এলাকা পর্যন্ত সহজেই পৌঁছাতে পারে।

সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে পাংশার ভাটিতে পদ্মা ব্যারাজের বিভিন্নমুখী নেতিবাচক অভিঘাত বিবেচনায় না নিয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একদিকে হবে এই প্রকল্পের একপেশে মূল্যায়নের পরিচায়ক, অন্যদিকে আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধিকারী।

লক্ষণীয়, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রকারান্তরে ভারতের অভিলাষ পূর্ণ করবে। ভারত বরাবরই চেয়েছে যে বাংলাদেশ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করুক, কারণ সে ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে বলে দিতে পারবে যে যেটুকু পানি বাংলাদেশ পাচ্ছে, তা দিয়েই সে (পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে) সব চাহিদা মেটাতে পারে।

এভাবে ভারত গঙ্গার হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের অভিযোগের হাত থেকে রেহাই পাবে। সে কারণেই ভারত বাংলাদেশকে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানে এত উৎসাহী ছিল। কাজেই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা পররাষ্ট্রনীতির পরিচায়ক হয় তা বোধগম্য নয়।

সুতরাং, বাংলাদেশের উচিত গঙ্গানির্ভর এলাকার সমস্যাবলি নিরসনের লক্ষ্যে এক ভিন্ন পরিকৌশল গ্রহণ। এর দুটি দিক। একটি আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক, এবং অন্যটি অভ্যন্তরীণ।

আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, প্রথমত, বাংলাদেশকে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। সেই লক্ষ্যে প্রথম কাজ হবে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার–সংক্রান্ত জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের সনদ স্বাক্ষর করা। ইতিপূর্বে বলা হতো, ভারতের প্রতি নতজানু নীতির কারণে আওয়ামী লীগ সরকার এই সনদ স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু তারপর অন্তর্বর্তী সরকার বহু চুক্তি স্বাক্ষর করলেও জাতিসংঘের এই সনদ স্বাক্ষর করেনি।

বর্তমান বিএনপি সরকারের স্বাধীন বৈদেশিক নীতির একটি প্রমাণ হবে এই সনদ স্বাক্ষর ও অনুমোদন করা। এই সনদ ভাটির দেশের স্বার্থের বহু সুরক্ষা দেয়। সুতরাং, ভারত মানুক কিংবা না মানুক, এই সনদে স্বাক্ষর করা বাংলাদেশকে জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি উচ্চতর নৈতিকতা ও আইনি অবস্থান থেকে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় নিয়োজিত হতে সহায়তা করবে।

দ্বিতীয়ত, গঙ্গার পানি ভাগাভাগি–সংক্রান্ত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শিগগির শেষ হবে এবং এই চুক্তির নবায়নের বিষয়ে ভারতের সঙ্গে দেনদরবারের জন্য বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুত হতে হবে। লক্ষণীয়, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম ৪০ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি পাওয়ার বিধান ছিল। ১৯৭৭ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের ২৭ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার গ্যারান্টি ছিল। বর্তমান চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ‘ন্যূনতম প্রবাহের গ্যারান্টি’ নেই।

সুতরাং, নবায়িত চুক্তিতে গ্যারান্টি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং তা কমপক্ষে ৩৫ হাজার কিউসেকে নির্ধারণ করতে হবে। সুন্দরবন বাঁচানোর জন্য এই প্রবাহ প্রয়োজন। সুতরাং, ইউনেসকোসহ সব সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন লাভের চেষ্টা করতে হবে। ভারতের অভ্যন্তরে পরিবেশবাদী এবং নদীপ্রেমিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ করতে এবং তাদের সমর্থন লাভে প্রয়াসী হতে হবে।

৪.

গঙ্গানির্ভর এলাকার সমস্যাবলি নিরসনের পরিকৌশলের দ্বিতীয় দিকটি হবে দেশের অভ্যন্তরে নদ–নদীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের বিষয়ে ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন আনা। নদ–নদীর ক্ষেত্রে বর্তমান বেষ্টনী পন্থার পরিবর্তে উন্মুক্ত পন্থা গ্রহণ করতে হবে। বেষ্টনী পন্থার সমর্থক এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের বিদায় করে পাউবোকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে।

নতুন এই পাউবোর কাজ হবে সারা দেশের এবং বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিমের সব নদ–নদীকে সব ধরনের স্লুইসগেট, ফ্ল্যাপগেট, রেগুলেটর, সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্ট ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত করা। সব নদ–নদী সিএস মানচিত্র অনুযায়ী দখলমুক্ত করতে হবে এবং দখলদারদের শাস্তি দিতে হবে।

সব পোল্ডারকে উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে নদীর পানি অবাধে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এবং ভেতরের পানি সহজে নদীতে পৌঁছাতে পারে। জলাবদ্ধতা ও পানিবন্দিত্ব থেকে লাখ লাখ মানুষকে মুক্ত করতে হবে। সব বাঁধকে অষ্টমাসি বাঁধে রূপান্তরিত করতে হবে। এই ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে গঙ্গার পানির অবাধে সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই গঙ্গানির্ভর এলাকা পুনরুজ্জীবিত হবে।

লক্ষণীয়, সময়ের ধারাবাহিকতায় ভূপৃষ্ঠস্থ খালনির্ভর সেচের উপযোগিতা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশে বিগত সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রেখেছে অগভীর নলকূপভিত্তিক সেচ। সে জন্য প্রয়োজন ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের নবায়ন। নদ–নদীর পুনরুজ্জীবন সেই লক্ষ্যে সহায়ক হবে। এ জন্য ৬৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এমনিতেই ভারাক্রান্ত। স্বল্প ব্যয়ে অধিক ফললাভ করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

উপর্যুক্ত আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দুই ধারায় যদি বাংলাদেশ এগিয়ে যায়, তাহলেই গঙ্গানির্ভর এলাকার পুনরুজ্জীবন নিশ্চিত হবে; পদ্মা নদী বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পাবে; আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি বাড়বে না; মেঘনা মোহনা সুস্থ থাকবে; বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষায় শুভ বাঁকবদল ঘটবে। সুতরাং, সরকারের উচিত হবে একতরফাভাবে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর না হওয়া; আরও সময় নিয়ে এবং জনগণকে অভিমত প্রকাশ করার সুযোগ দিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দিন শেষে জনগণকেই এই প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

  •  ড. নজরুল ইসলাম এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান

    মতামত লেখকের নিজস্ব