দৈনিক প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ৮১টি সংস্থার ৫৫ হাজার ১৫৪ জন পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে একটি নামমাত্র সংস্থাই ১০ হাজার পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন পেয়েছিল, যা পরে স্থগিত করা হয়। এ ঘটনা ব্যতিক্রম নয়, বরং পুরো নির্বাচন পর্যবেক্ষণব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।
বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরিচিত অংশ। ভোটকেন্দ্রে পরিচয়পত্র ঝোলানো পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি আজ স্বাভাবিক দৃশ্য। অথচ এই প্রক্রিয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র তিন দশক আগে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তারও আগে ময়মনসিংহের দাপুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের মডেল নির্বাচনের মাধ্যমে। তখন স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল না, বিদেশি পর্যবেক্ষকেরাই ছিলেন মূল কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় সংস্থাগুলো ভোটকেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করত।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নির্বাচনী কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতা বলছে, সংখ্যায় বিস্তার ঘটলেও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জন করতে পারেনি। কাঠামো আছে, নীতিমালা আছে, কিন্তু কার্যকারিতা সীমিত।
স্বচ্ছতার জন্য পর্যবেক্ষণ, কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা সফল
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা একটি মৌলিক শর্ত। নির্বাচন কমিশনও মনে করে পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি অনিয়ম প্রতিরোধে সহায়ক। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ভোট গ্রহণ গণনা ও ফলাফল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম শনাক্ত করা, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নির্বাচন কমিশনকে জানানো, রাজনৈতিক দল ও ভোটারের আস্থা বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ সংস্কারের জন্য সুপারিশ প্রদান ও ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির মাধ্যমে অনিয়ম প্রতিরোধে সহায়তা করা। কিন্তু উদ্দেশ্য যতই স্পষ্ট হোক, বাস্তবায়ন ততটা শক্তিশালী নয়।
নীতিমালার বিকাশ ১৯৯৬ থেকে ২০২৫
১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন দেশি–বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করে। সেবার নির্বাচনে ২৬টি স্থানীয় সংস্থার প্রায় ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক মাঠে ছিলেন। ২০০১ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৯১(সি) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ আইনি ভিত্তি পায়। এরপর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৯টি সংস্থার ২ লাখের বেশি পর্যবেক্ষক অনুমোদন পান, যা এখনো সর্বোচ্চ।
২০০৮ সালের নির্বাচনে ৭৫টি সংস্থার ১ লাখ ৫৯ হাজার ১১৩ পর্যবেক্ষক অনুমোদন পান। এ সময় এশিয়া ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে গঠিত ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ ভোটার তালিকা সচেতনতা ও পর্যবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু ২০১৭ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারি চাপে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর পর থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ আর বিকশিত হয়নি।
২০১১ সালে প্রথমবারের মতো স্থানীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থার নিবন্ধন দেওয়া হয়। ১২০টি সংস্থা ৫ বছরের জন্য নিবন্ধন পায়। কিন্তু নিবন্ধন পেলেও অনেক সংস্থার কার্যক্রম কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর প্রতিটি সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন করে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধন ও অনুমোদন কাঠামো আছে, নিয়ন্ত্রণ দুর্বল
নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানালেও নিবন্ধন অনুমোদন ও তদারকি কাঠামো এখনো দুর্বল। নীতিমালার ফাঁক গলে অনেক সংস্থা নিবন্ধন পেলেও তাদের প্রকৃত সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। কমিশন পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো আর্থিক সহায়তা দেয় না আবার পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিও প্রয়োজন, ফলে কঠোরতা দেখানো হয় না।
এ কারণে দেখা যায়, নিবন্ধিত অনেক সংস্থার কার্যক্রম নেই, অনেক সংস্থা কাগজে–কলমে সক্রিয়, কিছু সংস্থা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, অনেক সংস্থা অনুমোদন নিলেও মাঠে পর্যবেক্ষক পাঠায় না।
পর্যবেক্ষক অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি
অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে কয়েকটি মৌলিক দুর্বলতা। নির্বাচন কমিশন শুধু সংস্থাভিত্তিক সংখ্যা অনুমোদন করে। মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা কার্ড ইস্যু করেন, প্রকৃতপক্ষে কতজন পর্যবেক্ষক মাঠে কাজ করেন, তা কেউ জানে না। নির্বাচন শেষে এ বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন বা অনুসন্ধান হয় না। ফলে অনুমোদিত সংখ্যা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ফাঁক থেকে যায়।
পর্যবেক্ষক সংস্থার দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আর্থিক সহায়তার অভাব, দক্ষ পর্যবেক্ষক না পাওয়া, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, কার্ড পেতে হয়রানি, ভোটকেন্দ্রে অসহযোগিতা, শেষ মুহূর্তে অনুমোদন পাওয়া ও সমন্বয়ের অভাবই তাদের মূল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পর্যবেক্ষণ নিরপেক্ষতার সংকট
বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে বড় সংকট হলো রাজনৈতিক প্রভাব। বড় রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই অভিযোগ তোলে যে অমুক সংস্থা সরকারপন্থী, অমুক সংস্থা বিরোধী দলের ঘনিষ্ঠ, অমুক সংস্থা বিদেশি অর্থায়নে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দেয়…ইত্যাদি। এই অভিযোগগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পুরোপুরি অমূলক নয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মূল শক্তি হলো প্রতিবেদন। কিন্তু অনেক সংস্থা প্রতিবেদন জমা দেয় না। যারা দেয়, তাদের প্রতিবেদনের মান প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো কাঠামো নেই। ফলে তিন দশকের পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও নির্বাচনী সংস্কারে এর প্রভাব সীমিত।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকে কার্যকর করতে হলে সংস্থার সক্ষমতা যাচাই কঠোর করতে হবে। প্রশিক্ষণকে মানসম্মত করতে হবে, রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করতে হবে, সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচন কমিশনে স্থায়ী সেল গঠন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কাঠামো তৈরি করতে হবে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শুধু পরিচয়পত্র ঝোলানো মানুষের উপস্থিতি নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যা সঠিকভাবে পরিচালিত হলে নির্বাচনী আস্থা বাড়ায় আর দুর্বলভাবে পরিচালিত হলে আস্থাহীনতা আরও গভীর করে। বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জনই হতে পারে আস্থা পুনর্গঠনের একমাত্র পথ।
এস এম আসাদুজ্জামান সাবেক মহাপরিচালক, নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই), বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন
* মতামত লেখকের নিজস্ব