সরকারি দলের প্রবীণতম ব্যক্তিকেই নমিনেশন দিয়েছে মনোনয়ন বোর্ড। পত্রিকাগুলো লিখছে, বয়স্ক পুনর্বাসন প্রকল্প। বিরোধী দলগুলোও অংশ নেয়নি, সেটাও ভালো কথা। কিন্তু বিরোধী দলের লোকেরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর ছদ্মাবরণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন না, যেখানে নিজ দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী হয়?

কোথাও কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবাই তঁাকে খুঁজছে। নারায়ণগঞ্জের সেলিম ওসমান সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে ঘোষণা দিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে চন্দন শীলের প্রতিপক্ষ কেউ প্রার্থী হলে সে জাতীয় পার্টিতে থাকবে না।

২.

বাংলাদেশের একেকটা জেলার জনসংখ্যা ইউরোপের কোনো কোনো রাষ্ট্রের সমান। রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার জরুরি। কিন্তু সংবিধানে ‘স্থানীয় সরকার’ শব্দটি নেই, আছে স্থানীয় শাসন। ৫৯(১)-এ বলা আছে, আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।

সংবিধানের ইংরেজি ভাষ্যে ‘লোকাল গভর্নমেন্ট’ লেখা থাকলেও বাংলা ভাষ্যে লেখা আছে ‘স্থানীয় শাসন’। ১৫৩ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘...তবে শর্ত থাকে যে বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাইবে।’

এখন কথা হচ্ছে ‘আইনানুযায়ী’ শব্দবন্ধটি নিয়ে। গণপরিষদ বিতর্কে ন্যাপ নেতা ও পরে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও স্বতন্ত্র সদস্য এম এন লারমাও এ শব্দবন্ধ নিয়ে সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ‘মৌলিক অধিকার’ অংশে বারবার আপত্তি তুলেছিলেন। এম এন লারমা বলেছিলেন, ‘“আইনানুযায়ী ব্যতীত” শব্দাবলি যদি এই অনুচ্ছেদে রাখা হয় এবং সেটা যদি এই পরিষদে গৃহীত হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে যাঁরা আইন পরিষদে আসবেন, তাঁরা যদি “আইনানুযায়ী ব্যতীত” শব্দাবলির মাধ্যমে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান, তাহলে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রক্ষার জন্য এই যে ৩২ অনুচ্ছেদ করা হয়েছে, সেই অনুচ্ছেদের কোনো অর্থ থাকবে না। তার কারণ, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রক্ষার জন্য “আইনানুযায়ী ব্যতীত” শব্দগুলোর ক্ষমতার দ্বারা এমন এমন আইন গৃহীত হতে পারে, যার দ্বারা জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার খর্ব হয়ে যাবে।’

এখনো ‘আইনানুযায়ী’ শব্দটিতেই আটকে আছি। সরকার বদলের সঙ্গে আইন বদলে গিয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা এখন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হচ্ছেন। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত হওয়াকে আইয়ুব খান নাম দিয়েছিলেন ‘মৌলিক গণতন্ত্র’।

যারা সরকারে থাকে, তারাই যেন মৌলিক গণতন্ত্র পছন্দ করে। তারা মনে করে, পাবলিক ভোট দিতে জানে না। তাই ভোটারদের যাঁরা প্রতিনিধি, তাঁরাই এখানে ভোটার। তাঁদের একজন থাকেন প্রস্তাবকারী আর একজন সমর্থনকারী। কোন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য চাইবেন প্রকাশ্যে সরকারি দলের প্রার্থীর চক্ষুশূল হতে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন দেখে মনে হবে, একজন কৌশলে পুরো জেলাবাসীকে পরস্পর থেকে আলাদা করে পরিচালিত করছে। নেতা ও জনতা দাসত্বের রোগে ভুগছে। সবাই ওই নেতার সেবক। অল্প বুঝের জন্য নয়, জীবন-জীবিকার জন্য সবাই যেন মেনে নিচ্ছে। আত্মপ্রতারণাময় এক ধারা। মুখ বুজে থাকার চেয়ে ফেসবুকজুড়ে তাই জনগণমন-অধিনায়কদের জয়ধ্বনি! কেন? কার, সংবিধানজুড়ে একটি পদই জবাবদিহিহীন ও সব ক্ষমতার মালিক।

নানা কারণে রাষ্ট্র ও সমাজে পরস্পরবিরোধী ভাবধারার অস্তিত্ব থাকে। থাকে বিচ্ছিন্নতার মনোভাব। থাকে হিংসাত্মক ঘটনা। কিন্তু তা দূর করা যায়। মানুষকে সমবেত করে তা করা যায়। ইতিহাসের নজির দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবোধ কাটিয়ে তোলা যায়।

সমাজে শুধু আঘাতের অভিজ্ঞতাই থাকে না, থাকে প্রতি-আঘাতেরও দৃষ্টান্ত। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের কবর রচনা করে সত্তরের নির্বাচন এনেছিল।

সবাইকে বুঝতে হবে আইনে হাত দেওয়ার সময় হয়েছে। আমরা এখন দেখছি ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’-এর মতো বিএনপিও ‘রাষ্ট্র রূপান্তরের কর্মসূচি’ ঘোষণা করেছে। মানে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।

  •  নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক। ই–মেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন