২০১৬ সালের ছবি ‘সুলতান’-এ অনুষ্কা শর্মার চরিত্রটি তার কুস্তিগির স্বামী সুলতানকে এক তীব্র ধমক দিয়েছিল। সে বলেছিল, ‘আমি তোকে সম্মান অর্জন করতে বলেছিলাম, আর তুই অর্জন করে এনেছিস অহংকার।’
আজকের ভারতে অনেকেই হয়তো এই সংলাপের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাবেন।
সোমবার রাষ্ট্রশক্তির কড়া প্রদর্শনে সেই অহংকার দেখা গেল। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী চিকিৎসা প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সংসদের দিকে মিছিল করছিলেন।
পুলিশ লাঠিচার্জ করল, কাঁদানে গ্যাস ছুড়ল, যাতে তাঁরা সংসদের কাছে পৌঁছতে না পারেন।
এর মধ্যেই তিন সপ্তাহ ধরে অনশনে থাকা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোর করে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তিনি নিজেও মিছিলে যোগ দিতে পারেননি, কারণ তাঁর ভাষ্যমতে তাঁকে বেআইনিভাবে আটক করে রাখা হয়েছে।
এই সব ঘটনার মাঝেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে তাঁর নিয়মিত ভাষণ দিলেন। কিন্তু সংসদ থেকে কয়েক শ মিটার দূরে দেশের যুবসমাজের ওপর যা ঘটছে, তার উল্লেখও করলেন না তিনি। যেন তাঁরা গুরুত্বহীন।
বরং হায়দরাবাদের একটি সংস্থার রকেট উৎক্ষেপণের সাফল্যের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বিরোধী নেতাকে কটাক্ষ করলেন। বললেন, এই সাফল্য এসেছে আটাশ বছরের তরুণদের কাছ থেকে, ‘ছাপ্পান্ন বছরের তরুণ’দের কাছ থেকে নয়।
মোদির মন্তব্যটি প্রসঙ্গবিহীন ছিল। কিন্তু সেই সময় যখন রাজধানীতে ছাত্রদের ওপর রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ হচ্ছে, তখন এই মন্তব্য অনেকের কাছে শক্তিশালী সরকারের অহমিকা প্রদর্শনের ইঙ্গিত হিসেবেই ধরা পড়েছে।
এখানে একটু অন্য দিকও দেখা যাক। অনেকেই বলবেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি এমন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলেন না, যা তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তিনি আগের সরকারের ভুল করতে চান না।
মনমোহন সিংহ ও সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার বিরোধীদের চাপে পড়ে এবং জনরোষের মুখে পড়ে একের পর এক মন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল।
তেল-কেলেঙ্কারি, সন্ত্রাসী হামলা, দুর্নীতি—নানা ঘটনায় পদত্যাগের নজির ছিল। পরে কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা জানিয়েছিলেন, সোনিয়া গান্ধী নিজেও নাকি মনে করেছিলেন, এত সহজে পদত্যাগ করানো ভুল ছিল। এতে বিরোধীরা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
তবে অনেকেই মনে করেন, জনমতের প্রতি সাড়া দেওয়া গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। তাতে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হলেও। কিন্তু মোদি সরকার বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখে।
লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী এবং তাদের পরিবার চিকিৎসা পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়ম নিয়ে ক্ষুব্ধ। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ মানে দুর্বলতার স্বীকারোক্তি—এই যুক্তিতে সরকার নতি স্বীকার করছে না।
এর আগে অন্না হাজারের অনশনেও সরকার দ্রুত নতি স্বীকার করেছিল। সেই ঘটনার পরিণতিতেই শেষ পর্যন্ত সেই সরকারের পতনের পথ তৈরি হয়েছিল। আজ লোকপাল আদৌ কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ককরোচ জনতা পার্টি বা সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। সেটাকে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে।
আন্দোলন যখন সংসদের সামনে বড় আকার নিতে শুরু করল, তখন পুলিশ ব্যবস্থা নিল। ওয়াংচুককে হাসপাতালে সরিয়ে দেওয়া হল। তাঁর স্ত্রী তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে নিতে চাইলেও অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তবে সোমবারের ঘটনায় সরকার কিছুটা চমকে গিয়েছে বলেই মনে হয়। তারা হয়তো ভাবেনি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে এত যুবক-যুবতী রাজধানীতে এসে জড়ো হবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে হয়েছে। অতীতে কৃষক আন্দোলনের সময় সরকারকে আইন প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। এবারও কি তেমন কিছু হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তরুণদের অভিযোগ, সরকার যেন বলছে—আমরাই সব জানি, তোমাদের কী ভালো তা আমরা ঠিক করব। তোমাদের পরিবারকে আমরা রেশন দিচ্ছি, স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি, অর্থ সাহায্য দিচ্ছি—তাই প্রশ্ন কোরো না।
সরকারের এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এই তরুণেরা শুধু প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ করছে না। শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে না।
তাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে, যারা দিল্লির নামীদামি স্কুলে পড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, যাদের সরাসরি এই সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক নেই।
তবুও তারা এটিকে নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করছে। সরকারের সঙ্গে কথা বলার অনীহাই তাদের ক্ষুব্ধ করে তুলছে। রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন কিছুটা ভূমিকা নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই আন্দোলনকে শুধুই বিরোধীদের কাজ বলে দেখলে ভুল হবে।
প্রশ্নফাঁস কেবল একটি উপলক্ষ। এর পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ অনেক গভীর। তরুণেরা মনে করছে, তাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই। সরকার একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে না।
শিক্ষানীতির তিন ভাষা সূত্র নিয়ে বহু অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রী অসন্তুষ্ট। ইংরেজি কার্যত দ্বিতীয় সারিতে চলে যাচ্ছে। অন্য ভারতীয় ভাষা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তা কঠিন। ফলে সংস্কৃত চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে।
বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগও কমছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কারও মতামত নেওয়া হয়নি।
কোথাও বলা হচ্ছে, ডাক্তার হতে চাইলে নিরামিষভোজী হতে হবে। কোথাও স্কুলের মধ্যাহ্নভোজ থেকে ডিম বাদ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও যৌন সম্পর্কের ওপর আইন চাপানো হচ্ছে।
কোথাও গাড়ির জ্বালানিতে হঠাৎ পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যার প্রভাব মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না। এই সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হয়নি।
তরুণদের অভিযোগ, সরকার যেন বলছে—আমরাই সব জানি, তোমাদের কী ভালো তা আমরা ঠিক করব। তোমাদের পরিবারকে আমরা রেশন দিচ্ছি, স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি, অর্থ সাহায্য দিচ্ছি—তাই প্রশ্ন কোরো না।
এই বার্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
ডি কে সিংহ দ্য প্রিন্ট-এর রাজনৈতিক সম্পাদক। দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া।
ইংরেজি থেকে অনূদিত।