হামাস কি তাহলে শেষ হয়ে গেল?

হামাসের সশস্ত্র মহড়াফাইল ছবি: এএফপি

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে খুব সহজেই বলে দেওয়া যায় যে হামাসের অবসান ঘটেছে। গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে, সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাদের সামরিক শক্তি এখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, সরকার পরিচালনার ক্ষমতা কমে গেছে এবং গাজার সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ক্লান্তি এখন চরমে। এসব বিষয় কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

তবে এই বাস্তবতাগুলো থেকে যদি সরাসরি এই সিদ্ধান্তে আসা হয়—‘হামাসের ইতি ঘটেছে’, তা হবে বড় ভুল। একটি আংশিক সামরিক পরাজয় মানেই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তি নয়। শাসনক্ষমতা কমে যাওয়া মানেই প্রভাব একদম মুছে যাওয়া নয়। আর জনগণের একটি অংশের সমর্থন হারানো মানেই হামাস ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুছে গেছে তা বলা চলে না।

এ কারণেই ‘হামাসের সমাপ্তি ঘটেছে’—এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। বরং এটি বলা বেশি যথার্থ যে, হামাস এই যুদ্ধ থেকে একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে বের হয়েছে: সামরিকভাবে দুর্বল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি ওজনদার; এখন শাসন করার ক্ষমতার চেয়ে টিকে থাকার সক্ষমতার ওপরই তারা বেশি নির্ভরশীল। তবুও, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি বা তাদের বিকল্প অন্য কেউ তৈরি হয়নি। ফিলিস্তিনে এখনও এমন কোনো শক্তি উঠে আসেনি যা হামাসের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে পারে।

মূল প্রশ্নটি এটা নয় যে: ৭ অক্টোবরের আগে হামাস যতটা শক্তিশালী ছিল, এখনো কি ততটাই আছে? এর উত্তর পরিষ্কার: না। আসল প্রশ্ন হলো: গাজার ভবিষ্যৎ কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা কি হামাস হারিয়ে ফেলেছে? এখানে উত্তরটি একদম ভিন্ন। বন্দী বিনিময় প্রক্রিয়া, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি, গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কিংবা যুদ্ধের পর ‘পরবর্তী’ পরিকল্পনা—সবক্ষেত্রেই হামাস এখনও একটি বড় ফ্যাক্টর। এমনকি যারা হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়, তারাও তাদের ভূমিকা, অস্ত্র কিংবা প্রভাবকে ঘিরে আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। এটিই প্রমাণ করে যে হামাসের অবসান ঘটেনি।

একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক ক্ষমতার পতন আর একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তির মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। হামাস হয়তো আগের মতো গাজা শাসন করতে পারবে না, কিন্তু সংঘাতের রাজনীতিতে তাদের কাছে এখনও বড় একটি শক্তি রয়ে গেছে: অন্য কাউকেও সহজে গাজা শাসন করতে না দেওয়ার ক্ষমতা।

রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখার জন্য সব সময় সরকারে থাকার প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো কোনো একটি পক্ষকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব বা অনেক কঠিন।

যারা হামাসের অবসান দেখছেন, তারা এই সত্যটি এড়িয়ে যাচ্ছেন যে খোদ ইসরায়েলও কিন্তু হামাস শেষ হয়ে গেছে—এমন আচরণ করছে না। হামাস সত্যিই শেষ হয়ে গেলে যুদ্ধ, অবরোধ, চাপ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার ইসরায়েলি অজুহাতও শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইসরায়েল এখনও হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, তাদের ফিরে আসা ঠেকানো এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। এর মানে, মুখের কথা যাই হোক না কেন, ইসরায়েল মনে মনে ভালো করেই জানে যে হামাস এখনও এই সমীকরণের অংশ।

মূলত, ‘হামাস একটি বড় হুমকি’—ইসরায়েলের এই অবস্থানটি দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে। এক. এটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং গাজার বড় অংশ দখল করে রাখার অজুহাত দেয়। দুই. এটি যুদ্ধের পরের বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে—যেমন: যুদ্ধের পর গাজা কে চালাবে? ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কী? স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো পথ তৈরি হবে, নাকি কেবল স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে? ‘হামাস আতঙ্ক’ বাঁচিয়ে রেখে তেল আবিব মূলত এই কঠিন প্রশ্নগুলো থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

গাজার ভেতরের পরিস্থিতি অবশ্যই জটিল। মানুষের চরম ক্ষোভ রয়েছে, অনেকেই এই বিপর্যয়ের জন্য হামাসকে আংশিক দায়ী ভাবছেন এবং যে কোনো স্লোগানের চেয়ে মানুষের কাছে এখন পানি, বিদ্যুৎ, খাবার, ওষুধ ও নিরাপত্তা পাওয়াটা বেশি জরুরি। তবে এই ক্ষোভের অর্থ এই নয় যে গাজাবাসী ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বা বিকল্প মেনে নিচ্ছে। এর মানে এই নয় যে তারা আত্মসমর্পণ করতে চায় বা ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীনতার অধিকার ছেড়ে দিয়েছে।

যুদ্ধ না চাওয়া কোনো গাজাবাসী রাতারাতি আত্মসমর্পণের সমর্থক হয়ে যান না। আবার হামাসের সমালোচনা করা মানেই কেউ ইসরায়েলের সমর্থক হয়ে গেছে—এমনটা ভাবাও ভুল। নিজের দেশের নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তের বিচার করা আর যে জাতীয় সংগ্রামের ভেতর থেকে সেই নেতৃত্বের জন্ম, সেটিকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেওয়া—এই দুটির মধ্যে স্পষ্ট তফাৎ রয়েছে।

হামাসের জনভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন দাবি করার ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গণহত্যার মতো যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া একটি সমাজ এত সহজে স্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারে না। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে, তাঁবুতে বসে মানুষ যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে তা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে দশক ধরে টিকে থাকা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ধরে নেওয়াটা তড়িঘড়ি বিশ্লেষণ হবে।

হামাস কেবল গাজার একটি সরকার নয়। এটি একটি সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক নেটওয়ার্ক। এটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের এমন একটি অংশ, যা তাদের আগেও ছিল এবং পরেও থাকবে। তাই কেবল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে এই আন্দোলন শেষ করা সম্ভব নয়। দখলদারির বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া সংগঠনগুলো তাদের নেতাদের মৃত্যু বা পরিকাঠামো ধ্বংসের কারণে একেবারে মরে যায় না। তারা আকারে ছোট হতে পারে, বদলাতে পারে, নতুন নামে ও নতুন কৌশলে আবার ফিরে আসতে পারে।

এখানেই আমাদের বুঝতে হবে আগের হামাস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হামাসের মধ্যে পার্থক্য কী। হয়তো গাজার শাসক হিসেবে হামাসের পুরোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। অবরুদ্ধ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভূখণ্ডে একই সঙ্গে সরকার পরিচালনা ও প্রতিরোধ আন্দোলন চালানোর মোহ হয়তো ভেঙে গেছে। হয়তো সংগঠনটি এখন অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান কোনো রূপ গ্রহণে বাধ্য হবে। কিন্তু এটি হামাসের ধ্বংস নয়, বরং এটি হামাসের একটি নির্দিষ্ট সংস্করণের সমাপ্তি মাত্র।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে মূল পার্থক্যটা এখানেই। অনেকে হামাসের ওপর আসা আঘাতগুলোকে তাদের বিলুপ্তির প্রমাণ হিসেবে দেখেন; আমি সেগুলোকে দেখি নতুন এক যুগে প্রবেশের আলামত হিসেবে। অবসান মানে ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়া, আর রূপান্তর মানে পরাজয় ও নতুন বাস্তবতার চাপে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে কারণগুলো হামাসের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলো কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। দখলদারি শেষ হয়নি, অবরোধ ওঠেনি, বসতি স্থাপন থামেনি, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তৈরি হয়নি, আর গাজাও কোনো মুক্ত বা নিরাপদ স্থান হয়ে ওঠেনি। যতক্ষণ এই কারণগুলো থাকবে, ততক্ষণ হামাস বা তার চেয়েও নতুন কোনো রূপ বা নতুন ধারার প্রতিরোধ জন্ম নেওয়ার মতো পরিবেশ থেকেই যাবে।

তাই ‘হামাসের কি অবসান ঘটেছে?’—প্রশ্নটি এভাবে করাটাই হয়তো ভুল। সঠিক প্রশ্নটি হওয়া উচিত: এই যুদ্ধের পর হামাস কী রূপ ধারণ করবে? তারা কি একটি শাসক দল হিসেবে থাকবে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে? তারা কি তাদের সামরিক শাখা পুনর্গঠন করবে, নাকি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কিছুটা পেছনে সরবে?

হামাসের অবসান ঘোষণা করা বস্তুনিরপেক্ষ বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বেশি। ইসরায়েল যখন বিজয়ের গল্প বলতে চায়, তখন বলে হামাস শেষ; আবার যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত দরকার হয়, তখন বলে হামাস এখনও বড় হুমকি। অন্যদিকে, হামাসবিরোধী অনেক গোষ্ঠীও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব থেকে এর অবসান দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা সকলের ইচ্ছার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

হামাস শেষ হয়ে যায়নি, তবে তারা আর আগের মতো নেই। এটাই হয়তো সবার জন্য সবচেয়ে কঠিন সত্য—হামাসের নিজের জন্য, ইসরায়েলের জন্য, ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং এমন সবার জন্য যারা জটিল একটি সংকটের সহজ উত্তর খুঁজছেন।

একটি যুদ্ধে একটি দল হেরে যেতে পারে, তাদের মূল পরিকাঠামো ধ্বংস হতে পারে, তাদের সমর্থকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের উপস্থিতি বজায় থাকে এবং তাদের জন্ম দেওয়া মূল কারণগুলো বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত অবসান ঘোষণা করা সম্ভব নয়।

তাই আসল প্রশ্ন হামাস শেষ হয়েছে কি না তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো: এই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোন রূপের হামাস বের হয়ে আসবে?

  • তামির আজরামি বেলজিয়ামে বসবাসকারী লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।