তবে নির্মম পরিহাসের মতো বলতে হয়, পৃথিবীতে এসেই আমাদের শিশুরা খুন হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় কত অজস্র শিশু নিমেষেই ঝরে যাচ্ছে। ট্রাকের চাপায় অন্তঃসত্ত্বা মায়ের পেট চিরে সড়কে বেরিয়ে এসে নবজাতকও আমাদের হতবিহবল করে দেয়। প্রতিদিনই কত শিশু নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে। নির্মমতার শিক্ষা পাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে দেখতে দেখতে আমরা তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। আমাদের মনে কোনো রেখাপাত করে না। সামাজিক মান-মর্যাদার ভেদাভেদের মতো কোনো ঘটনার দিকে ফিরেও তাকাই না, আবার কোনো ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশে দেরি করি না। আমাদের ক্ষোভ, আবেগ, অনুভূতি এভাবে এক ‘সিলেক্টিভ বর্গে’ এসে আটকে পড়ে। রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির নানা ধূম্রজালে পথ হারাতে হারাতে আমরা এমন পর্যায়ে এসে ঠেকে গেছি, আমাদের শিশুদের এমন পরিণতিই আমাদের মেনে নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এমনকি শিশুরা দিনের পর দিন নিখোঁজ থাকার পর তাদের লাশ পেয়ে আমাদের ‘সন্তুষ্ট’ থাকতে হচ্ছে। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছে এ দেশে, সেখানে সেটিও কি বড় পাওয়া নয়!

গোটা জাতি মেতেছে বিশ্বকাপের ফুটবলের জোয়ারে। সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবার মনোযোগ ফুটবলকে ঘিরে। সেখানে কত তর্ক-বিতর্ক, কত আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে একটি ছবি বারবার হাজির হচ্ছিল। একটি নিখোঁজ সংবাদের পোস্টার। ফেসবুকে অনেকে শেয়ার দিচ্ছিলেন। পরিবার হণ্ন হয়ে খুঁজছে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে। দাদার হাত ধরে এক বিকেলে মসজিদের মক্তবের উদ্দেশ্যে বের হয় আয়াত। নাতনিকে মসজিদের পাঠিয়ে দিয়ে একটি দোকানে যান দাদা। এরপর থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় শিশুটি। চট্টগ্রাম শহরের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার ঘটনা এটি।

মেয়ের খোঁজে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, থানা-পুলিশ ও হাসপাতালে ঘুরেছেন মা-বাবা। এলাকায় এলাকায় হারানো বিজ্ঞপ্তির পোস্টারও লাগিয়েছেন। সেই পোস্টারসহ আয়াতের অনেক ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে যায়। মেয়েকে ফিরে পেতে মাইকিংও চলতে থাকে। এভাবে দশদিন পর পাওয়া গেল আয়াতের খোঁজ। কিন্তু তাকে ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় নাই। কারণ তার লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে ঘাতক। গতকাল বৃহস্পতিবার আবির আলী নামে সেই ঘাতককে গ্রেপ্তারও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপরই বেরিয়ে আসে নিখোঁজ আয়াতের এ করুণ পরিণতি।

আবিরের পরিবার আয়াতদের বাসায় ভাড়া থাকে। তাঁর বাবা ভ্যানচালক এবং মা পোশাক কারখানার শ্রমিক। বেকার থাকায় এমন কিছু তিনি করতে চেয়েছিলেন যাতে তাঁর হাতে বিপুল টাকা চলে আসে। সত্যিকারের অপরাধের ঘটনা নিয়ে তৈরি ভারতীয় টিভি ধারাবাহিক ক্রাইম পেট্রোল দেখে নেন পরিকল্পনা। মুক্তিপণ আদায় করতে আয়াতকে অপহরণ করেন। কিন্তু ঘটনা ঘটানোর পর মুক্তিপণ চাওয়ার সাহস করতে পারেননি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে। নিস্তার হতে শিশুটিকে মেরে ফেলে সাগরে ভাসিয়ে দেন আবির। অথচ সেই আবিরের সাথে আয়াতের কত সখ্যতা ছিল!

ঠিক এক মাস আগে চট্টগ্রাম শহরের জামালখান এলাকার আরেকটি ঘটনা ছিল মুষড়ে পড়ার মতো। তখন ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ঝড়ের সঙ্গে বইছিল দমকা হাওয়াও। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে মাইকিং করতে নেমেছিলেন এক তরুণী, সালেহা আক্তার রুবি। কাতর কণ্ঠে তাঁর আর্তি ভেসে আসছিল মাইক দিয়ে: ‘আমার বোন মারজানা হক বর্ষা হারিয়ে গেছে। কেউ তার খোঁজ পেলে আমাদের একটু দয়া করে জানান।’

জীবিকার খোঁজে চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসেছিল রুবিদের পরিবার। জামালখান লিচুবাগান সিকদার হোটেলের পাশের বিল্ডিং বসবাস করতেন তারা। এলাকার সবাই পছন্দ করতো সাত বছর বয়সী বর্ষাকে, সবাই আদর করতো তাকে। এক বিকেলে সে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল দোকানে যাওয়ার জন্য। পরে বাসায় না আসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায় দোকানে যায়নি সে। এরপর আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও পাওয়া যায়নি বর্ষাকে। বোনের খোঁজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে হয়রান রুবি। কয়েক দিনেও বর্ষাকে খুঁজে না পেয়ে পুলিশের অসহযোগিতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চিৎকার করে বলতে থাকেন: চারদিকে এতগুলো সিসিটিভি বসিয়ে কী লাভ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তা আমরা দেখতে পাই।    

অবশেষে কয়েক দিন পর নালায় বস্তাবন্দী অবস্থায় পাওয়া গেল বর্ষার লাশ। বস্তায় টিসিবির সিল দেখে আশপাশের বিভিন্ন দোকান ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের গোডাউন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। ঘাতক এক দোকান কর্মচারী লক্ষ্মণ দাশ, যিনি কী না বর্ষাদের প্রতিবেশী। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আমরা জানতে পারি, লক্ষ্মণ প্রায় বর্ষাকে চকলেট ও চিপস দিতেন। ঘটনার দিন তিনি ১০০ টাকা দেওয়ার কথা বলে তাকে দোকানের গোডাউনে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের একপর্যায়ে রক্ত দেখে ভয় পেয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বর্ষাকে। পরে বস্তায় ভরে তার লাশ পার্শ্ববর্তী নালায় ফেলে দেন। এরপর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া রুবির বক্তব্য ছিল এমন, ‘আমার বোন নিখোঁজের পর যদি পুলিশের তৎপর হতো, তাকে হত্যা করা যেত না। তাহলে তাকে বাঁচানো যেত। এখন আমাদের কী হবে? যা হওয়ার সেটাই হয়ে গেছে।’

সাম্প্রতিক কালে চট্টগ্রাম শহরে এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। শিকার হচ্ছে একের পর এক শিশু। গতকাল চট্টগ্রামের এক তরুণ পেশাজীবী মহিব উল্লাহ খান এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন: ‘গত কয়েকদিন যাবৎ যে, চট্টগ্রাম শহর ও এর আশপাশের এলাকা হতে বাচ্চা হারিয়ে যাচ্ছে, এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কোনো বক্তব্য পেয়েছি? হঠাৎ করে এমনটা হওয়ার কারণ আর মা-বাবাদের ঠিক কী ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত এসব নিয়ে বক্তব্য আসা উচিত।’ পরিস্থিতি যদি এমনই হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি খুবই আশঙ্কাজনক। সেটি আমরা সাধারণেরা বুঝতে পারছি, যাদের বোঝার কথা তাঁরা কেন বুঝছেন না?

বাজার অর্থনীতির করুণ দশা। ওএমএসের ট্রাকের পেছনে মানুষের সারি দিনকে দিন লম্বা হচ্ছে। ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আমাদের তরুণেরা মরছে বেকারত্বের অভিশাপে। আমাদের শিশুরা সামান্য মশার কাছে প্রাণ হারাচ্ছে। কোনো কিছুই আমাদের মনোযোগ পায় না। আজ হয়তো বিশ্বকাপ ফুটবল, কাল হয়তো অন্য কিছুতে মেতে থাকি আমরা। এ ভুলে থাকার চাষ করতে করতে প্রতিনিয়ত আমাদের সর্বনাশ হয়ে যায়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা হয় বিরোধী দল ঠেকাতে। গায়েবি মামলায় আসামি ধরতে তাঁরা হাজির হয়ে যান মৃত মানুষের কবর পর্যন্ত। তাঁরা আমাদের নিরাপত্তায়, আমাদের শিশুদের রক্ষায় কিছুই করতে পারেন না। ফলে যা ঘটার সেটিই ঘটে যায়, যা হওয়ার সেটিই হয়ে যায়! আমাদের শিশুদের জন্য একটি সাজানো বাগানের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায় গানেই, বাস্তবে রূপ পায় না।      

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক। ইমেইল: [email protected]