ডাকসুর এক বছরের অর্জন কী, ব্যর্থতা কোথায়

ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টাঙানো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়ছবি : প্রথম আলো

ডাকসুর বর্তমান কমিটি আরও তিন মাস অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছে। এরপর এই সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং কমিটি তাদের নির্ধারিত কাজের এখতিয়ার হারাবে। অবশ্য এই এক বছরেই ডাকসুর নেতারা এখতিয়ারবহির্ভূত কাজের জন্য বিভিন্ন সময়ে সমালোচিত হয়েছেন।

ডাকসুর নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালু করে ক্যাম্পাসের ভেতরে দারুণভাবে আলোচনায়-সমালোচনায় আসে বর্তমান কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) প্রত্যেক সেমিস্টার শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু এখনো এটি পুরোদস্তুর চালু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে ডাকসু এ ধরনের জরিপ ফরম উন্মুক্ত করে প্রশাসনের ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করেছে।

এমনকি যে জরিপ নিয়ে এত কথা, সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও অতি সীমিত। ফলে ‘ডিইউ টিচার্স ইভাল্যুশন’ সাইট দেখে কোনো শিক্ষক সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া শিক্ষকেরা শুধু ক্লাস নেন না, গবেষণাকাজেও জড়িত থাকেন। সুতরাং জরিপ ফরমে সেই মূল্যায়নও থাকা দরকার।

সম্প্রতি ডাকসু সংগ্রহশালার ছবি বদলের ব্যাপারটিও ব্যাপক সমালোচনায় এসেছে। ইতিহাসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ইতিবাচক-নেতিবাচক, দুই ধরনের ভূমিকাই পাওয়া যাবে; কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক বিরোধ আছে। এই জায়গা থেকে সংগ্রহশালায় কাদের ছবি কীভাবে থাকবে, তা নির্ধারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা দায়িত্বশীল শিক্ষকদের সহায়তা নেওয়া যেত।

কারণ, ডাকসুর গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট লেখা আছে, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের চেতনা সমুন্নত রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সংগ্রহশালার ‘সংস্কার’ কাজটি এমন হয়ে গেছে, দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসকে হয়তো নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিস্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ডাকসু কখনো দলীয় ফোরাম নয়; ছাত্র সংসদ নির্বাচনও দলগতভাবে হয় না। তাই ডাকসুর কার্যক্রম পরিচালনা করার সময়ে খেয়াল রাখা দরকার, কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ যাতে ‘দলীয়’ হয়ে না ওঠে। এমনটি হলে সব ছাত্র-শিক্ষকের সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের একাংশ’ শিরোনামে কয়েকজন মনীষীর ছবি টাঙানো নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। আপত্তির মুখে দ্রুত ছবিগুলো বদল করা হয়। একসঙ্গে ছয়জন লেখকের যেসব ছবি টাঙানো হয়েছিল, সেগুলোর কোনোটিই তাঁদের ছিল না। এ কাজ যিনি বা যাঁরা করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে এ রকম দায়িত্বহীন ভূমিকা আশা করা যায় না।

যাঁরা ছবি বাছাইয়ের কাজ করেছেন, তাঁরা জসীমউদ্‌দীন, মুনীর চৌধুরীসহ তালিকার কোনো ব্যক্তির ছবিই চিনবেন না—এমনটা ভাবতেই অবাক লাগে। তা ছাড়া প্রশ্ন রয়ে যায়, এভাবে ‘একাংশের’ তালিকা করা যায় কি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে কবি-সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান হয়েছেন—এ সংখ্যা এত বেশি যে তাঁদের এক দেয়ালে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়।

ডাকসুর নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর নিজেদের কার্যক্রম ও অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরেন ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ নেতারা। তাঁরা দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুরো এক বছর তাঁরা কাজ করেছেন এবং এ সময়ে ৪১টি খাতে এক হাজারের বেশি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

তবে একই সঙ্গে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতার এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগও করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য এ ধরনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। বরং প্রশাসনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে কিংবা বিধি অনুযায়ী কাজ করার জন্য তাদের তরফ থেকে সব সময় ডাকসু নেতাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচনে বড় জয় পায় ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল
ছবি: প্রথম আলো

ডাকসুর বর্তমান ভিপি দাবি করেন, গত এক বছরে হলের আবাসনসংকটের সমাধান, রিডিং রুম আধুনিকায়ন এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহন সমস্যা নিরসনে তাঁরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া তাঁদের কাজের মধ্যে আছে স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ সেল, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ।

তবে এগুলোর কোনোটিই এখনো যথেষ্ট মাত্রায় গ্রহণযোগ্য রূপ লাভ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যেকোনো পদক্ষেপ বা কাজের জন্য ছাত্র সংসদ ও প্রশাসনকে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। নইলে আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব নয় কিংবা কোনো উদ্যোগকে টেকসই করা সম্ভব নয়।

ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের একেকটি পদের বিপরীতে দায়িত্ব কী, তা খুবই সুনির্দিষ্টভাবে ডাকসুর গঠনতন্ত্রে লেখা আছে। কিন্তু নির্বাচিত ডাকসু নেতাদের কাজকর্ম দেখে মনে হয়েছে, তাঁরা হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘জাতীয় দায়িত্ব’ নিয়ে হাজির হয়েছেন। বিশেষ করে উচ্ছেদ অভিযানের নামে লাঠিপেটা, মাঠে খেলতে যাওয়া শিশুদের শাস্তি দেওয়া কিংবা কোনো কোনো শিক্ষককে হেনস্তা করার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে আপত্তি উঠেছে।

আবার নির্বাচনের আগে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি প্যানেল থেকে দেওয়া হয়েছিল, যার সঙ্গে বাস্তব অবস্থার মিল নেই কিংবা সরাসরি তাঁদের সম্পর্ক নেই। যেমন প্রথম বর্ষ থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বৈধ আসনের নিশ্চয়তা ছাত্র সংসদের নেতারা দিতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই এ ব্যাপারে কার্যকর ও স্বচ্ছ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। তবে এই ডাকসু প্রকাশনার ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে; তাদের দাবি মতো অন্তত ৩৬টি প্রকাশনা বের হয়েছে।

ডাকসু কখনো দলীয় ফোরাম নয়; ছাত্র সংসদ নির্বাচনও দলগতভাবে হয় না। তাই ডাকসুর কার্যক্রম পরিচালনা করার সময়ে খেয়াল রাখা দরকার, কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ যাতে ‘দলীয়’ হয়ে না ওঠে। এমনটি হলে সব ছাত্র-শিক্ষকের সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তা ছাড়া প্রতিটি কাজের এবং কাজের বিপরীতে খরচের হিসাব সুনির্দিষ্টভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা দরকার। প্রয়োজনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনেও এটি প্রকাশ করা যায়। ডাকসু ও হল সংসদের কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও শিক্ষাসহায়ক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করা, সংঘাত তৈরি করা নয়। ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত না হওয়া পর্যন্ত এর সুফল পুরোপুরি পাওয়াও সম্ভব নয়।

• তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

*মতামত লেখকের নিজস্ব