আমি এমন একটা সময়ে এই লেখাটা লিখছি, যখন গত কয়েক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া কয়েকটা ঘটনা খুব স্পষ্টভাবেই চোখের সামনে এসেছে। ঘটনাগুলো আলাদা। কিন্তু পাশাপাশি রাখলে একটা প্যাটার্ন দেখা যায়। এবং সেই প্যাটার্নটা আমার কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের।
প্রথম ঘটনাটা ঢাকা বিমানবন্দরের। তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, বৈধ পাসপোর্ট, টিকিট এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও দেশের বাইরে যেতে পারেননি। কেন? কারণ তাঁরা অবিবাহিত, তাঁদের সঙ্গে বাবা, ভাই বা স্বামী কেউ নেই, এবং ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মনে হয়েছে এই অবস্থায় তাঁদের বিদেশে যাওয়া ঠিক না। বিষয়টা পরে হাইকোর্ট পর্যন্ত গেছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী দেশের বাইরে যেতে পারবেন কি না, সেটা কি বাংলাদেশের আইন ঠিক করবে, নাকি বিমানবন্দরে বসে থাকা কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নৈতিক ধারণা ঠিক করবে?
একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে মনে করতেই পারেন, অবিবাহিত নারীর একা বিদেশ যাওয়া উচিত না। কিন্তু তিনি যখন সরকারি চেয়ারে বসেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মূল্য শূন্য। তখন তাঁর সামনে একটাই জিনিস থাকার কথা—আইন। কিন্তু আমরা দেখলাম, আইন সেখানে যথেষ্ট ছিল না।
মেট্রোরেলের আরেক ঘটনা আলাপ না করলেই না। একজন অ্যাথলেট প্রশিক্ষক, হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে যাচ্ছিলেন। একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে আটকালেন। যে ভিডিওটি আমরা দেখেছি, সেখানে পুলিশ সদস্য খুব তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাঁকে বোঝাচ্ছেন যে তাঁর পোশাক ‘অশালীন’। অথচ মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট পরে ওঠা নিষিদ্ধ, এমন কোনো নিয়ম নেই। পরে পুলিশ তদন্ত কমিটি করেছে।
পুরো ঘটনাটা যেটা দেখিয়ে দিয়েছে, সেটা হলো একজন পুলিশ সদস্য মনে করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত শালীনতার ধারণা তিনি একজন নাগরিকের ওপর প্রয়োগ করতে পারেন। এখানেও একই প্রশ্ন। অশালীন কে ঠিক করবে? আইন, নাকি যে পুলিশ সদস্যটি তখন সামনে দাঁড়িয়ে আছেন?
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ঘটনাটায় আসা যাক। রাজধানীর মধ্যে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শতাধিক মানুষ ঢুকে কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর করেছে। লুটপাট হয়েছে। এক্সক্যাভেটর এনে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের নাম এসেছে। পুলিশ পরে গ্রেপ্তার করেছে, মালামাল উদ্ধার করেছে, একজন ওসিকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সরকার দল তাদের একজন সংসদ সদস্যকে (সংরক্ষিত নারী আসন) পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। খোদ রাজধানীতে কয়েক শ মানুষ জড়ো হলো কী করে, একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকল কী করে, কয়েক ঘণ্টা ধরে সেটাকে ভাঙল কী করে, এক্সক্যাভেটর নিয়ে এল কী করে, এবং এই পুরো সময়টায় রাষ্ট্র কোথায় ছিল?
একটা ভবন ভাঙতে তো পাঁচ মিনিট লাগে না। শত শত মানুষ জড়ো করতেও সময় লাগে। এক্সক্যাভেটর আকাশ থেকে নামে না। এত বড় ঘটনা ঘটার পর যদি আমরা শুধু বলি পরে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাহলে প্রশ্নের অর্ধেকটাই করা হয়। যদিও সরকার দেরিতে হলে এ ক্ষেত্রে নিজেদের দলের সংসদ সদস্যকে রাজনৈতিক দায়মুক্তি দেয়নি।
কট্টর ডানপন্থী অ্যাকটিভিস্ট আতাউর রহমান বিক্রমপুরী তাঁর নিজের ফেসবুকে লিখেছেন তাঁর প্রথম স্ত্রীর বয়স বিয়ের সময় তেরোর নিচে ছিল এবং বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে তাঁদের প্রথম সন্তান হয়। আরেক পোস্টে তিনি চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ের বিয়ের পক্ষেও কথা বলেছেন। বাংলাদেশের আইনে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮। তাহলে কেউ প্রকাশ্যে এমন কথা বললে, এই কাজ করলে তা তো স্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন।
এই আইনের লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান কি বিক্রমপুরীর কাছে জানতে চাইবে না তিনি কেন আইন ভাঙলেন এবং তা নিয়ে এমন বড়াই করছেন, অন্যকে আইন ভাঙতে উৎসাহিত করছেন। এমন একটা আইন, যে আইনের সঙ্গে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা জড়িত। আমরা অনেক সময় ধর্মীয় বক্তব্যের সঙ্গে আইনকে গুলিয়ে ফেলি। কেউ ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিতে পারেন। কেউ বলতে পারেন আইন বদলানো উচিত, বিক্রমপুরী তা বলতে পারেন। সেটা তাঁর অধিকার। কিন্তু আইন ভেঙে তিনি সোশ্যাল মিডিয়াতে এসে বড়াই করতে পারেন না। তখন আইনের শাসন কোথায় থাকে?
এরপর এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে সর্বশেষ সংযোজন ইউপিএল। বাংলাদেশের অন্যতম নামকরা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বাংলাবাজারে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র। সেখানে দুজন যুবক গেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কিনতে। দোকানের কর্মীরা বই বের করে দিলেন। এরপর ওই দুজনই প্রশ্ন তুললেন, এই বই বিক্রি হচ্ছে কেন। তাঁদের দাবি, বইটি নিষিদ্ধ। বইটি নিষিদ্ধ না। এরপর আরও লোক জড়ো হলো। দোকানের শাটার নামানো হলো। তালা লাগানো হলো। ইউপিএলের দুই কর্মীকে ধরে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। যাঁরা দোকান বন্ধ করলেন, তাঁদের আটক করা হলো না। যাঁরা বই বিক্রি করছিলেন, তাঁদেরই পুলিশ ফাঁড়িতে বসতে হলো।
আরও অদ্ভুত বিষয় হলো, সূত্রাপুর থানার ওসি প্রথম আলোকে বলেছেন, ওই বই আর বিক্রি না করার শর্তে কর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন শর্ত দেওয়ার সাহস একজন পুলিশ কর্মকর্তা পেলেন কোথা থেকে? বই নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা কি থানার ওসির আছে?
ওই দুই যুবকের নাম এখনো আমরা জানি না। তাঁদের পূর্ণ পরিচয়ও প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু যদি পুলিশ জানে তাঁরা কারা, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন পর্যন্ত আমরা পাইনি।
এই ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে অন্তত দুটি প্যাটার্ন দেখা যায়। প্রথমটি হচ্ছে, কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তা আইন প্রয়োগ করার বদলে নিজের ব্যক্তিগত মোরাল জাজমেন্ট প্রয়োগ করেছেন, যা সরাসরি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করে। বিমানবন্দরে একজন কর্মকর্তা ঠিক করছেন একজন অবিবাহিত নারী একা বিদেশ যেতে পারবেন কি না। মেট্রোরেলে একজন পুলিশ সদস্য ঠিক করছেন একজন পুরুষ হাফপ্যান্ট পরে ট্রেনে উঠতে পারবেন কি না। ইউপিএলের ক্ষেত্রে একজন ওসি এমন একটা বই বিক্রি না করার শর্তের কথা বলছেন, যে বই নিষিদ্ধই না।
এগুলো ছোটখাটো ভুল না। কারণ, এই মানুষগুলোর হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে। একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য এখানেই। একজন সাধারণ নাগরিক আরেকজন নাগরিককে বলতে পারেন আপনার হাফপ্যান্ট তাঁর পছন্দ না। আপনি তাঁকে পাত্তা না দিয়ে চলে যেতে পারেন। কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য একই কথা বললে সেখানে ক্ষমতার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। একজন আত্মীয় বলতে পারেন, ‘তুমি অবিবাহিত, একা বিদেশ যেয়ো না।’ আপনি ইগনর করতে পারেন সেই আত্মীয়কে। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা একই কথা বললে আপনি দেশই ছাড়তে পারবেন না। এই পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কি আসলেই এই পার্থক্য বুঝতে পারছি?
দ্বিতীয় প্যাটার্নটা হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস। মিরপুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নাম সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে এসেছে। ইউপিএলের ঘটনায়ও থানার ওসি বলেছেন, যারা সেখানে গিয়েছিল তারা স্থানীয় বিএনপির লোক। আমি এটা বলছি না যে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে কাউকে হাসপাতাল ভাঙতে বলেছে বা ইউপিএলের দোকানে তালা দিতে বলেছে। এমন কোনো তথ্য–প্রমাণ নেই। বরং যতটুকু দেখা যাচ্ছে, এগুলো স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উদ্যোগে ঘটেছে। কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই।
একটা সরকার প্রতিটি স্থানীয় কর্মীর মাথার ভেতরে কী চলছে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কোনো দলও তার প্রতিটি সমর্থকের প্রতিটি কাজ আগে থেকে জানতে পারবে না। কিন্তু সরকার একটা জিনিস করতে পারে: খুব পরিষ্কার করে দিতে পারে যে দলের পরিচয় ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে নিলে রেহাই নেই। এই মেসেজটা কি যাচ্ছে?
মিরপুরের ঘটনায় পরে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেটা ভালো। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটার আগেই কেন থামানো গেল না, সেই প্রশ্ন থাকবে। ইউপিএলের ঘটনায় তো প্রশ্নটা আরও সরাসরি। দুজন ব্যক্তি একটি বৈধ বই বিক্রির দোকান বন্ধ করে দিলেন অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিল না। বরং বই বিক্রেতার কাছেই শর্তের কথা বলা হচ্ছে। এখানেই সরকারের ধীর প্রতিক্রিয়া একটা সমস্যা তৈরি করে। কারণ, ক্ষমতা শুধু সরকারি আদেশ দিয়ে কাজ করে না। ক্ষমতা অনেক সময় সিগন্যাল দিয়ে কাজ করে। যদি একজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী বুঝতে পারেন তিনি একটা দোকানে তালা লাগালেও খুব বেশি কিছু হবে না, সেটা একটা সিগন্যাল। যদি একজন কর্মকর্তা মনে করেন একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশযাত্রা তাঁর মর্জির ওপর নির্ভর করে, সেটাও একটা সিগন্যাল। আর এই সিগন্যালগুলো একসময় নীতি তৈরি করে, যা নাগরিকের অধিকার খর্ব করে।
এই ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে, ক্ষেত্রবিশেষে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে, যেমন মিরপুরের ঘটনায় সরকার দলের সংসদ সদস্য পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আবার ক্ষেত্রবিশেষে সরকার ব্যবস্থা নেয়নি। যেমন প্রকাশনা সংস্থার বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করার ক্ষেত্রে পুলিশ উদ্যোগ নেয়নি। সরকারের ব্যর্থতা ইচ্ছাকৃত নাকি অলসতা, সেটা নিয়ে পরে আলাপ করা যাবে।
কিন্তু একটা ব্যর্থতা এখনই চোখে পড়ছে। আর তা হলো, সরকার এখনো যথেষ্ট জোরে এই মেসেজ দিতে পারেনি যে রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, পুলিশি পোশাক বা ব্যক্তিগত নৈতিক বিশ্বাস—কোনোটাই আইনের বিকল্প না, নাগরিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। দেশে আইনের শাসন সবার ওপরে। রাষ্ট্র যদি এই কথাটা পরিষ্কার করে না বলে তাহলে খুব দ্রুত বিপদ বাড়বে। যেখানে আইন বইয়ে থাকবে, কিন্তু রাস্তায় চলবে জোর যার মুল্লুক তার। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমার প্রশ্ন: বাংলাদেশে শেষ কথা কে বলবে, আইন, নাকি যার হাতে এই মুহূর্তে বেশি ক্ষমতা আছে?
আসিফ বিন আলী যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল ফেলো
মতামত লেখকের নিজস্ব
