শিশুশিক্ষার্থীদের মধ্যে দুপুরের খাবার বিতরণ একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ খাদ্যের মান নিয়ে। দেওয়া হচ্ছে পচা ও কাঁচা কলা, নিম্নমানের বানরুটি, নষ্ট-দুর্গন্ধযুক্ত সেদ্ধ ডিম। দুধের স্বাদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী স্কুলে গিয়ে খোলা হাতে খাবার নিয়ে নাকের কাছে ঘনিষ্ঠভাবে ধরে একনিষ্ঠতার সঙ্গে খাবারের গন্ধ নিয়েছেন। অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। কিছু কিছু পরিবর্তনের কথা বলেছেন। এরই মধ্যে স্কুলে পচা খাবার সরবরাহের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
শিক্ষার্থীদের খাদ্যনিরাপত্তা ও সেবার মান তদারকিতে বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য এবং তিনজন অভিভাবক মা সদস্য হিসেবে থাকবেন।
প্রাথমিকে পড়ুয়া শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং তাদের পুষ্টিসহায়তা দেওয়ার জন্য বিশ্ব খাদ্য সংস্থার উদ্যোগে বাংলাদেশে একসময় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুট দেওয়া হতো। কোভিড মহামারির সময় স্কুল বন্ধ থাকায় সরাসরি স্কুলে বিস্কুট বিতরণ বাধাগ্রস্ত হয়। তখন বাড়িতে খাবার পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিস্কুট নিয়েও সমালোচনা ছিল। ছিল মান নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ। কখনো কখনো বিস্কুটের মান নিয়ে অভিযোগও উঠেছিল।
পুষ্টিগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য শুধু বিস্কুটের বদলে ডিম, দুধ, ফল, খিচুড়ি বা রান্না করা খাবার শিশুদের জন্য বেশি পুষ্টিকর বলে বিবেচিত হয়। এ জন্য সরকার ও বিশ্ব খাদ্য সংস্থা বৈচিত্র্যময় স্কুল মিলের দিকে যেতে চেয়েছিল। স্কুলে স্কুলে কেনা হয়েছিল হাঁড়ি–পাতিল। কোথাও কোথাও চালুও হয়েছিল রান্না করা খাবার বিতরণ।
বিস্কুট কর্মসূচি ছিল দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত। বর্তমান ‘মিড–ডে মিল’ বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচির অর্থায়ন এখন মূলত সরকারিভাবে অনুমোদিত ও সরকারি অর্থায়ননির্ভর।
ঠিকাদারনির্ভর ডিম, কলা, দুধ বিতরণের গলদ কোথায়
দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ জন এবং শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫ জন। সব বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে মিড–ডে মিল চালু করবে সরকার। আপাতত সপ্তাহের পাঁচ দিন পর্যায়ক্রমে প্রতি দুপুরে স্কুলগুলোতে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে দুধ, ডিম, কলা, বিস্কুট ও বানরুটি। একজন শিক্ষার্থীর পেছনে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমান ‘মিড–ডে মিল’ বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সরবরাহকারী নির্বাচন সাধারণত সরকারি ক্রয়নীতি অনুসারে টেন্ডারের মাধ্যমে করা হয়। এটি মূলত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তদারক করে। গোলটা বেধেছে এখান থেকেই। অভিযোগ আছে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। দালালদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। সমালোচকেরা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, সিন্ডিকেট, নিম্নমানের খাদ্য, সাবকন্ট্রাক্ট, ওভারবিলিং এবং দুর্বল তদারকির কথা বলেই চলেছেন। ‘সাবকন্ট্রাক্ট’ এর অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে।
গলদ আছে খাদ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে। কেননা দীর্ঘ সময় ধরে সেদ্ধ ডিমের মান সংরক্ষণ খুবই কঠিন কাজ। ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী সেদ্ধ ডিম ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা (অথবা তাপমাত্রা বেশি হলে এক ঘণ্টা) রাখা যায়। যেহেতু সেদ্ধ করার ফলে ডিমের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক আবরণটি নষ্ট হয়ে যায়, তাই এগুলোতে জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া) সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
পাকা কলা বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন আছে। কৃত্রিম উপায়ে পাকানো কলায় যেসব রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়, সেগুলো অনেক শিশুর হজমপ্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে বা করে। তা ছাড়া কিছু কিছু মানুষের বেলায় বেশি পাকা কলা বা ডিম একসঙ্গে খেলে হজমে সমস্যা হয়। গ্যাসের প্রবণতা থাকলে অস্বস্তি হতে পারে। তবে সেটা ব্যক্তিগত হজমক্ষমতার বিষয়। আগে বহুমূত্র ছিল বড়দের অসুখ, এখন অনেক শিশু এই রোগের শিকার। ডায়াবেটিস থাকলে কলার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা ভালো, কারণ কলায় প্রাকৃতিক চিনি থাকে। সমস্যা আছে দুধেও। অনেক শিশুর ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকে। তারা দুধ পান করলে পেট ফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া, পেটব্যথা বা বমি বমি ভাব অনুভব করে। একজন কোনোভাবে বমি করে ফেললে অন্যদেরও বমি আসে। অনেক সময় দেখা যায় অন্য শিক্ষার্থীরাও হঠাৎ বমি, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গ অনুভব করতে শুরু করে। সব ক্ষেত্রে এটি ‘নাটক’ নয়; অনেক সময় এটি একটি বাস্তব মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া। এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণভাবে গণ হিস্টিরিয়া বলা হয়।
আমাদের স্কুলগুলোতে কোন শিশুর কোন খাবারে অসুবিধা বা অ্যালার্জি আছে, তার কোনো তালিকা রাখার রেওয়াজ নেই। ইদানীং শিশুদের মধ্যেও খাবারে
অ্যালার্জি বাড়ছে। ফুড অ্যালার্জি রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সংস্থার গবেষণা থেকে দেখা যায় যে শিশুদের খাদ্য অ্যালার্জি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০০৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের মধ্যে এর ঘটনা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসের মতে, খাদ্য অ্যালার্জির প্রকোপ উন্নত দেশগুলোর মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। এখন উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোতেও এটি ক্রমে সাধারণ হয়ে উঠছে।
উপায় তাহলে কী
উপায় বের করেছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার তারবাগান গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। ২০২২ সালের পূজার ছুটির পর স্কুলটিতে সরেজমিনে দেখা হয়েছিল জাহাঙ্গীর আলমের মিড–ডে মিল বা কলার পাতায় দুপুরের খাবার কার্যক্রম। সরকারি বরাদ্দ ছাড়াই তিন বছর ধরে তিনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন সব শিক্ষার্থীর জন্য এক বেলা পেট ভরে গরম খাবার কার্যক্রম।
টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে দলে দলে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয় স্কুলমাঠে। তাদের পেছনে পেছনে কলার পাতা হাতে নিয়ে মাঠে আসেন কয়েকজন শিক্ষক। এরপর খোলা আকাশের নিচে সবুজ ঘাসের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয় সেই পাতা। কিছুক্ষণ পরে কলাপাতা সামনে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে লাইনে বসে পড়ে শিক্ষার্থীরা। শুরু করা হয় কলার পাতায় দুপুরের খাবার দেওয়া। এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি। সবটাই সমাজের উদ্যোগ।
১৯৯২ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। বিদ্যালয়টিতে ১৩০ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষক-শিক্ষিকা চারজন। ‘কলার পাতায় দুপুরের খাবার’ কার্যক্রম চালুর আগে প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত থাকত ৬০ থেকে ৬৫ জন শিক্ষার্থী। সেদিন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী হাবিব জানিয়েছিল, ‘ক্লাস শেষে টিফিনের সময় আমরা সবাই একসঙ্গে বিদ্যালয়ে খাবার খাই। একই কলার পাতায় একসঙ্গে একই ধরনের খাবার খেতে আমাদের বেশ ভালো লাগে।’
শিক্ষিকা রোজিনা আক্তার জানিয়েছিলেন, আগে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী স্কুলে ঠিকমতো আসত না। আবার এলেও দুপুরের পর থাকত না। স্কুলে দুপুরের খাবার কার্যক্রম চালু হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা ক্লাসে নিয়মিত থাকছে। এখন উপস্থিত প্রায় ৯৮ শতাংশ।
গ্রামের দুই মায়ের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের ছেলেমেয়েরা স্কুলের শিক্ষার্থী। পালা করে মায়েরা আসেন স্কুলের রান্নায় সহযোগিতা করতে। মায়েরা বাসা থেকে চাল–সবজি স্কুলে দিয়ে যান। সেসব দিয়েই রান্না হয়। জাহাঙ্গীর আলম উদ্ভাবিত তারবাগান মডেল ‘কলার পাতায় দুপুরের খাবার’ কার্যক্রমের মূল শক্তি ছিল গ্রামের মায়েদের সম্পৃক্ততা। কয়েক বছর আগে দেখা সেই সফল কার্যক্রমটিই হতে পারে আমাদের নতুন মডেল।
● গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
wahragawher@gmail. com
মতামত লেখকের নিজস্ব
