আয়েশি ভোটার, সরস্বতীর দৃঢ়তা ও হাদিকে ভুলতে না পারা মানুষ

পুরান ঢাকার গলিতে ভোটকেন্দ্রে ভিড়। আরেক কেন্দ্রে বসে আছেন সরস্বতী ও চান্দা রানী। শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করছেন হাসিবুল হাসানছবি: লেখকের সৌজন্যে

দুপুরবেলা বের হলাম অফিস থেকে। সকালে একচক্কর রামপুরা এলাকায় দুটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে ভোটারের লাইন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে বুঝতে পারলাম—মর্নিং শোজ দ্য ডে। তারপরও দুপুরের পর বের হলাম, দিন শেষে ভোটের পরিবেশ কেমন হয়, সেটি দেখা দরকার। ফাঁকা ঢাকা। আগের দিনই এক রিকশাচালক বলেছিলেন, ‘স্বাধীনের পর কত ভোট দেখলাম, ঢাকা শহর এমন খালি হইতে দেখি নাই।’ ঈদের মতো উৎসবমুখরতায় মানুষ ঢাকা শহর থেকে গ্রামে-মফস্‌সলে ফিরেছেন।

রিকশায় করে ঘুরতে ঘুরতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে পুরান ঢাকা পৌঁছে গেলাম। এরই মধ্যে এক নতুন ভোটারের সঙ্গে দেখাও হয়ে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খন্দকার গোলাম মওলা। তিনি জানালেন, প্রথম ভোটের উত্তেজনায় সারা রাত ঘুমাতে পারেননি। সকালে কয়েক জায়গায় ফোনও দিয়েছেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কী করবেন, কীভাবে ভোট দেবেন। প্রথম ভোটারের ভোট দেওয়ার এ উত্তেজনা ও আনন্দ দেখার মতোই।

মাঘ মাস শেষ হতে আর এক দিন বাকি। এরপর বসন্ত। কার্জন হল দিয়ে যেতে যেতে কোকিলের ডাক ভেসে এল কানে। আরামদায়ক এক রোদ্দুরে দিন। পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার এলাকায় ঢুকতেই অন্য এক পরিবেশ। ভোটের আমেজে হুমড়ি খাওয়ার দশা। মহল্লায় মহল্লায় উৎসব লেগে গেছে যেন। দোকানপাট সব বন্ধ। কাচ্চির ঘ্রাণও নেই। ফলে মানুষের ভিড় হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু ভোটের দিন গলিঘুপচির সব মানুষ যেন বের হয়ে এসেছেন রাস্তায়।

একদিকে বাপ-চাচাদের গ্রুপের আড্ডা। আরেক দিকে তরুণদের আড্ডা। ভোট দিতে-আসতে দেখা হয়ে যাওয়ার আড্ডা। ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে ভিড়, লম্বা লাইন। কোথাও কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই। সুশৃঙ্খল বলতে আক্ষরিক অর্থে যা বোঝায়, তা-ই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সদা সতর্কতায়। রাস্তায় কয়েক মিনিট পরপর সেনা টহল। পুরান ঢাকার ছোট অলিগলিতে মানুষের আড্ডা আর ভিড়ের কারণেও সেনা টহলের গাড়ি থেমে যায় অবস্থা।

বেলা দুইটা বাজে প্রায়। এ সময় ভোটকেন্দ্র কিছুটা ফাঁকা থাকার কথা। কিন্তু পুরান ঢাকার নিয়ম তো ভিন্নই হবে! নাজিরাবাজার চৌরাস্তায় এক চিপা গলির মুখে ঘিঞ্জি ভবনের ভেতর এক মাদ্রাসায় ভোটকেন্দ্রে ঢুকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, ‘সকালে কম ভোটার ছিল। বোঝেন তো, পুরান ঢাকা। এরা হচ্ছে আয়েশি মানুষ। সারা রাত জমজমাট। সকালবেলা ঘুমায়। যে কারণে দুপুরবেলা ভিড় বেড়ে গেছে।’ ভোটারের চাপে বেচারা বেশিক্ষণ কথাও বলতে পারলেন না।

বাইরে লাইনে দাঁড়ানো নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা হলো। নীলুফার ইয়াসমিন নামের এক তরুণী জানালেন, ভোটার হয়েছেন আগেই। কিন্তু ভোট দিলেন এবার প্রথম। আগেরবার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও দেননি। ভোট দেওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না।

ভোটের দিন পুরান ঢাকার গলিঘুপচির সব মানুষ যেন বের হয়ে এসেছেন রাস্তায়। রাস্তার এক পাশে বসে চলছে আড্ডা।
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

কেন্দ্রে কেন্দ্রে ঘুরতে ঘুরতে খিদেই মোচড় দিয়ে উঠল পেট। পুরান ঢাকায় এলাম আর কাচ্চি বা তেহারি না খেয়ে ফিরতে হবে, এটি কেমন হয়! তা–ও কয়েকজনের কাছে জানতে চাইলাম, কোথায় কাচ্চির দোকান খোলা আছে। কেউ কয় ওই দিকে, কেউ কয় অন্যদিকে। খোঁজ দ্য সার্চ ফর কাচ্চি। এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে একটা দোকান পাওয়া গেল অবশেষে। অর্ধেক শাটার নামানো। বসে খাবারের ব্যবস্থা রাখেনি। শুধু প্যাকেট সার্ভিস। সেখানে দাঁড়িয়েই খেতে হলো। পুরান ঢাকার মহল্লার তেহারি। তৃপ্তিভরেই খাওয়া গেল। আরেকজনের সঙ্গে মজাও করা গেল—ভোটকেন্দ্রের কাছে টাকা দিয়ে তেহারি খেতে হয়, এমন নির্বাচন কি আমরা চেয়েছিলাম!

খাওয়াদাওয়া শেষে আরেক কেন্দ্রের ঢুকলাম—বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান উচ্চবিদ্যালয়। স্কুল গেট দিয়ে ঢুকেই দেখা মেল এল আকৃতিতে বিশাল দুই ভবন। সামনে মোটামুটি বড় একটা খেলার মাঠ। এই এলাকার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। দুই ভবনে অনেকগুলো বুথ। সব বুথের সামনেই লম্বা লাইন। মানুষ ভোট দিতে আসছেন, ভোট দিয়ে ফেরত যাচ্ছেন। অন্যবারের মতো ডামি ভোটের লাইনের কারবার নেই কোনো। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের ওভারসিজ ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বললেন, ‘অনেকবার ভোট দিয়েছি, এবারের মতো সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ ভোট আগে কখনো দিইনি।’

ভোট দেওয়ার পর্দা ঢাকা কোনার আগে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। মাদ্রাসাপড়ুয়া বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন সোনিয়া আক্তার। বোরকা ও নেকাব পরা। তাঁর পেছনেই শাঁখা–সিঁদুরের সেতারা রানী। ছবি তুলতে চাইলে সেতারা রানী মাথার শাড়ি টেনে নিলেন। পেছনের জানালা দিয়ে পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়ল ঠিক তাঁর মাথা বরাবর। কী সুন্দর একটা আবহ তৈরি হলো। পরনে নতুন ফুলেল শাড়ির উজ্জ্বলতা আরও বাড়িয়ে দিল।

পুরুষদের বুথের দিকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো নতুন ভোটার তরুণ পোলাপানের উচ্ছ্বাস দেখে ভালোই লাগল। আরেক ভবনে নারীদের বুথ। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা হলো। দোতলায় উঠে একটি টুলে বসে আছেন দুজন। নাম জিজ্ঞাসা করলাম। সরস্বতী ও চান্দা রানী। কাছেই মেথরপট্টির বাসিন্দা। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে চাকরি করেন। সরস্বতী নতুন শাড়ি পরে এসেছেন। নাকে নোলক। মুখে আদুরে হাসি। তাঁদের সঙ্গে কথা হলো। সরস্বতী বললেন, ‘কোনো ভোটই বাদ দেই না। কেউ ভয়ডর দেখালেও লাভ নেই। বাঁচলে বাঁচব, মরলে মরব।’ শত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অপ্রাপ্তি ও হতাশার বেড়াজালে সরস্বতীদের এমন দৃঢ়তাই আমাদের আশাবাদী করে তোলে।

বুথের রুমে ঢুকলাম। বাইরের লাইন থেকে একসঙ্গে কয়েকজন কয়েকজন করে ভেতরে নিয়ে আসছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। ভোট দেওয়ার পর্দা ঢাকা কোনার আগে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। মাদ্রাসাপড়ুয়া বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন সোনিয়া আক্তার। বোরকা ও নেকাব পরা। তাঁর পেছনেই শাঁখা–সিঁদুরের সেতারা রানি। ছবি তুলতে চাইলে সেতারা রানী মাথার শাড়ি টেনে নিলেন। পেছনের জানালা দিয়ে পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়ল ঠিক তাঁর মাথা বরাবর। কী সুন্দর একটা আবহ তৈরি হলো। পরনে নতুন ফুলেল শাড়ির উজ্জ্বলতা আরও বাড়িয়ে দিল।

মাদ্রাসাপড়ুয়া বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন সোনিয়া আক্তার। বোরকা ও নেকাব পরা। তাঁর পেছনেই শাঁখা–সিঁদুরের সেতারা রানী।
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

এবার ফেরার পালা। ফায়ার ব্রিগেডের হেডকোয়ার্টারের পাশে আরেকটি ভোটকেন্দ্র দেখে থামলাম। এখানে ভোট দিতে আসছেন আর যাচ্ছেন ভোটাররা। বিভিন্ন প্রার্থীর নেতা-কর্মীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গ্রুপ ছবি তুলছেন। কেন্দ্রে ঢোকার মুখেই এক পাশে সাত মাসের ঘুমন্ত শিশু কোলে এক যুবক দাঁড়িয়ে আছেন। মেহরাব হোসেন। ব্র্যাকের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। পড়াশোনা করেছেন মালয়েশিয়ায়। ভোট দিয়েছেন আরেক কেন্দ্রে। স্ত্রীর কেন্দ্র পড়েছে এ কেন্দ্রে। জানালেন, ২০১৮ সালে প্রথম ভোট দিয়েছেন। চব্বিশে ভোট দেননি। কারণ জানালেন—ফলাফল তো জানাই ছিল, ভোট দিয়ে তো লাভ নেই।

কেন্দ্রের ভেতরে দৈর্ঘ্যে লম্বা খোলা চত্বর। কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়। এক যুগল ভোটার ছবি তুলছেন। নতুন ভোটার এক তরুণীও আঙুলের ছাপের ছবি তুলছেন। ফেসবুকে দেবেন। তাঁর মা লিপি বেগমের সঙ্গে কথা বললাম। জানালেন, শান্তিমতো ভোট দিয়ে ভালো লাগছে তাঁর। চব্বিশে কেন্দ্রে এসেও ভোট দিতে পারেননি। বললেন, আগেই তাঁর ভোট কেউ দিয়ে দিয়েছিলেন।

চারটা বাজে প্রায়। ভোট গ্রহণের সময় শেষ হয়ে এল বলে। বিকেলটাও পড়ে এসেছে। আবার রিকশা নিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়েই। টিএসসি ফেলে শাহবাগের দিকে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের কবরের সামনে থামতেই হলো। এখানেই কবর দেওয়া হয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তরুণ নেতৃত্ব শহীদ ওসমান হাদিকে। ভোটের দিনও মানুষ তাঁর কবর জেয়ারত করতে এসেছেন। লাইন ধরে কেউ দোয়া–দরুদ পড়ছেন, কেউ মোনাজাতে কান্না করছেন।

সেখানে হাসিবুল হাসান নামের এক যুবকের সঙ্গে কথা হলো। ব্যবসা করেন। ওসমান হাদির সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে। বললেন, ঢাকা কলেজের কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। এরপর ছুটে এসেছেন হাদির কবর জেয়ারত করতে। বললেন, ‘বেঁচে থাকলে হাদি তো এ আসন থেকেই নির্বাচন করত। ভাই থাকত আজকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গণতন্ত্রের লড়াইয়ের জন্য, একটা সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের জন্য লড়াই করে গেলেন। জীবনও দিয়ে দিলেন। আজকের দিনে মন মানছিল না। তাই তাঁর কবরের কাছে ছুটে এসেছি।’ সঙ্গে তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে। হাতে ফুলের তোড়া। মুখে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার মাস্ক।

নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রচারণা চালিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন হাদি। কুড়িয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসা। তফসিল ঘোষণার পরদিনই ঘাতকের গুলিতে গুরুতর আহত হলেন। এরপর তো মারাই গেলেন। মনে পড়ে, তফসিল ঘোষণার দিন হাদি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন—নির্বাচন মোবারক। ঈদ উৎসবের মতো সেই নির্বাচন এসেছে ঠিকই। তাঁর সহযোদ্ধারা কেউ কেউ জিতেও এলেন। কিন্তু হাদি থাকল না। থাকতে দেওয়া হলো না। তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা যা-ই থাকুক, গণতান্ত্রিক যাত্রায় এমন এক উদ্যমী, প্রাণচঞ্চল, সাহসী তরুণকে মানুষ ভুলতে পারে না।

হাদির মৃত্যু ঘিরে শোককে ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী দেশের বড় দুটি সংবাদমাধ্যমের ওপর নজিরবিহীন হামলা চালাল। হাদির হত্যাকাণ্ড ও সংবাদমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে বড় দাগই লাগিয়ে দিল।

এসব ভাবতে অফিসে ফেরা হলো। ভোটকেন্দ্রে ঘোরাঘুরি শেষ। এবার অপেক্ষার পালা। কে জেতে, কে হারে। গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা কেমন হবে?

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: [email protected]
    *মতামত লেখকের নিজস্ব