অসুস্থ-অক্ষম ও মুসাফিরের রোজার বিধান

পবিত্র কোরআনের বাণী, ‘আল্লাহ কোনো সত্তাকে তার সামর্থ্যের অধিক দায়িত্বভার চাপিয়ে দেন না।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২৮৬)। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম, স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, সাবালক সব মুসলিম নারী ও পুরুষের জন্য রমজানে পূর্ণ মাস রোজা পালন করা ফরজ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের যারা এ (রমজান) মাস পাবে, তারা যেন তাতে রোজা পালন করে। আর তোমাদের যারা পীড়িত থাকবে ও সফরে থাকবে, তবে অন্য সময়ে তারা এর সমপরিমাণ সংখ্যায় রোজা পূর্ণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তিনি তোমাদের প্রতি কঠিন করতে চান না; যাতে তোমরা আল্লাহর মাহাত্ম্য ঘোষণা করো...।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।

সফরে থাকা অবস্থায়ও কেউ যদি রোজা পালন করেন, তবে তা উত্তম। আর বেশি কষ্ট হলে বা ইচ্ছা করলে রোজা ছাড়তে পারবেন; এই রোজা পরে সুবিধামতো নিকটতম সময়ে কাজা আদায় করে নিতে হবে। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এক রমজানে রোজা অবস্থায় মক্কা শরিফের পথে যাত্রা করলেন। কাদিদ নামক স্থানে পৌঁছার পর তিনি রোজা ছেড়ে দিলে লোকেরা সকলেই রোজা ছেড়ে দিলেন।’ (বুখারি: ১৮২০)।

মুসাফিরের জন্য নামাজেও ছাড় রয়েছে। চার রাকাত ফরজ নামাজগুলো কসর অর্থাৎ দুই রাকাত আদায় করবেন। তখন সুন্নতগুলো নফলের পর্যায়ে চলে যাবে। তবে আদায় করলে সুন্নতের সওয়াব পাবেন

মাজুর বা অসমর্থ বা অক্ষম ব্যক্তিদের জন্যও রয়েছে বিশেষ ছাড়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘সিয়াম বা রোজা নির্দিষ্ট কয়েক দিন। তবে তোমাদের যারা পীড়িত থাকবে বা ভ্রমণে থাকবে, তারা অন্য সময়ে এর সমপরিমাণ সংখ্যায় পূর্ণ করবে। আর যাদের রোজা পালনের সক্ষমতা নেই, তারা এর পরিবর্তে ফিদইয়া দেবে (প্রতি রোজার জন্য) একজন মিসকিনকে (নিজের মান অনুযায়ী এক দিনের) খাবার দেবে। অনন্তর যে ব্যক্তি অধিক দান করবে, তবে তা তার জন্য অতি উত্তম। আর যদি তোমরা পুনরায় রোজা পালন করো, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৪)।

ফিদইয়া অর্থ বিনিময়, মূল্য, পণ বা মুক্তিপণ; বিকল্প বা স্থলাভিষিক্ত; সম্মানজনক প্রতিদান ইত্যাদি। ফিদইয়া প্রদান করার পর যদি পরবর্তী রমজানের পূর্বে ওই ব্যক্তি রোজা পালনে সক্ষমতা লাভ করেন, তবে ওই রোজাগুলো কাজা আদায় করতে হবে। ফিদইয়া দেওয়া রোজার কাজা কোনোভাবেই পরের রমজান বা তার পরবর্তী সময়ের জন্য প্রযোজ্য হবে না।

এক দিনের ফিদইয়া একাধিক ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া যাবে, আবার একাধিক দিনের ফিদইয়া এক ব্যক্তিকে দেওয়া যাবে। একাধিক দিনের রোজার ফিদইয়া একত্রেও আদায় করা যায় এবং অগ্রিমও প্রদান করা যায়। এক ব্যক্তির ফিদইয়া একাধিক ব্যক্তিকে এবং একাধিক ব্যক্তির ফিদইয়া এক ব্যক্তিকে প্রদান করা যাবে।

একজনের রোজা আরেকজন রাখতে পারে না, ফিদইয়া রোজার পরিবর্তে রোজা নয়; তাই যাকে ফিদইয়া দেওয়া হলো, তার রোজাদার হওয়াও জরুরি নয়, যেমন নাবালেগ গরিব–মিসকিন শিশু বা অতিবৃদ্ধ দুর্বল অক্ষম অসুস্থ অসহায় গরিব ব্যক্তি, যিনি নিজেও রোজা পালনে অক্ষম।

একেকটি রোজার ফিদইয়ার পরিমাণ হলো এক ফিতরার সমান। ফিতরার পরিমাণ সম্পর্কে হাদিস শরিফে রয়েছে, ‘সদকাতুল ফিতর হলো “এক সা” (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) খাদ্যদ্রব্য। আবুসায়িদ খুদরি (রা.) বলেন, আমাদের খাদ্য-খাবার ছিল খেজুর, কিশমিশ, পনির, যব।’ (বুখারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২০৪-২০৫)।

ফিদইয়া ও সদকা পণ্য বা খাদ্যদ্রব্য দিয়েও আদায় করা যায় এবং এর মূল্য দ্বারাও আদায় করা যায়। তবে গ্রহীতার জন্য যেটা বেশি উপকারী, তা দ্বারা আদায় করা শ্রেয়।

ফিদইয়া প্রদান করা যায় ওই সব লোককে, যারা জাকাত ও সদকার হকদার। কোরআন করিমের বর্ণনা, ‘মূলত সদাকাত হলো ফকির, মিসকিন, সদাকাকর্মী, অনুরক্ত ব্যক্তি ও নওমুসলিম, ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে (ইসলাম সুরক্ষার জন্য), বিপদগ্রস্ত বিদেশি মুসাফির ও পথসন্তানদের জন্য। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও পরম কৌশলী।’ (সুরা-৯ তাওবাহ, আয়াত: ৬০)।

মুসাফিরের জন্য নামাজেও ছাড় রয়েছে। চার রাকাত ফরজ নামাজগুলো কসর অর্থাৎ দুই রাকাত আদায় করবেন। তখন সুন্নতগুলো নফলের পর্যায়ে চলে যাবে। তবে আদায় করলে সুন্নতের সওয়াব পাবেন।

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

  • সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

  • [email protected]