আওয়ামী লীগের আদর্শিক বন্ধু কে

১১ আগস্ট কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের এক জরুরি সভা শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ১৪-দলীয় জোট সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা জাতীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত কি না, কে জানে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের জোট তো নির্বাচনী জোট। সেটা তো কৌশলগত জোট। সেখানে আদর্শের কোনো বিষয় নেই। তাহলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আমরা কেন জোট করেছি? এসব ব্যাপার তো ভাবতে হবে।’

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তাহলে আওয়ামী লীগের আদর্শিক জোট কোনটি? তাদের আদর্শিক বন্ধু কে? এ বিষয়ে দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিলের একটি কথাও মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন, ১৪ দল একসঙ্গে আন্দোলন করবে, একসঙ্গে নির্বাচন করবে এবং একসঙ্গে সরকার গঠন করবে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে ১৪ দলের শরিকদের নিয়ে সরকার গঠন করেছিল, তা-ও কি নিছক কৌশলগত? আওয়ামী লীগ অতীতে আদর্শগত ও কৌশলগত তত্ত্ব সামনে রেখে বহুবার জোট করেছে। আবার ভেঙেছেও।

এখন ওবায়দুল কাদের যা-ই বলুন না কেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে ‘আদর্শিক’ জোট হিসেবেই ১৪ দলের আবির্ভাব ঘটেছিল। ২০০৫ সালের ২২ নভেম্বর পল্টন ময়দানে জনসভা করে তারা ২৩ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। যার মধ্যে ছিল নির্বাচন কমিশনের সংস্কার; কালোটাকা, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা; একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা; দেশকে উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার ও প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে ওই শক্তির অপসারণ; যুদ্ধাপরাধীদের বিচার; সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং ধর্ম, মুক্তচিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। এসবের পেছনে কি কোনো আদর্শ ছিল না?

আওয়ামী লীগ নেতারা এত দিন ১৪ দলকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করে আসছিলেন। এখন তাঁরা বলছেন ১৪ দল আদর্শিক জোট নয়। তাহলে কারা তাদের আদর্শিক মিত্র? কাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ আদর্শের ঐক্য গড়ে তুলতে চায়?

১৪ দলের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ আওয়ামী লীগ আমলেই কিছুদিন পরপর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। গত বছর দুর্গোৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা হয়। কিন্তু কোনোটায় এখনো কেউ শাস্তি পায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের চোখ তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। অনেক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও জমি দখলের অভিযোগ আছে।

প্রশ্ন হলো ২০২৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কৌশলগত ও আদর্শিক জোটসঙ্গী কারা হবে? আওয়ামী লীগ কি ১৪ দলের সঙ্গে ‘কৌশলগত সম্পর্ক’ বজায় রেখে জাতীয় পার্টি ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে আদর্শিক জোট বাঁধবে? জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে অনেক আগেই তারা হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।

এসব বিশ্লেষণ করলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে ১৪ দলের শরিকদের আদর্শিক পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। শরিকদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থা যত নড়বড়েই হোক না কেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেন, এই অপবাদ কেউ দিতে পারবেন না।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তো জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে রাশেদ খান মেনন, জাসদ থেকে হাসানুল হক ইনু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। ২০০৯-১৪ মেয়াদে দিলীপ বড়ুয়াও মন্ত্রী ছিলেন। ১৪ দল যদি আওয়ামী লীগের আদর্শিক জোট না হয়, কীভাবে একসঙ্গে তঁারা সরকার পরিচালনা করলেন?

১৪ দলের শরিক নেতারা এর আগেও সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে পাঠ্যবইয়ে রদবদল, শাপলা চত্বরের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত ও বিচার না হওয়া, হেফাজতের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অলিখিত রাজনৈতিক সখ্য ইত্যাদি নিয়ে তাঁরা যখন সমালোচনায় মুখর ছিলেন, তখনো আদর্শিক–অনাদর্শিক জোটের প্রশ্নটি আসেনি। তাহলে কি জোট শরিকেরা এখন যে টুকটাক সমালোচনা করছে, তা বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই আদর্শের বিষয়টি সামনে আনা হলো?

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ হলো তাদের প্রয়োজনে তারা যেকোনো দলের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে। আবার প্রয়োজন ফুরালে চিনেও চেনে না। পঁচাত্তরের পর রাজনীতির মাঠে ন্যাপ ও সিপিবিই ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান মিত্র। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের শেষ দিকে জাসদসহ আরও কিছু দলকে নিয়ে ৯-দলীয় জোট হলো। এরশাদ আমলে করল ১৫-দলীয় জোট। কিন্তু এরশাদের পতনের পর সেই জোটের সুফল আওয়ামী লীগ নিতে না পেরে একলা চলো নীতি নেয়। আবার খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে তারা জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর যখন দেখা গেল সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা আওয়ামী লীগের নেই, তখন জাতীয় পার্টি ও আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জাসদকে সঙ্গে নিয়ে জোট সরকার গঠন করে।

আওয়ামী লীগের সমালোচনার জবাবে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু একবার বলেছিলেন, ‘আপনারা ১৫ আনা ও আমরা ১ আনা হতে পারি। কিন্তু ওই ১ আনা ছাড়া সরকার গঠন করতে পারবেন না। রাস্তায় ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াতে হবে।’ এককভাবে নির্বাচন করলে কী ফল হয়, সপ্তম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ তার প্রমাণ পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ দল এবং সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করার কৃতিত্ব দাবি করে। অথচ বাংলাদেশে যত ইসলামি দল আছে, তাদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের এবং তার কৌশলগত জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টির ছায়াতলে ছিল এবং আছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে প্রথম আলো ইসলামি দলগুলোর অবস্থান নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিল। এতে দেখা যায়, একসময় বিএনপির ঘনিষ্ঠ একাধিক ইসলামি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলেছে। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলে ওই সময় সক্রিয় ছিল ৭০টি ইসলামি দল ও সংগঠন। এর মধ্যে ২৯টি দল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। ৩২টি দল আছে জাতীয় পার্টির সঙ্গে। আর বিএনপির সঙ্গে ছিল ৫টি দল।

আরও পড়ুন

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে সম্মিলিত ইসলামি জোট নামে নতুন একটি জোট গঠিত হয়। এই জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা জাফরুল্লাহ খান দীর্ঘদিন প্রয়াত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ছিলেন। জোটটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচন করতে চায়। জোটের নেতারা ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকও করেন। (প্রথম আলো, ২৫ নভেম্বর ২০১৮)

প্রশ্ন হলো ২০২৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কৌশলগত ও আদর্শিক জোটসঙ্গী কারা হবে? আওয়ামী লীগ কি ১৪ দলের সঙ্গে ‘কৌশলগত সম্পর্ক’ বজায় রেখে জাতীয় পার্টি ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে আদর্শিক জোট বাঁধবে? জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে অনেক আগেই তারা হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]