পূর্ণাঙ্গ রায়: হাসিনা–মাকসুদ কথোপকথনের ব্যাখ্যা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি অভিযোগে শেখ হাসিনা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথম আলোয় আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম।

সেই নিবন্ধে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের মধ্যে হওয়া একটি আড়ি পাতা কথোপকথন নিয়ে আলোচনা করা হয়।

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আদালতে যে রায়ের অংশবিশেষ পড়ে শোনানো হয়, তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-ট্রাইব্যুনাল ওই কথোপকথনকে এমন একটি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যার মাধ্যমে তাঁরা মনে করেছেন, ওই দিনই শেখ হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা প্রথম অভিযোগের ক্ষেত্রে এই অডিও রেকর্ডিংটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই অভিযোগেই তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগটি ১৪ থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যকার ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।

এই সময়পর্বে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ যে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, তার মধ্যে এই কথোপকথনই একমাত্র সরাসরি প্রমাণ।

আরও পড়ুন

আগের লেখায় আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, ১৪ জুলাইয়ের ওই কথোপকথন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। তবে লেখার শেষে আমি এটাও বলেছিলাম—‘পরিপূর্ণ রায় পাওয়ার পর বোঝা সম্ভব হবে সেখানে ১৪ জুলাইয়ের ফোনালাপ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের যে ভাষ্য এখন পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত আইনি যুক্তি ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি না।’

এখন চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়েছে, ফলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। তা হলো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে যে মোট দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই একটি অডিও কথোপকথনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই।

এমনকি যদি প্রথম অভিযোগটি বাতিলও হয়ে যায়, তাহলেও দুটি অভিযোগে থাকে যাতে তিনি যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

এই দুই অভিযোগের প্রমানের জন্য হাসিনা ও মাকসুদ কামালের মধ্যকার ফোনালাপের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।

তবু এই অডিও রেকর্ডিংটি ট্রাইব্যুনাল যেভাবে ব্যাবহার করেছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিচারকেরা তাঁদের সামনে পেশ করা প্রমাণগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা ও মানসিকতা কতটা রাখেন, তা এর মাধ্যমে বোঝা যায়।

একই সঙ্গে প্রমাণ যদি শেখ হাসিনার (বা অন্য কোনো আওয়ামী লীগ নেতার) পক্ষে যায়, সে ক্ষেত্রে বিচারকেরা কি আদৌ তাঁদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দিতে প্রস্তুত আছেন কি না, সেটিও এর মাধ্যমে বোঝা যায়।

অন্যভাবে বললে, বিষয়টি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, এই ট্রাইব্যুনাল সত্যিই কি একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছেন, নাকি এটি মূলত রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও জনমতের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি “সিলমোহর মারা” প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে; ঠিক যেমনটি ভিন্ন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার আগের ট্রাইব্যুনালগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যেত।

রায়ের ৩৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, তিনি ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যে যেভাবে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হচ্ছে, সেভাবেই তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথন: অভিযোগসমূহ

মাকসুদ ও শেখ হাসিনার মধ্যকার কথোপকথনের বিষয়টি তিনটি অভিযোগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি অভিযোগে বিষয়টি ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

কথোপকথনের একটি অংশ উদ্ধৃত করার পর প্রথম অভিযোগে (রায়ের ৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায়) বলা হয়—‘এভাবে শেখ হাসিনা ওই কথোপকথনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন যে তিনি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

এরপর ওই অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি আলাদা কাউন্ট বা অপরাধ উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে দুটি অপরাধ পুরোপুরি এই কথোপকথনের এমন ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।

একটি অপরাধ হলো—‘আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া’; অন্যটি হলো-‘তাঁর নির্দেশ অনুসারেই আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়েছে’।

দ্বিতীয় অভিযোগেও আড়ি পাতা ওই কথোপকথনের একই অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে লক্ষণীয় হলো, কথোপকথনটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-‘এটি স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল) এবং একই সঙ্গে ইংল্যান্ডে এ ধরনের আন্দোলনের সময় যেভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনভাবেই তাঁদের হত্যা করার নির্দেশও দিয়েছেন।’

আর তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-এই কথোপকথনে শেখ হাসিনা ‘উল্লেখ করেছেন, তিনি আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল)।’

এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তৃতীয় অভিযোগে ‘হত্যার নির্দেশ’ দেওয়ার কোনো কথা উল্লেখ করা হয়নি।

আরও পড়ুন

ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত

তাহলে এই কথোপকথন নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত কী ছিল?
৪৫০ পৃষ্ঠার রায়ের পুরো নথিতে ট্রাইব্যুনাল এই রেকর্ডিংটির অর্থ বা ব্যাখ্যা নিয়ে আলাদা কোনো বিশ্লেষণ দেননি। বরং দুটি জায়গায় ট্রাইব্যুনাল সরাসরি সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন।

রায়ের ৩৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, তিনি ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যে যেভাবে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হচ্ছে, সেভাবেই তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

বাস্তবে এটি দ্বিতীয় অভিযোগে ব্যবহৃত ভাষারই প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি। আর রায়ের ৪৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় ওই কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে—‘এটি একেবারেই স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের ‘আসল’ অর্থ

কিন্তু এই রেকর্ডিংগুলো কি সত্যিই এমন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে?
ট্রাইব্যুনাল মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের দুটি আলাদা অংশ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

কিন্তু রায়ে এই কথোপকথন নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ না থাকায়, কোন অংশটিকে প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন, সেটি স্পষ্ট নয়।

দুটি অংশ মিলিয়েই ট্রাইব্যুনাল এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন কি না, তা-ও এখানে পরিষ্কার নয়।

এ কারণে এখন আমরা কথোপকথনের প্রতিটি অংশ আলাদা করে পর্যালোচনা করব।
কথোপকথনের প্রথম অংশে শেখ হাসিনার জবানিতে বলা হয়েছে, ‘রাজাকার তো ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও তাই করব। একটাও ছাড়ব না, আমি বলে দিছি।’

তবে শেষের অংশের বাক্যটি-‘আমি বলে দিছি’-বিভিন্ন অর্থ বহন করে এবং একাধিকভাবে এর অনুবাদ করা সম্ভব। এটি হতে পারে-‘আমি তাদেরকে বলেছি’; ‘আমি আগেই বলেছি’ বা ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি।’

এই বাক্যটি ব্যবহার করে হাসিনা ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে; এটি চূড়ান্ত রায়ে স্পষ্টও হয়ে ওঠে। অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময় এবং ট্রাইব্যুনালের নিজেদের সিদ্ধান্তে (যেমন ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে) এই বাক্যটি ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।

আবার রায়ে কথোপকথনের পূর্ণ অনূদিত ট্রান্সক্রিপ্ট বা প্রতিলিপিতে সেই একই বাক্যটিকে ‘আমি তোমাকে বলেছি’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। রায় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কেন এক প্রসঙ্গে এক অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এবং অন্য প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থে নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের সরাসরি প্রসঙ্গ, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি ভালোভাবে দেখতেন বা বিবেচনা করতেন, তাহলে তাঁর পক্ষে এটি যৌক্তিকভাবে বা যুক্তিসংগতভাবে বলা কঠিন হতো যে ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ বাক্যটি দিয়ে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ দিয়েছেন।

প্রথমত, কথোপকথনের মধ্যে আসা ‘নির্দেশ’ শব্দটি মূলত রাজাকারদের ফাঁসির উদাহরণ প্রসঙ্গে এসেছে।

এখানে হাসিনা যা বলছিলেন, সেটি ছিল অতীতের ঘটনা-যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর যেসব নেতার কথা তিনি উল্লেখ করছিলেন, তাঁদের আটক, গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ, এটি কোনো স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি যাতে মনে হয়, হাসিনা আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করার, বিচার করার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা বা নির্দেশ দিয়েছিলেন কিংবা সরকারের মধ্যে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, যদি ধরেও নেওয়া হয়, ট্রাইব্যুনাল বিশ্বাস করেছিলেন যে, হাসিনা রূপকভাবে কথাটি বলছিলেন এবং তাঁর ‘রাজাকারদের ফাঁসি’ উল্লেখ করা মানে ছিল ছাত্র আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া (যেমনটা বিচারকেরা মনে করছেন)।

তারপরও এমন ব্যাখ্যার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ, কথোপকথনের বাস্তব অর্থ বা তার প্রভাব দেখার মতো এমন কোনো তথ্য বা নথি নেই, যা বলে হাসিনা আসলেই আন্দোলনকারীদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

যদি সত্যিই এমন কোনো আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তা কার কাছে পৌঁছেছিল? রাষ্ট্রপক্ষ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি যে ১৪ জুলাইয়ের কথোপকথনের আগে বা ঠিক এই কথোপকথনের পরই কাউকে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবে অন্তত পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) তা জানানো হতো; কিন্তু আইজিপির স্বীকারোক্তি বা ট্রাইব্যুনালের সামনে তাঁর দেওয়া সাক্ষ্য এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তৃতীয়ত, ১৪ জুলাই হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছেন-এই ধারণা রাষ্ট্রপক্ষের পেশ করা প্রমাণের সঙ্গে মিলছে না এবং তা হয়তো কিছুটা বিরোধপূর্ণও। কারণ, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের প্রমান গ্রহন করেছেন যে, ১৮ জুলাই হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

১৮ জুলাইয়ের এই আদেশের প্রমাণ একটি স্পষ্ট আড়ি পাতা কথোপকথন এবং আইজিপির সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত। তাহলে কি রাষ্ট্রপক্ষ এবং ট্রাইব্যুনালের দাবি অনুযায়ী হাসিনা একই আদেশ দুবার দিয়েছেন?

চতুর্থত, পরের দিনগুলোয় যা ঘটেছে, তা দেখায়, ১৪ জুলাই ‘হত্যার আদেশ’ দেওয়া হয়েছিল-এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

কারণ যদি ১৪ জুলাই আসলেই এমন আদেশ দেওয়া হতো, তাহলে তার পরের দিন ১৫ জুলাই স্বাভাবিকভাবেই কোনো না কোনো হত্যার ঘটনা প্রত্যাশিত হতো। কিন্তু ১৫ জুলাই কোনো হত্যার ঘটনা ঘটেনি। তবে ১৬ জুলাই পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

এর মধ্যে একটি ঘটেছে রংপুরে, দুটি ঘটেছে ঢাকায় এবং তিনটি ঘটেছে চট্টগ্রামে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বলা হলেও এগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বিত হত্যার নীতি নয়, বরং বিক্ষিপ্ত গুলির ঘটনা হিসেবে বোঝানো অনেক বেশি যৌক্তিক।

দ্বিতীয় অংশ

তবে সম্ভবত ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের দ্বিতীয় অংশটিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে।

দ্বিতীয় অংশটি হলো: ‘সব এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে...আমি বলে দিচ্ছি আজকে সহ্য করার পর অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেয়ার নেবে...কারণ ইংল্যান্ডে এ রকম ছাত্ররাজনীতির জন্য মাঠে নামল, কতগুলি মেরে ফেলায় দিল না?’
কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এই কথাগুলোকে অনুবাদ করেছেন এভাবে: (“They all have to be ousted. I already ordered to arrest them after waiting this day to take appropriate action as same as that that of England where protesting students were killed. ”) ‘তাদের সবাইকে অপসারণ করতে হবে। আজ পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমি ইতিমধ্যেই তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছি এবং ইংল্যান্ডে যেভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’

এই অনুবাদের মাধ্যমে এমন একটি ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে তিনি শুধু শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশই দেননি, বরং ইংল্যান্ডে যা ঘটেছিল, (যেখানে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল বলে বলা হয়ে থাকে), সেই রকম ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন।

এ কথাগুলোর অর্থ ট্রাইব্যুনাল যেভাবে অনুবাদ করেছে তাতে ভাষার পরিপূর্ণ চিত্র আসেনি। আর এই বক্তব্য থেকে প্রমান মেলে যে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন-এমন ব্যাখ্যা করা কঠিন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এভাবেই দেখেছেন কথোপকথনের এই অংশকে।

এই বাক্যের একটি অংশ অবশ্যই স্পষ্ট। হাসিনা যখন বলেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি’, তখন তিনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশের কথাই বলছেন। এবং বাস্তবে সেটিই কয়েকদিনের মধ্যে ঘটেছিল। তিনি এ কথা বলছিলেন সরাসরি সেই ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখেন।

তবে এই বাক্যে হাসিনা যা কিছুই বলেছেন, তার মধ্যে “...আজকে সহ্য করার পরে অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে” কথগুলো আছে।
যেখানে ‘যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে’ বলতে হত্যার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; কিন্তু তারপরও এটি মোটেও পরিষ্কার করে না, তিনি ১৪ জুলাই বা ঠিক তার পরপরই এ ধরনের নির্দিষ্ট ‘হত্যার আদেশ’ দিয়েছিলেন।

এর পাশাপাশি কথোপকথনের প্রথম অংশের প্রসঙ্গে ওপরে যেভাবে বলা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, এ ধরনের কোনো আদেশ আদৌ দেওয়া হয়েছিল, এমন দাবি না কথোপকথনের পটভূমি সমর্থন করে, না এটি রাষ্ট্রপক্ষের নিজস্ব প্রমাণ।

কথোপকথনের এই অংশে হাসিনা যা বলছেন, সেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে হত্যা করার আদেশ হিসেবে না দেখে বরং তাঁর চিন্তার ধারাবাহিকতা হিসেবে বোঝাই বেশি যুক্তিসংগত হবে। অর্থাৎ, তিনি তখন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন-সে বিষয়ে ভাবছিলেন এবং সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছিলেন।

এই চিন্তাভাবনার ধারাই শেষ পর্যন্ত ১৮ জুলাইয়ের একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে গিয়ে শেষ হয়-যেদিন তিনি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমোদন দেন।
এই ১৮ জুলাইয়ের আদেশটি নিয়ে পর্যাপ্ত ও শক্ত প্রমাণ রয়েছে (আড়ি পাতা কথোপকথন, সাক্ষ্য ইত্যাদি)।

উপসংহার

রায়ে হাসিনা-মাকসুদ কথোপকথন নিয়ে কোনো বিশদ আলোচনা নেই। ফলে ট্রাইব্যুনাল কীভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল কিংবা উল্লিখিত বিষয়গুলো তাঁরা আদৌ বিবেচনা করেছেন কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই।

সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যকে পুরোপুরি ও প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করেছেন।

যেহেতু কথোপকথনটি প্রথম অভিযোগের জন্য মূল ও কেন্দ্রীয় প্রমাণ এবং যেহেতু এর ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনাল যে অর্থে নিয়েছে তার থেকে ভিন্ন ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বিচারকদের সিদ্ধান্তের যুক্তি ব্যাখ্যা না করাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

  • ডেভিড বার্গম্যান সাংবাদিক।
    ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david. bergman.77377
    ইংরেজি থেকে অনূদিত।

*মতামত লেখকের নিজস্ব।