সাবধান! অস্ট্রেলিয়ার কৃষি ভিসা নিয়ে প্রতারণার নতুন ফাঁদ

বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি কোনো কৃষি ভিসা নেইছবি: রয়টার্স

কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার মুঠোফোন যেন একটি প্রশ্নের দপ্তর হয়ে উঠেছে। সকালে ঘুম ভাঙলেই বার্তা, দুপুরে দেশ থেকে ফোন, রাতে মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপে আরও কয়েকটি। কেউ চেনা, কেউ একেবারে অচেনা। কেউ ভাতিজার জন্য জানতে চান, কেউ নিজের জন্য। প্রশ্ন ঘুরেফিরে একটাই, ‘ভাই, অস্ট্রেলিয়া নাকি কৃষিকাজের ভিসা দিচ্ছে?’ গলার সুরে চাপা উত্তেজনা, যেন এবার সত্যিই সুযোগ এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই ছবি। কোথাও লেখা, ‘বাংলাদেশি কৃষিশ্রমিকদের জন্য দ্রুত ভিসা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া’, কোথাও দাবি, অভিজ্ঞতা বা ইংরেজির সনদ ছাড়াই ১০-১৫ দিনে ভিসা মিলবে। তাই শুরুতেই স্পষ্ট করে বলি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই ভাবছেন, কোনো এক জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বুঝি অস্ট্রেলিয়ার বিশাল খামারগুলোর দরজা বাংলাদেশিদের জন্য খুলে গেছে। কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলি—বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি কোনো কৃষি ভিসা নেই। দালাল চক্রের এই রমরমা বাণিজ্যটি আদ্যোপান্ত একটি ভয়ংকর প্রতারণা।

আরও পড়ুন

তবে গুজবটা শূন্য থেকে জন্মায়নি। এর পেছনে একটি খবর আছে আর দালালেরা সেটাকেই পুঁজি করেছেন। চলতি বছরের জুলাই থেকে অস্ট্রেলিয়া সরকার বিদেশি তরুণদের ‘কাজ ও ভ্রমণ’ (ওয়ার্কিং হলিডে মেকার) ভিসার প্রক্রিয়াকরণ ধীর করে দেয়। ওদিকে ফসল তোলার মৌসুম দরজায় কড়া নাড়ছে।

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় কৃষক ফেডারেশনের হিসাবে, খামারের প্রতি সাতটি কাজের একটি করেন এই ভিসাধারী তরুণেরা। প্রক্রিয়াকরণ ধীরগতির ফলে স্থানীয় কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হন, তাঁদের সংগঠনগুলো ক্যানবেরায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। চাপের মুখে ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনমন্ত্রী টনি বার্ক ঘোষণা দেন, দক্ষ কর্মীদের ভিসা প্রক্রিয়াকরণের অগ্রাধিকার তালিকায় কৃষি ও মৎস্য খাত যোগ হবে, আর কাজ ও ভ্রমণ ভিসার প্রথম বছরের আবেদন আবার স্বাভাবিক গতিতে নিষ্পত্তি হবে।

কারসাজিটা এখানেই। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে যা ছিল ‘খামারের জন্য দ্রুত ভিসা’, বাংলাদেশে পৌঁছে তা হয়ে গেল ‘বাংলাদেশিদের জন্য কৃষি ভিসা’। অথচ ওই ঘোষণা নতুন কোনো দরজা খোলেনি; যাঁরা আগে থেকেই যোগ্য এবং নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক শুধু তাঁদের ব্যাপারে বলা হয়েছে।

বরং একই বক্তৃতায় মন্ত্রী জানিয়েছেন, কাজ ও ভ্রমণ ভিসার দ্বিতীয় বছরের জন্য এখন থেকে লটারি হবে, আসন ৪৫ হাজার; গত বছর যোগ্য হয়েছিলেন প্রায় ৫৭ হাজার জন। তৃতীয় বছরের আসন মাত্র ৫ হাজার, যেখানে গত বছর এই দলে ছিলেন প্রায় ৩১ হাজার। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া দরজা খুলছে না, আরও আঁটসাঁট করছে। যে দেশ নিজের পুরোনো অতিথিদের জায়গাই কমাচ্ছে, সে হঠাৎ নতুন একটি দেশের জন্য খামারের দরজা হাট করে খুলে দেবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

তাহলে অস্ট্রেলিয়ার খামারে বিদেশি শ্রমিক আসেন কীভাবে? এর প্রধান পথ প্রশান্ত মহাসাগরীয় শ্রম চলাচল কর্মসূচি, সংক্ষেপে ‘পাম’। মন্ত্রী বার্ক নিজেই বলেছেন, কৃষির মূল ভিসা এটিই। এই কর্মসূচি খোলা কেবল ৯টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ ও তিমুর-লেস্তের জন্য-ফিজি, কিরিবাতি, নাউরু, পাপুয়া নিউগিনি, সামোয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, টোঙ্গা, টুভালু ও ভানুয়াতু। মৌসুমি কাজে একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ ৯ মাস আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এক থেকে চার বছর থাকতে পারেন। কর্মী বাছাই হয় ওই দেশগুলোর সরকারি শ্রম প্রেরণ দপ্তরের মাধ্যমে।

আরও পড়ুন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি কর্মসূচির সরকারি ওয়েবসাইটেই লেখা আছে: এতে যোগ দিতে কাউকে টাকা বা উপহার দিতে হয় না, নিয়োগকর্তা শুরুতে বিমানভাড়ার খরচ বহন করেন। একবার ভাবুন, আসল কর্মসূচিতেই যেখানে টাকা দেওয়ার নিয়ম নেই, সেখানে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনায় বসে যিনি ‘কৃষি ভিসা’র নামে লাখ লাখ টাকা চাইছেন, তিনি কোন কর্মসূচির প্রতিনিধি?

দালালেরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন কাজ ও ভ্রমণ ভিসার নাম। বলা হচ্ছে, বয়স আঠারো থেকে ত্রিশের মধ্যে হলেই আবেদন করা যাবে। কথাটি অর্ধসত্য, আর অর্ধসত্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক। এ ভিসা পান কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিক। এর দুটি ধরন, সাবক্লাস ৪১৭ ও ৪৬২; বাংলাদেশ কোনোটিতেই নেই। প্রতিবেশী ভারত তালিকায় ঢুকেছে ২০২৪ সালে, দুই দেশের বাণিজ্যচুক্তির সূত্র ধরে তা-ও লটারির মাধ্যমে। এমন তালিকায় ঢুকতে দুই সরকারের মধ্যে বছরের পর বছর আলোচনা চলে। কোনো দালালের সুপারিশে কেউ সেখানে জায়গা পায় না।

প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসার বৈধ কোনো পথ নেই। উত্তর হচ্ছে অবশ্যই আছে কিন্তু কোনোটিরই শর্টকাট নেই। পড়াশোনার ভিসা, দক্ষ অভিবাসনের ভিসা এবং নিয়োগকর্তার মনোনয়নে কাজের ভিসা রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর নিয়োগকর্তানির্ভর সাময়িক ভিসাটির নাম ‘চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা ভিসা’ (সাবক্লাস ৪৮২)। এগুলোর জন্য অনুমোদিত তালিকার পেশা, দক্ষতার প্রমাণ, কাজের অভিজ্ঞতা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং আইন মেনে স্পনসর করার মতো যোগ্য নিয়োগকর্তা প্রয়োজন। ফল তোলা বা খেত পরিষ্কারের মতো সাধারণ কাজের জন্য বাংলাদেশ থেকে লোক আনার কোনো সহজ এবং সরাসরি পথ একদম নেই। উপরন্তু, সরকার বর্তমানে অভিবাসনের লাগাম টেনে ধরেছে, ফলে বৈধ ভিসাপ্রাপ্তির হারও এখন অনেক কম।

ভিসা আসল কি না, তা যাচাই করাও কঠিন কিছু নয়। ভিসা মঞ্জুর হলে অনুমোদনপত্রে একটি নম্বর থাকে, যা অস্ট্রেলিয়ার সরকারি যাচাই সেবা ‘ভেভো’-তে মিলিয়ে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনসংক্রান্ত পরামর্শ দিতে হলে নিবন্ধন লাগে। কেউ যদি নিবন্ধিত অভিবাসন পেশাজীবীর নম্বর দেখাতে না পারে, ভিসার সাবক্লাস এবং বিস্তারিত বলতে না পারে কিংবা ‘দশ দিনে ভিসা’র কথা বলে তবে সেখানেই আলাপ শেষ করা উচিত। আজকাল নিত্যনতুন কারসাজি দেখা যাচ্ছে, তাই সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ‘ভেভো’তে দেখা গেলেও আরও যাচাই-বাচাই করা উচিত।

অন্যদিকে, এই প্রতারণা ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারেরও জরুরি ভূমিকা নেওয়ার আছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের উচিত নিয়মিত ও স্পষ্ট ভাষায় সতর্কবার্তা প্রচার করা। দীর্ঘ মেয়াদে ‘কাজ ও ভ্রমণ’ ভিসার তালিকায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার কূটনৈতিক চেষ্টাও চালানো যেতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অস্ট্রেলিয়া যখন অভিবাসন কমানোর পথে হাঁটছে, তখন সেই চেষ্টা হয়তো সহজে ফল দেবে বলে মনে হয় না।

প্রতিদিন যাঁরা নানা মাধ্যমে আমার কাছে খবর জানতে চান, তাঁদের সবার কণ্ঠে একটা আশা থাকে। সেই আশা ভেঙে দিতে ভালো লাগে না। কিন্তু মিথ্যা আশায় জমি বিক্রি করে দালালের হাতে সর্বস্ব তুলে দেওয়ার চেয়ে আজকের এই রূঢ় বাস্তবতা মেনে নেওয়া অনেক ভালো। যে দরজা খোলেনি, তার চাবি কেউ বিক্রি করতে এলে বুঝে নেবেন, আসল চাবিটা রয়েছে আপনার নিজের হাতেই—আর সেটি হলো সচেতনতা; প্রতারণার ফাঁদে পা না দেওয়া।

  • কাউসার খান প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অস্ট্রেলিয়ার নিবন্ধিত অভিবাসন পরামর্শক

মতামত লেখকের নিজস্ব