সংগঠনটির মহাসচিব এম এ নাসের আক্ষেপ করে বলছিলেন, গ্রাম পুলিশের সদস্যদের মানবেতর জীবন দেখে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ উদ্যোগে জাতীয় বেতন স্কেলে তাঁদের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭৬ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পরিপত্রও জারি করেছিল। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। দাবির পক্ষে বহু বছর ধরে তাঁরা আন্দোলন করছেন। দফাদারদের জাতীয় বেতন স্কেলের ১৯তম গ্রেড ও মহল্লাদারদের ২০তম গ্রেডে বেতনের দাবিতে তাঁরা প্রেসক্লাবের সামনে সমবেত হয়েছিলেন।

গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে দৈনিক ভিত্তিতে একজন কামলা বা দিনমজুরের মজুরি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। ৫০০ টাকা হিসাবে একজন কামলার মাসিক মজুরি দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকা। অবশ্য মাসে ৩০ দিন কাজের সুযোগ বা সক্ষমতা সব সময় থাকে না। মাসে যদি ২৫ দিন কাজ করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে একজন কামলার মাসে মজুরি দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সেখানে গ্রাম পুলিশের একজন মহল্লাদারের বেতন সাড়ে ছয় হাজার টাকা। আর দফাদারের বেতন সাত হাজার টাকা।

বর্তমানে এই বেতনে কীভাবে চলা সম্ভব? তাঁদের জীবনযাপন কতটা কঠিন ও অসহনীয় তা সহজে অনুমেয়। গ্রাম পুলিশের সদস্যরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) অধীনে কাজ করেন। ইউপি চেয়ারম্যান তাঁদের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের (এসিআর) অনুবেদনকারী এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রতিস্বাক্ষরকারী।

বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসির এক ভিডিও প্রতিবেদনে ঢাকার সমাবেশে আসা মো. জান্নাতুল ফেরদৌস নামে গ্রাম পুলিশ সদস্যকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীর কাছে করুণ আকুতি জানাতে দেখা গেল। তিনি বলেন, বৃদ্ধ বয়সে চাকরি শেষে তাঁরা কোনো পেনশন পান না। তখন তাঁদের ভিক্ষা করে, ভ্যান চালিয়ে খেতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁদের একটি মাত্র চাওয়া—চাকরি জাতীয়করণ; আর কিছু চান না।

গ্রাম পুলিশের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঘেঁটে ও গ্রাম-পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় সাধারণত নয়টি ওয়ার্ড থাকে। প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে গ্রাম পুলিশের সদস্য থাকেন, সেই পদের নাম মহল্লাদার। নয়টি ওয়ার্ডের নয়জন মহল্লাদারকে মনিটর করার জন্য জ্যেষ্ঠ একজন গ্রাম পুলিশ সদস্য থাকেন। তিনি দফাদার। মহল্লাদার পদে চাকরির জন্য সাধারণত অষ্টম শ্রেণি পাস বা সমমানের যোগ্যতা লাগে। আর ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে মহল্লাদার থেকে দফাদার পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।

সরাসরি দফাদার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিক পাস বা সমমানের যোগ্যতা থাকতে হয়। মহল্লাদারদের সাড়ে ৬ হাজার টাকা বেতনের মধ্যে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা এবং বাকি ৩ হাজার ২৫০ টাকা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া হয়।

ইউপির নানা কাজের ব্যস্ততায় অন্য কোনো কাজ করে অর্থ আয়ের সুযোগ মেলে না। ফলে অল্প বেতনে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে মা, স্ত্রী, প্রতিবন্ধী বোনকে নিয়ে তিনি অশান্তির মধ্যে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাম পুলিশের সদস্যদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র দেখতে কি পায় সরকার, শুনতে কি পায় তাঁদের কান্না?

একইভাবে দফাদারদের সাত হাজার টাকা বেতনের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার টাকা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং বাকি সাড়ে তিন হাজার টাকা সংশ্লিষ্ট ইউপি থেকে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও আবার ইউনিয়ন পরিষদের বেতনের অংশ অনিয়মিত। অর্থাৎ ইউপি অংশের বেতন বকেয়া রাখা হয়। একে তো বেতন কম, তার মধ্যে যদি বেতনের অর্ধেক অংশ বকেয়া থাকে, তাহলে তাঁদের কষ্ট ও দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা থেকে ঢাকায় সমাবেশে এসেছিলেন গ্রাম পুলিশের সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করে গ্রাম পুলিশের চাকরিতে ঢোকেন। আনোয়ারুল বলেন, প্রতিদিন সকাল নয়টার মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে জাতীয় পতাকা তুলতে হয়, ঝাড়ু দিতে হয় অফিস। এলাকার জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। সপ্তাহে এক দিন থানায় প্রতিবেদন দিতে হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে। মাসে এক দিন ইউএনও কার্যালয়ে কাজ করতে হয়। এ ছাড়া ইউপির নানা কাজের ব্যস্ততায় অন্য কোনো কাজ করে অর্থ আয়ের সুযোগ মেলে না। ফলে অল্প বেতনে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে মা, স্ত্রী, প্রতিবন্ধী বোনকে নিয়ে তিনি অশান্তির মধ্যে আছেন।

এমন পরিস্থিতিতে গ্রাম পুলিশের সদস্যদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র দেখতে কি পায় সরকার, শুনতে কি পায় তাঁদের কান্না?

  • তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোর সহসম্পাদক
    [email protected]