মহল্লার রায় ও ব্যালট বাক্স: তৃণমূল রাজনীতির ভেতরের গল্প

রাজশাহী–৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগম। লিফলেট হাতে পেয়ে প্রেস থেকেই বিলি শুরু করেন। রাজশাহী হকার্স মার্কেটছবি: প্রথম আলো

খুলনা শহরের ইসলামনগর এলাকায় প্রতিদিন আসরের নামাজের পর একটি আড্ডা বসে, ভাঙে এশার আজানে। ৫ ঘণ্টার এই আড্ডায় ২০ থেকে ২৫ জন প্রবীণ বসে চা খান, এলাকার খবর নেন, পারিবারিক বিরোধ মেটান, কখনো আবার সিদ্ধান্ত দেন কে ভালো মানুষ, কাকে বিশ্বাস করা যায়, এমনকি কাকে ভোট দেওয়া উচিত। গত মাসে সেখানে বসে একজন প্রবীণকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এলাকার তরুণেরা কি এখনো আপনাদের কথা শোনে? তিনি একটু থেমে বললেন, ‘আগে শুনত। এখন ছেলেপেলে ফেসবুকে যা দেখে, সেটাই সত্য। আমাদের কথা শোনার সময় কোথায়?’

এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনীতির গভীর এক রূপান্তর।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ‘ইয়ুথ পলিটিকস ইন বাংলাদেশ’ গবেষণার মাঠকর্মে খুলনা অঞ্চলে ঘুরে আমরা দুটি সমান্তরাল রাজনৈতিক কাঠামো দেখেছি। একটি দৃশ্যমান, দলীয় কমিটি, নির্বাচনী ইশতেহার, পোস্টার ও প্রচারণা। আরেকটি অদৃশ্য, মহল্লার আড্ডা, পারিবারিক প্রভাব, মুরব্বিদের রায়। প্রথমটি নিয়ে সংবাদপত্রে লেখা হয়, কিন্তু দ্বিতীয়টিই অনেক সময় নির্বাচন জেতায়।

এই বাস্তবতা একই সঙ্গে হতাশাজনক ও আশাব্যঞ্জক। হতাশাজনক, কারণ আমাদের গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো এখনো অনেক ক্ষেত্রে খোলসসর্বস্ব। আশাব্যঞ্জক, কারণ রাষ্ট্রের বাইরেও মানুষ নিজেরা গড়ে তুলেছে এক জটিল কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর দাঁড়ানো।

তাত্ত্বিকভাবে একে বলা যায় ‘মহল’। আত্মীয়তা, প্রতিবেশ, দীর্ঘদিনের লেনদেন ও পারস্পরিক নির্ভরতার জালে বাঁধা মানুষের দল। এখানে ব্যক্তি ভোট দেয় না, মহল ভোট দেয়। আর সেই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করেন কয়েকজন মুরব্বি। ইসলামনগরের আড্ডা এই অর্থে একটি সক্রিয় মহল। সেখানে শুধু রাজনীতি নয়, সামাজিক শাসনও চলে। একজন প্রবীণ বললেন, ‘আমরা কাউকে জোর করি না। কিন্তু যখন বলি অমুক ভালো মানুষ, বেশির ভাগ পরিবার মানে। কারণ, তারা জানে, আমরা এলাকা চিনি, মানুষ চিনি।’ এই ‘মানা’ই মহলের ক্ষমতা।

রাজনীতি কেবল টেলিভিশনের বিতর্ক বা ফেসবুক পোস্ট নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, বিশ্বাস, সম্পর্ক ও পাশে থাকার গল্প। তরুণদের রাজনীতি যদি সত্যিই বিকল্প হতে চায়, তবে শহরের আলো ছেড়ে গ্রামের উঠানে, বাজারের চায়ের দোকানে, মানুষের জীবনের ভেতরে যেতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত ভোট পড়ে সেখানেই, যেখানে আড্ডা বসে, সম্পর্ক গড়ে, আর মানুষ একসঙ্গে চা খেয়ে তর্ক করেও আবার একসঙ্গে হাঁটে।

এই আড্ডায় জানা গেল, এলাকার একজন দীর্ঘদিন জাসদ করতেন, পরে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। কীভাবে? একজন বললেন, ‘রাজনীতি তো শুধু যুক্তির ব্যাপার নয়, সম্পর্কের ব্যাপার। ও আমাদের সঙ্গে বসত, কথা শুনত, আস্তে আস্তে আমাদের মতো ভাবতে শুরু করল।’ ইশতেহার নয়, জনসভা নয়, প্রতিদিনের চা, উপস্থিতি আর সম্পর্কই এখানে রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়।

তবে এই কাঠামোয় এখন ফাটল ধরছে, আর সেই চাপ আসছে তরুণদের দিক থেকে। খুলনায় এলাকাভেদে তরুণদের আলাদা আড্ডা আছে, যেখানে ফেসবুক, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ মুরব্বির বিকল্প হয়ে উঠছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এক তরুণ বলল, ‘আমি পরিবারের কথা শুনব, আবার শুনবও না। আমার নিজের মাথা আছে।’

এই ‘নিজের মাথা’ই কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগে রাজনৈতিক তথ্য আসত ওপর থেকে নিচে, মুরব্বি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে তরুণ। এখন তা আসছে সমবয়সীদের মধ্য দিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়া ও বন্ধুবান্ধবের নেটওয়ার্কে। একটি ভাইরাল ভিডিও ২০ বছরের কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

এই দ্বন্দ্ব জাতীয় রাজনীতিতেও দৃশ্যমান। এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ যখন বলেন, ‘আমার বাবা রাজমিস্ত্রি ছিলেন। আমার কোনো বড় বংশপরিচয় নেই, ’ তিনি মূলত এই মহলভিত্তিক রাজনীতিকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁর বিপরীতে চারবারের নির্বাচিত এমপি। কিন্তু হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরেই বলা হয়, ‘যার বংশপরিচয় নেই, সে নাকি এমপি হবে!’ এই তির্যক মন্তব্য দেখায়, পারিবারিক পুঁজি এখনো রাজনীতির বড় মাপকাঠি।

খুলনায় এক বিএনপি নেতা বললেন, ‘আমি যখন রাস্তা দিয়ে যাই, মানুষ বলে, অমুকের ছেলে যাচ্ছে। এই সম্মান আমার বাবা রেখে গেছেন।’ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই সম্মানই রাজনৈতিক পুঁজি, যা ছাড়া মাঠে নামা তরুণদের লড়াই দ্বিগুণ কঠিন।

তবে পুরোনো কাঠামো একেবারে অনড় নয়। জুলাই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, আড্ডা থেকেই বিপ্লব সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গুরুবার আড্ডা’ থেকে জন্ম নেওয়া ছাত্র আন্দোলন তার প্রমাণ। স্লোগানটি যেন এই রূপান্তরের সারাংশ, ‘আড্ডা থেকে জুলাই’। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস্তবতা আরও কঠিন। সুন্দরবন–সংলগ্ন দাকোপ ও কয়রায় মহাজনের দাদনপ্রথা ভোটের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এক জেলে বলেন, ‘আমি সাহেবের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি। উনি যদি বলেন, অমুককে ভোট দাও, আমি “না” বলব কীভাবে?’

এখানে মুরব্বির সামাজিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক নির্ভরতা, যা সিদ্ধান্তকে অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত করে। জাতীয় নির্বাচন সামনে। বড় দলগুলো মাঠে নেমেছে। কিন্তু বিআইজিডি পরিচালিত জরিপ বলছে, ভোটের মাঠে এখনো পুরোনো দলগুলোর দাপট। নতুন রাজনৈতিক দলগুলো শহরে আলোচিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমান, কিন্তু মানুষের জীবনে, চায়ের দোকানে, মহল্লার আড্ডায় তাদের উপস্থিতি সীমিত। তরুণদের দল নিয়ে মানুষের আশা আছে, আবার সন্দেহও আছে।

রাজনীতি কেবল টেলিভিশনের বিতর্ক বা ফেসবুক পোস্ট নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, বিশ্বাস, সম্পর্ক ও পাশে থাকার গল্প। তরুণদের রাজনীতি যদি সত্যিই বিকল্প হতে চায়, তবে শহরের আলো ছেড়ে গ্রামের উঠানে, বাজারের চায়ের দোকানে, মানুষের জীবনের ভেতরে যেতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত ভোট পড়ে সেখানেই, যেখানে আড্ডা বসে, সম্পর্ক গড়ে, আর মানুষ একসঙ্গে চা খেয়ে তর্ক করেও আবার একসঙ্গে হাঁটে।

  • মেহরাব হোসেন মাঠ গবেষণা সহকারী, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব