টেকসই গণতন্ত্র চাইলে রাজনীতিতে সহনশীলতা থাকতেই হবে

রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই বা কৌশল নয়। এটি নৈতিকতা ও সহনশীলতারও এক অনন্য সমন্বয়। এটিকে গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি দীর্ঘ যাত্রা হিসেবে দেখা যায়।

এই দীর্ঘ যাত্রায় ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, আঞ্চলিক ও শ্রেণিগতভাবে বহুমাত্রিক বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতিগোষ্ঠীর বহুত্ববাদী মতাদর্শ এবং ভিন্নতাকে ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বহুত্বকে তখনই ধারণ করা যায়, যখন রাজনীতিতে সহনশীলতার চর্চা জারি থাকে।

আর তা না হলে সেই সমাজ ক্রমে সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর রাষ্ট্রও একটি একপক্ষীয় ও বর্জনমূলক নীতি বাস্তবায়নে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহনশীলতার ঘাটতি কেবল ভাষাগত বা আচরণগত সমস্যা নয়; বরং এটি রাজনীতিতে সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও প্রতিহিংসার ধারাবাহিকতা।

সহনশীলতার সংকটের চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক মেরুকরণের মাধ্যমে। এটি আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে দেখে আসছি।

সহনশীলতা না থাকলে রাজনীতি জনসেবার মানদণ্ড থেকে একটি নিষ্ঠুর ও অর্থহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সেখানে যুক্তি নয়, শক্তিই শেষ বিবেচনা হয়ে পড়ে। এতে করে রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য যখন নতুন নেতৃত্বের ‍সুযোগ করে দিয়েছিল, তখন আমরা সেই তরুণ রাজনীতিক, নতুন রাজনৈতিক দল এবং ভবিষ্যতের নেতাদের মধ্যে সহনশীলতার চর্চা দেখতে চেয়েছি, যার ভিত্তিতে তাঁরা একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়বেন। কেননা গণমানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর অন্যতম একটি উপায় হলো সহনশীলতার চর্চা ও ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা।

তবে নতুন রাজনৈতিক দল কিংবা তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে আমরা প্রতিশ্রুতি দেখলেও, অনেকের মধ্যে সেই সহনশীলতার চর্চা দেখতে পাইনি। এটি আমাদের জন্য একটি হতাশার বিষয়। তাঁদের বিকাশের একটি অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও স্বল্প সময়ে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নিজেদের গ্রহণযোগ্যতাকে অনেকেই বিতর্কিত একটি জায়গায় নিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আক্রমণাত্মক ও ঘৃণার ভাষার ব্যবহার প্রায়ই যেন সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে যায়, যা অনেকাংশেই হয়ে উঠেছে একটি স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গি।

অনেক তরুণ রাজনীতিকদের মধ্যে তাই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার চেয়ে ক্ষমতার আজ্ঞাবহ জীবনের মোহই অধিক দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতা কিংবা দেশ চালানোর মোহ থাকা কোনো খারাপ বিষয় নয়। কিন্তু ক্ষমতার মোহ যদি রাজনৈতিক আদর্শ ও বাস্তবতা–বিবর্জিত হয় তখন তাকে অযাচিতই বলা যায়।

রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সহনশীলতার বহিঃপ্রকাশ না থাকলে মানুষের মনেও রাজনীতিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এর সঙ্গে রয়েছে ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার ও ‘ট্যাগিং’ এর রাজনীতি। বিরোধীদের নানাভাবে লেবেল করা বা ট্যাগিং করা যেন বিগত দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

জুলাই–পরবর্তীতেও তেমন চর্চা দেখা আমাদের জন্য পীড়াদায়ক। প্রয়োজন ছিল ভিন্নমতাবলম্বীদের কী করে আমাদের সমাজব্যবস্থায় মানিয়ে চলার একটি ব্যবস্থা করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া। অথচ সে বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না, যে দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো ভিন্নমতাবলম্বীদের কীভাবে আশ্রয় দেবে, যে বিষয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা জরুরি। কেননা ভিন্নমতাবলম্বীরাও এ দেশেরই একটি বড় অংশ, তাদের বাদ দিয়ে একটি স্থিতিশীল সমাজ গড়ে উঠবে না।

একটি সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গড়ার জন্য এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। আর এর প্রকট অভাব বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আমরা দেখতে পাই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আক্রমণাত্মক ও ঘৃণার ভাষার ব্যবহার প্রায়ই যেন সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে যায়, যা অনেকাংশেই হয়ে উঠেছে একটি স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গি।

যে ব্যঙ্গাত্মক ও অন্যকে আঘাত করার রাজনৈতিক ভাষা বিগত আওয়ামী শাসনামলে বিরোধী বা ভিন্ন মতাদর্শের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের জন্য যেন একটি স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তেমন প্রকাশভঙ্গি আমরা বর্তমান সময়ে প্রত্যাশা করি না।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে প্রকাশ্যে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার না করার মতো যে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কথা আমরা সব সময় বলে আসি, তার চর্চা একজন রাজনীতিককে অন্য একটি উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এটি কেবলই ভদ্রতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং একে দেখা যায় রাজনৈতিক সহনশীলতার একটি ইতিবাচক চর্চা হিসেবে।

আরও পড়ুন

এ প্রসঙ্গে আমরা সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট ডাল–এর কাজের উদাহরণ নিয়ে আসতে পারি, যেখানে তিনি বলেন, বর্তমান যুগের প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীল আচরণ, যেখানে বিরোধীকে শত্রু হিসেবে না দেখে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলাকে অত্যাবশ্যকীয় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সদ্য প্রয়াত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার ভাষার সংযত ব্যবহার, রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও শিষ্টাচারের চর্চা একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখতে পাই। বছরের পর বছর রাজনীতি চর্চার মধ্য দিয়ে যেমন এই গুণাবলি একজন রাজনীতিক রপ্ত করতে পারেন, একইভাবে সামাজিকভাবেও সেই গুণাবলি একজনের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে।

তবে এই ধরনের গুণকে দীর্ঘ সময় ধরে লালন করতে শিখতে হয়, যা এক দিনের রাজনৈতিক চর্চায় গড়ে ওঠে না।

রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা গুণাবলির সঙ্গে যুক্ত থাকে নীতিগত ও আদর্শিকভাবে আপসহীন থাকা। এটি আমরা আবারও দেখতে পাই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে। সামরিক শাসন কিংবা বিগত দশকজুড়ে আওয়ামী শাসনের সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে তিনি তাঁর অবস্থান বদলাননি। বারবার কারাবরণ, মামলা ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি রাজনীতির ময়দান ছাড়েননি; এমনকি তিনি দেশ ছেড়ে যাননি। আর তাই তো ‘বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই’—এমন বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে গেছে, যেন খালেদা জিয়াকে নিয়ে যেকোনো আলোচনায় এটিই সবার সামনে চলে আসে। ম্যাক্স ওয়েবার হয়তো এমন চারিত্রিক দৃঢ়তাকেই বলেছিলেন বিশ্বাস ও নীতির প্রশ্নে আপস না করা।

আরও পড়ুন

আমরা যদি বাংলাদেশের অন্যান্য ক্যারিশমেটিক বা কিংবদন্তি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জীবন পর্যালোচনা করি, তাহলেও দেখতে পাই রাজনৈতিক জীবন মানেই নানা প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতা। সেই কঠিন অভিজ্ঞতা তরুণদের জন্য যে শিক্ষণীয় বার্তা নিয়ে আসে তা হলো, রাজনীতিতে রাতারাতি সাফল্য আসে না, রাজনীতি এক দীর্ঘ যাত্রা ও সহনশীলতার পরীক্ষা।

এ দিক দিয়েও তরুণ রাজনীতিকদের সহনশীলতার চর্চা ও ধৈর্যের প্রমাণ দিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকার কারণে আমরা বারবার সামরিক শাসন, রাজনৈতিক দমন, গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্বসহ নানা প্রতিকূলতা দেখতে পাই, যা আমাদের রাজনীতিকে নানাভাবে পিছিয়ে দিয়েছে।

এর ফল আমরা তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনীতি একটি নেতিবাচক বিষয় হিসেবে চিত্রায়িত হওয়ার মাধ্যমে দেখতে পাই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহনশীলতার চর্চা আমরা যদি জারি রাখতে না পারি তাহলে কেবলমাত্র ক্ষমতার পালাবদল হলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল ঘটবে না। সহনশীলতার চর্চার প্রত্যাশাও আমাদের জন্য অধরাই থেকে যাবে।

মনে রাখতে হবে, সহনশীল ভাষা দুর্বলতার লক্ষণ নয় বরং এটি আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রকাশ। আমরা যে প্রতিশোধের রাজনীতি বিগত সময়ে দেখে আসছি, এখনই সময় এই দুষ্টচক্র ভাঙার।

ভিন্নমতের দমন নয় বরং সব মতের সহাবস্থানই যেন হয় আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার মূলনীতি। যাঁরা ভবিষ্যতের রাজনীতি গড়তে চান, তাঁদের জন্য এই দৃঢ়তা ও সংযমের সমন্বয় হবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

  • বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

    *মতামত লেখকের নিজস্ব