মাননীয় জেলা প্রশাসক, নীলফামারীর সব নদী কি বিলুপ্ত হবে

খেড়ুয়া নদী, গোমনাতি, ডোমার, নীলফামারী। অযত্নে প্রবল প্রবহমান নদীটির করুণ দশা

নীলফামারী জেলার দু–চারটি নদী ছাড়া প্রায় সব কটি নদী আমি সরেজমিন দেখেছি। এ জেলার নদীগুলো সুরক্ষার জন্য আমরা সাংগঠনিকভাবে কাজও করছি।

সম্প্রতি কয়েক দিন নীলফামারী গিয়েছিলাম। এক দিন সঙ্গে ছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিভারাইন পিপল ক্লাবের সমন্বয়ক ছাওমুন পাটোয়ারি। সেদিন আমরা যে বাসে উঠলাম, সে বাসে কোনো সিট নেই। পরের বাসে গেলে আধা ঘণ্টা নষ্ট হবে ভেবে বাসে দাঁড়িয়ে নীলফামারী গেলাম।

যাওয়ার সময় খাড়-ভাঁজ-বুল্লাই, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, নেংটিছেঁড়া, চিকলি, বাগডোকরা, স্বরমঙলা/সর্বমঙলা নদী পেরিয়ে আমরা পৌঁছাই নীলফামারীতে। উল্লিখিত নদীগুলো নীলফামারী জেলা দিয়ে প্রবাহিত। অধিকাংশ নদীই শুকিয়ে গেছে, মূল অংশে ধান চাষ হচ্ছে।

নীলফামারী জেলা শহরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন রিভারাইন পিপলের নীলফামারী জেলা সমন্বয়ক আবদুল ওয়াদুদ, বামনডাঙ্গা নদী শাখার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমসহ যমুনেশ্বরী, দেওনাই, শালকি এবং কলমদার নদী সুরক্ষা কমিটির সংগঠকেরা।

আমরা রিভারাইন পিপলের পক্ষে নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কাছে বামনডাঙ্গা নদী সুরক্ষার দাবিসংবলিত অনুরোধপত্র প্রদান করি। বামনডাঙ্গা নদীর পারেই গড়ে উঠেছে নীলফামারী জেলা শহর।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১১ সালে ৪০৫টি নদীর পরিচিতিমূলক বই প্রকাশ করেছে। বইটিতে বামনডাঙ্গা নদীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে কয়েক বছর আগে নদীটির কিছু অংশ খনন করা হয়েছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২৩ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের নদ-নদী; সংজ্ঞা ও সংখ্যা শীর্ষক গ্রন্থের ৬৩২ সংখ্যক নদীটি বামনডাঙ্গা।

স্থানীয় লোকজন দাবি করে আসছেন, এই নদী ব্যক্তির নামে লিপিবদ্ধ হয়েছে। শত শত বছরের পুরোনো একটি নদী কীভাবে সম্পূর্ণটাই ব্যক্তির নামে লিপিবদ্ধ, তা রহস্যজনক।

আমরা রিভারাইন পিপলের পক্ষে তাই জেলা প্রশাসকের কাছে নদীর প্রবাহের সম্পূর্ণ জমি নদী তথা সরকারের নামে লিপিবদ্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে পত্র দিয়েছি।

তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে আমরা নীলফামারী জেলা শহর থেকে আরও ৪৫-৫০ কিলোমিটার দূরে নদী দেখতে চলে যাই। বিভিন্ন নদীকর্মীদের সঙ্গে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল হকও সরেজমিন নদী পরিদর্শনে ছিলেন।

আরও পড়ুন

গুপ্তবাসিনী নামে একটি নদী দেখলাম। নদীটি এতটাই শীর্ণকায় যে লাফ দিয়ে পার হওয়া সম্ভব। নদীর বুকে পানি নেই। নদী তো নয় যেন ধানখেত।

ডোমার উপজেলায় দেখলাম দেওনাই নদীতে সরকারি সাইনবোর্ডে লেখা যমুনেশ্বরী নদী। দেওনাই অনেক ভাটিতে যমুনেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর নাম হয়েছে যমুনেশ্বরী। পূর্বে সেখানে দেওনাই লেখা ছিল।

দেওনাই নদী মূলত খেড়ুয়া এবং পাঙ্ঘা নামের দুটি নদীর মিলিত প্রবাহের নাম। আমরা খেড়ুয়া নদী দেখতে গেলাম। খেড়ুয়া সীমান্তের কাছে কেতকিপাড়া এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পাঙ্ঘা নদী প্রবেশ করেছে চিলাহাটি এলাকা দিয়ে। দুটি নদীতে এখন ধান চাষ হচ্ছে।

নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় সিংহারা নদীতে আরেক বড় সংকট দেখে এলাম। নদীটির মূল প্রবাহ বন্ধ করে ভিন্ন দিক দিয়ে প্রবাহিত করা হয়েছে। পুরোনো প্রবাহের অংশ এখন নদীখেকোদের পেটে। বুড়িতিস্তা নদীর বুকে ধু ধু বালুচর।

নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার পাঙ্ঘা নদীতে ধান চাষ হচ্ছে
নদীগুলো সুরক্ষার জন্য জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এলজিইডি, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত চেষ্টা প্রয়োজন। এই কাজটি কেবল খুব সহজে করতে পারেন নীলফামারী জেলা প্রশাসক। কিন্তু তিনি কি নদীগুলো সুরক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন?

ডিমলা উপজেলায় নাউতারা নামের যে নদীটি আছে, সেটিতে আগে বারো মাস পানি থাকলেও এখন জলশূন্য। একই অবস্থা কুমলাই নদীর। এ নদীর উৎস এবং মিলনস্থল ছিল তিস্তা। পানি উন্নয়ন বোর্ড উৎসমুখ এবং মিলনমুখ বন্ধ করে দিয়েছে। শুটিবাড়ি নামক স্থানে এ নদী দখল করে বাজার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সরকারি কর্মকর্তার নিজস্ব বাড়ি, স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সম্প্রতি রিভারাইন পিপল কুমলাই নদী সুরক্ষায় ১০ দফা দাবিতে নীলফামারীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে। এ নদীতে সেতুবিহীন আড়াআড়ি একাধিক সড়কও আছে। ‘বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর তথ্যাদি হালনাগদকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মসূচির কাজ করছে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)।

আরও পড়ুন

৩০ এপ্রিল ২০২৪–এ বিষয়ের ওপর একটি কর্মশালা রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থাপনপত্রে কুমলাই নদীসহ অনেক নদী সম্পর্কে ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। ধুম নামের নদীটির অবস্থাও ভালো নয়। সৈয়দপুর পৌরসভার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খড়খড়িয়া নদীতে প্রচুর ময়লা–আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।

চারা, চারালকাটা নদী নীলফামারী সদর উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত। এ দুটি নদী মৌসুমি নদীতে পরিণত হয়েছে। কিশোরগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত ধাইজান এবং মরা ধাইজান নদীর বিশেষ পরিচর্যা জরুরি। ইছামতী নদীর অবস্থাও তথৈবচ।

নীলফামারী জেলার সবচেয়ে বড় নদী তিস্তা। নীলফামারী জেলা দিয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ নদীর শাখা নদী ঘাঘটকে তিস্তা নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তিস্তা নদীর অবস্থা ভয়াবহ করুণ। তিস্তা নদীর উপনদী ছিল আউলিয়াখান। এ নদীটিকেও পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। চুঙ্গাডাঙ্গা, বুড়িখোড়া, সুই নদীও মরণাপন্ন।

আমরা এখন পর্যন্ত নীলফামারীতে ৩৬টি নদীর সন্ধান পেয়েছি। এর একটি নদীকেও বলা যাবে না যে মোটামুটি ভালো আছে। প্রতিটি নদীর অবস্থাই খুব করুণ। দীর্ঘদিনে অবহেলায়, অযত্নে, দখলে, দূষণে নদীগুলোর প্রাণ ওষ্ঠাগত। সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা হচ্ছে নদীগুলো সুরক্ষায় সরকারি কোনো পদক্ষেপ নেই।

২০১৯ সালে রিভারাইন পিপলের উদ্যোগে নদীপারের স্থানীয় লোকজনের লড়াই–সংগ্রামে শাখা দেওনাই নদীটি অবৈধ দখল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। রিভারাইন পিপলের প্রচেষ্টায় চেকাডারা নদীর অবৈধ কিছু স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আর উল্লেখযোগ্য কাজ দেখা যাচ্ছে না।

নদীগুলো সুরক্ষার জন্য জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এলজিইডি, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত চেষ্টা প্রয়োজন। এই কাজটি কেবল খুব সহজে করতে পারেন নীলফামারী জেলা প্রশাসক। কিন্তু তিনি কি নদীগুলো সুরক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন?

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর অভিভাবক ঘোষণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে তাদের সেই সক্ষমতা নেই। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জন্যও একই কথা। নদীর সর্বনাশ করার ধারাবাহিক চেষ্টা প্রতিহত করার জন্য নদীবিষয়ক সংগঠনগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এককথায় নদীর সার্বিক সুরক্ষায় সরকার তার দায়িত্ব পালন না করলে পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত হতে হবে।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক