অস্থিরতা থেকে রাজনীতিবিদেরা যেভাবে ফায়দা লুটেন

পিট হেগসেথ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধ নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে অস্থিরতাকে রাজনীতির শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করা যায়। সংকটকে কাজে লাগিয়ে নেতারা একদিকে নিজেদের সমর্থকদের আনুগত্য ধরে রাখতে পারেন, অন্যদিকে তাদের ওপর খরচের বোঝাও চাপিয়ে দেন। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতেও তাঁরা ব্যবহার করেন ভয়, চাপ এবং অনিশ্চয়তা।

কানাডীয় অর্থনীতিবিদ রোনাল্ড উইনট্রোব তাঁর আসন্ন গবেষণায় এই ব্যবস্থাকে ‘ঠগতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন। ‘ঠগতন্ত্র’ হলো এমন একধরনের শাসনব্যবস্থা, যেখানে জোরজবরদস্তি, ভয় দেখানো আর অপ্রত্যাশিত আচরণই মূল ভিত্তি।

আরও পড়ুন

গত তিন মাসে এই যুদ্ধের চরিত্র ছিল অদ্ভুত রকমের ওঠানামায় ভরা। কখনো মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরিস্থিতি চরম উত্তেজনা থেকে আবার শান্তির দিকে গেছে। হুমকি, হামলা, নিষেধাজ্ঞা, ক্ষয়ক্ষতি, আবার হঠাৎ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা—সবই ঘটেছে চোখের পলকে।

যেমন এপ্রিলের ৭ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক ঘণ্টা আগেই সতর্ক করেছিলেন, ‘আজ রাতেই এক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’ অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হঠাৎ সুর বদলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন এবং দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে।

এ ধরনের সংঘাত বোঝার জন্য প্রচলিত কূটনীতি বা প্রতিরোধের তত্ত্ব খুব একটা কার্যকর নয়। এখানে উইনট্রোবের ঠগতন্ত্র ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, এটি দেখায় কীভাবে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ, অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এর ফলে যুদ্ধের খরচ আর লাভ সমাজের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয় না। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠী তাদের অর্থ, তথ্য আর প্রভাবের কারণে অস্থিরতা থেকে লাভ তুলতে পারে। আর সাধারণ মানুষকে এর মাশুল দিতে হয়। বহন করতে হয় এর মূল খরচ। তবু নেতার সমর্থকেরা বিশ্বাস করতে থাকে, এই ত্যাগ বড় কোনো উদ্দেশ্যের জন্যই প্রয়োজনীয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও মুনাফার এই সম্পর্ক বিশেষভাবে স্পষ্ট। মার্চ মাসে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান পিট হেগসেথের সঙ্গে যুক্ত এক ব্রোকার ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে একটি প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক বিনিয়োগ তহবিল কেনার চেষ্টা করেছিলেন। অভিযোগটি বিতর্কিত হলেও বড় ছবিটা পরিষ্কার। সেটি হলো ক্ষমতার কাছাকাছি যাঁরা থাকেন, তাঁরাই আগে থেকে ধাক্কার আভাস পান, নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন এবং পরে সেই অস্থিরতা থেকেই লাভ করেন। এমনকি পূর্বাভাসভিত্তিক বাজার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকেই এখন একধরনের বেচাকেনার সম্পদে পরিণত করেছে।

শুধু আর্থিক খাতেই নয়, বাস্তব সম্পদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ট্রাম্প বারবার ইরানের তেল দখলের হুমকি দিয়েছেন এবং খার্গ দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করার কথা বলেছেন। এতে বোঝা যায়, কৌশলগত সিদ্ধান্তের ভেতর কতটা গভীরভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন

বাণিজ্যনীতিও এখানে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাবে, তাদের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করা হবে। নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের সঙ্গে এই বাণিজ্যিক পদক্ষেপগুলো মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একধরনের সমন্বিত কৌশল, যার লক্ষ্য শুধু ইরানকে দুর্বল করা নয়, বরং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানো।

  • মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিবিষয়ক অধ্যাপক

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত