৮১ বছর আগে মার্চ মাসের ১০ তারিখের শীতার্ত প্রত্যুষে জাপানের রাজধানী টোকিওর ওপর উড়ে এসেছিল মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমানের বিশাল এক বহর। সেই বিমানবহরের নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য ছিল না, বরং যে নির্দেশ বিমানচালক ও সহযোগীদের দেওয়া হয়েছিল, তা হলো যে এলাকাটি এখন সুমিদা ওয়ার্ড নামে পরিচিত, টোকিওর সেখানকার আকাশে পৌঁছে যাওয়ার পর বিমানের ভেতরে রাখা মালামাল সেখানে নিচে ফেলে দেওয়া। সেই মালামাল হচ্ছে প্রাণঘাতী আগুনবোমা, যে বোমার আঘাত কেবল নির্দিষ্ট লক্ষ্যকেই গুঁড়িয়ে দেয় না, একই সঙ্গে বড় এক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে দেয় আগুন এবং যে আগুনে পুড়ে মারা যান অসহায় লোকজন।
সেই সময়ে এলাকাজুড়ে ছিল সাধারণ লোকজনের বসবাস এবং বড় ধরনের সামরিক কোনো স্থাপনাও সেখানে ছিল না। এ ছাড়া যুদ্ধের গতি তখন অনেকটাই চলে গেছে জাপানের প্রতিকূলে। ফলে ধরে নেওয়া হয় যে বেসামরিক লোকজনের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করে আত্মসমর্পণের জন্য জাপানের ওপর চাপ প্রয়োগ করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বের লক্ষ্য।
সেই লক্ষ্য তাৎক্ষণিকভাবে অর্জন করা সম্ভব না হলেও সেই এক দিনের বিমান হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল এক লাখের বেশি। অর্থাৎ হিরোশিমা কিংবা নাগাসাকিতে ফেলা আণবিক বোমায় তাৎক্ষণিকভাবে যত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, টোকিওতে এক সকালের বিমান হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল তার চেয়ে বেশি। তবে সেই হতাহত নিয়ে খুব বেশি আজকাল আর বলা হয় না এবং দিনটকে স্মরণ করা হয় অনেকটা স্থানীয়ভাবে। যুদ্ধ আর আরও বেশি মারাত্মক সব অস্ত্রের গুঞ্জন বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা অবস্থায় এই সীমিত স্মরণও হয়ে উঠতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ, যদি কিনা মানুষের বিবেককে জাগ্রত রাখতে সামান্য হলেও তা রেখে যেতে পারে অবদান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুদ্ধ ও সমরাস্ত্র নিয়ে বেশ কিছু পরোক্ষ নিয়ম জাপান মেনে চলে আসছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সংবিধানের নবম ধারা—অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িত হওয়ার অধিকার যেখানে জাপান অস্বীকার করে আসছে।
জাপানের রাজধানী ১০ মার্চ টোকিওর ওপর চালানো সেই বিমান হামলার ৮১তম বার্ষিকী পালন করেছে অনেকটা যেন নীরবে। টোকিওর গভর্নর ইউরিকো কোইকে ও যুবরাজ আকিশিনো সস্ত্রীক সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও ছিলেন না সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রতিনিধি।
ধারণা করা যায়, সেই রাজনীতিবিদদের অনেকেই এখন ব্যস্ত নতুন এক বিল পার্লামেন্টে পাস করিয়ে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি গ্রহণে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুদ্ধ ও সমরাস্ত্র নিয়ে বেশ কিছু পরোক্ষ নিয়ম জাপান মেনে চলে আসছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সংবিধানের নবম ধারা—অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িত হওয়ার অধিকার যেখানে জাপান অস্বীকার করে আসছে।
এর বাইরে তিনটি পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত নীতিকেও শান্তির আদর্শে জাপানের দৃঢ় আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। সেই তিন পারমাণবিক অস্ত্র নীতি হচ্ছে: পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা না হওয়া, পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন থেকে বিরত থাকা, এবং দেশে পারমাণবিক অস্ত্র প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া।
একইভাবে তৃতীয় আরেকটি অলিখিত শান্তির নীতি হচ্ছে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানি না করা।
তবে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের বিস্তার ব্যাপক হয়ে আসার পাশাপাশি যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে হালকা হয়ে উঠতে থাকায় সেই তিন আদর্শ বলা যায় এখন অনেকটা বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। সংসদের নিম্ন কক্ষে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন নিশ্চিত করে নেওয়া জাপানের প্রধান ক্ষমতাসীন উদার গণতন্ত্রী দল এলডিপি সংবিধানের নবম ধারা বাতিল করে দেওয়ার কথা না বললেও দলের ভেতরে এমন ধারণা ক্রমে দানা বাঁধতে শুরু করেছে যে সংবিধানের সেই ধারা বজায় রেখেই এটাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করে নেওয়া, যেন যুদ্ধ একেবারে অবাঞ্ছিত না হয়ে বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে এর প্রয়োজনীয়তা মেনে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে তিন পরমাণু নীতি নিয়েও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে ভিন্ন অভিমত ক্রমে দানা বাঁধছে। ফলে এই প্রবণতা বজায় থাকলে জাপান আর কত দিন সেই নীতি আঁকড়ে থাকবে, তা নিয়েও এখন আলোচনা চলছে। অন্যদিকে অস্ত্রের মজুত বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ প্রস্তুতির ভিন্ন একটি দিক হিসেবে বিবেচিত প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দও সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে জাপান প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের ১ শতাংশের নিচে ধরে রাখার যে নীতি অনুসরণ করে চলছিল, তা এখন অনেকটাই অতীতের বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রতিরক্ষা বাজেট ১ শতাংশের মাত্রা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলছেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় অচিরেই তিনি জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করবেন। তবে জাপানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্র সেই অঙ্গীকারে সন্তুষ্ট নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত হওয়া তিনি দেখতে চান। ফলে অদূর ভবিষ্যতে কোনো আকাশচুম্বী পথে তা ধাবিত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে অন্য যে আরেকটি দিক জাপানের বেলায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে, প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির সঙ্গে সেটা সম্পর্কিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পায়নের পথে জাপানের অগ্রযাত্রা একসময় প্রাণঘাতী বিভিন্ন অস্ত্র উৎপাদনের দিকে জাপানের নেতৃস্থানীয় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে যায়। মূলত জাপানের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, অর্থাৎ দেশের আত্মরক্ষা বাহিনীর অস্ত্রসজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেশের ভেতরে তৈরি করা হচ্ছে এর উদ্দেশ্য।
মিতশুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের পাশাপাশি কাওয়াসাকি স্টিল এবং আরও কয়েকটি কোম্পানি বেশ কিছুদিন ধরে এই ব্যবসায় জড়িত আছে। এরা এখন মনে করছে, দেশের বাইরে অস্ত্রের চাহিদা পূরণের সুযোগ এদের জন্য করে দেওয়া হলে জাপানের জন্য সেটা লাভজনক বিবেচিত হবে।
বিশেষ করে জাপান এখন নিরাপত্তার প্রশ্নকে বৈদেশিক উন্নয়ন সাহায্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করায় এসব কোম্পানি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে নিতে আগ্রহী।
জাপান সরকার এ ছাড়া বিদেশে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির ওপর বজায় থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে নিয়ে সেই সুযোগ এদের জন্য করে দিতে চাইছে।
তবে জাপানের জনগণ এখনো সরকারের সেই পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হতে পারছেন না। নাগরিক সম্প্রচার কেন্দ্র এনএইচকের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ সরকারের সেই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও ৫৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। তবে কথা হচ্ছে, মাত্র কিছুদিন আগের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাধিক্য আসনে জয়লাভ করা জাপানের প্রধান ক্ষমতাসীন দল মনে হয় জনমতের সে রকম অবস্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে মনে হয় না। ফলে মানুষ যাই ভেবে থাকুক না কেন, বাণিজ্যের লাভ-ক্ষতির হিসাব সেই অবস্থানকে মনে হয় সহজেই পাশ কাটিয়ে যেতে সক্ষম। এটাই হচ্ছে এখন নতুন করে শুরু হওয়া হানাহানির বিশ্বের বাস্তবতা, যা আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে খুব বেশি প্রশ্রয় দেবে বলে মনে হয় না।
মনজুরুল হক জাপানপ্রবাসী শিক্ষক ও সাংবাদিক
* মতামত লেখকের নিজস্ব