মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ যখন নির্ভয়ে নিজেদের মতপ্রকাশের সুযোগ পায়, তখন ইসরায়েলকে ঘিরে গড়ে ওঠা পশ্চিমা ঐকমত্যের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়।
সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো অনেকের চোখে আঞ্চলিক ক্ষোভ ও অপমানবোধের ওপর অতিপাতলা প্রলেপ ছাড়া আর কিছু নয়। মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতটা সহনীয় হয়ে উঠল?
সম্প্রতি সৌদি আরবের একাডেমিক ও লেখক ড. আহমেদ আলতুয়াইজরি ইসরায়েল ও তার ঘনিষ্ঠ আরব অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে খোলামেলা মতপ্রকাশের সুযোগ পান। সৌদি আরবে উচ্চপর্যায়ের অনুমতি ছাড়া কিছু প্রকাশিত হওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই ধরা হয়।
সেই প্রেক্ষাপটে আলতুয়াইজরির বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি আবুধাবির শাসকদের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে বলেন, তারা জায়নবাদী প্রকল্পের প্রতি ঝুঁকে পড়ে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় কার্যত ‘ট্রয়ের ঘোড়া’য় পরিণত হয়েছে।
সৌদি আরবে এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের বিরুদ্ধে এতটা সরাসরি ও কঠোর ভাষায় সমালোচনা শোনা যায়নি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও সিরিয়ায় আরব বসন্ত-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি রিয়াদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর কুর্দি ও দ্রুজ সম্প্রদায়কে ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা দুর্বল করার ইঙ্গিতপূর্ণ নীতিও সামনে এসেছে।
ড. আহমেদ আলতুয়াইজরির লেখা প্রকাশিত হয় সৌদি কর্তৃপক্ষ–ঘনিষ্ঠ একটি পত্রিকায়। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। তিনি সরকারের হয়ে কথা বলেননি। জাতীয় সংকটের মুহূর্তে সত্য উচ্চারণের দায়বোধ থেকেই তিনি লেখাটি লিখেছেন।
লেখাটি প্রকাশের পরপরই তা সরিয়ে নেওয়া হয়। তেল আবিব ও ওয়াশিংটনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ইসরায়েল–সমর্থক নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে লেখকের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলে। অ্যান্টিডিফেমেশন লিগও দাবি করে, তাদের আপত্তির পরই লেখাটি নামিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এরপরই পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়। ওপরের নির্দেশে লেখাটি আবার প্রকাশিত হয়। সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভাষ্যকার দাবি করেন, লেখাটি কখনো সরানোই হয়নি।
ঘটনাপ্রবাহে নতুন প্রশ্ন সামনে আসে। উপসাগরীয় দুই ঘনিষ্ঠ দেশের এই দূরত্ব কি কেবল সাময়িক আবেগের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত বিচ্ছেদ?
আলতুয়াইজরির মতে, ঘটনাটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। গাজায় গণহত্যা এবং ইয়েমেনসহ সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ঘটনাবলি এই রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। সৌদি আরবে প্রকাশ্যে প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত থাকলেও ভেতরে ভেতরে অপমান ও ক্ষোভ জমা হয়েছে।
রাজা ফাহদ এবং পরে যুবরাজ থাকা অবস্থায় রাজা আবদুল্লাহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেগুলোর ভিত্তি ছিল ভূমির বিনিময়ে শান্তি এবং ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টাতেও সৌদি আরব মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু গাজায় সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপ্তি অতীতের সব ঘটনার চেয়ে অনেক বড়, যা রিয়াদের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় প্রভাব ফেলেছে।
আলতুয়াইজরির ভাষায়, ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্বের মানসিকতা বহাল থাকলে শান্তি বা সহযোগিতার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। ইসলামি বিশ্বের কেন্দ্র এবং একটি প্রভাবশালী আরব রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরব নীরব দর্শকের ভূমিকা নিতে পারে না। এ কারণেই তাদের কূটনৈতিক ভাষা ও অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।
ট্রাম্পের কথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ সৌদি আরবের অংশগ্রহণকে আলতুয়াইজরি মূলত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, এটি কোনো নীতিগত ঐকমত্য নয়, বরং পরিস্থিতি আরও অবনতির হাত থেকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা।
আলতুয়াইজরির অভিযোগ, গাজা ধ্বংসের প্রেক্ষাপটকে ইসরায়েল বৃহত্তর আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। এই চিন্তাধারা নতুন নয়। আশির দশক নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধে ইসরায়েলি লেখক এবং সাবেক নেতা এরিয়েল শ্যারনের উপদেষ্টা ওদেদ ইয়িনন আরব রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত করার কৌশলের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর কুর্দি ও দ্রুজ সম্প্রদায়কে ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা দুর্বল করার ইঙ্গিতপূর্ণ নীতিও সামনে এসেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে সিরিয়ার সরকার কুর্দি–অধ্যুষিত এলাকা ও তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূত টম বারাক সিরিয়ার ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও মোহাম্মদ বিন জায়েদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সৌদি আরব তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
আলতুয়াইজরির অভিযোগ, ইয়েমেনে আমিরাতকে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানোর পর রিয়াদ দেখেছে, আবুধাবি নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে দেশটিকে বিভক্ত করার পথে এগোচ্ছে। সুদানেও র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) প্রতি আমিরাতের সামরিক সহায়তা এবং সোমালিয়ার উত্তরাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশ সোমালিল্যান্ডে তাদের সক্রিয়তা সৌদি নেতৃত্বের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আলতুয়াইজরির মতে, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিচারে দুই দেশ তুলনীয় নয়। তবে নেতৃত্বের পর্যায়ে দূরত্ব অনেক দিন ধরেই বাড়ছিল। মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থানে মোহাম্মদ বিন জায়েদের ভূমিকা থাকলেও পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে ঝুঁকেছে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথও খোলা রেখেছে। ইরানের ওপর সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কা ঘিরে অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাসকাটে চলমান আলোচনাকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ৯ আরব নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেছেন বলে জানা গেছে। আলতুয়াইজরির মতে, এই উদ্যোগে সৌদি আরবই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
আলতুয়াইজরি সতর্ক করে বলেন, ইরান ভেনেজুয়েলা নয়; অস্তিত্বের হুমকি অনুভব করলে তারা অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, হরমুজ প্রণালি কিংবা সরাসরি ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। এমন সংঘাত পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এদিকে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রকাশ্যে সৌদি আরবকে সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি যেন তারা আরও উত্তপ্ত না করে। কিন্তু উপসাগরীয় রাজনীতিতে যে ভেতরগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, তা ওয়াশিংটনের জন্য সহজে উপেক্ষা করার মতো নয়।
কারণ সম্ভাব্য নতুন সংঘাত সবচেয়ে বেশি লাভবান করতে পারে সেই শক্তিকে, যে আকারে ছোট হলেও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধারণ করে।
ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত