আবারও পোশাক। আবারও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ‘শালীনতা’ শেখানোর উদ্যোগ। এরপর সমালোচনার মুখে নির্দেশনা প্রত্যাহার। যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম বদলায়, নির্দেশনার ভাষা বদলায় কিন্তু বদলায় না নারীর শরীর, পোশাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার সেই পুরোনো চর্চা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বেতারের সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য জারি করা ‘ড্রেস কোড’-সংক্রান্ত নির্দেশনাটি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক। ৪ মে জারি করা ওই নির্দেশনায় নারী সংবাদ উপস্থাপকদের শাড়ি অথবা ওড়নাসহ সালোয়ার-কামিজ পরতে বলা হয়। এমনকি বড় আকারের টিপ ব্যবহার না করা এবং এক পাশে ওড়না না পরার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। পুরুষদের জন্য ছিল ফুলহাতা শার্ট ও টাই পরার নির্দেশনা, যদিও বিশেষ দিবস ও উৎসব-পার্বণে পাঞ্জাবি পরার সুযোগ রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া টি-শার্ট ও গেঞ্জি পরাকে নিরুৎসাহিত করা হয়।
পরবর্তী সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ বেতার কর্তৃপক্ষ ২৪ মে এক অফিস আদেশ জারি করে আগের নির্দেশনাটি প্রত্যাহার করে নেয়।
২০২০ সালে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি নির্দেশনা জারি করেছিলেন। সেখানে পুরুষদের টাকনুর ওপরে এবং নারীদের হিজাবসহ টাকনুর নিচে কাপড় পরার কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে ‘পর্দা’ মেনে চলার নির্দেশনাও ছিল। ব্যাপক সমালোচনার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে সেই নোটিশটি প্রত্যাহার করা হয়।
সে সময় সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও বলেছিলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের শালীন ও মানানসই পোশাক পরার সাধারণ নির্দেশনা আছে, কিন্তু এভাবে নির্দিষ্ট পোশাক চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
একজন সংবাদ উপস্থাপক কত বড় টিপ পরলেন কিংবা ওড়না দুই পাশে নিলেন কি না, সেটি কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা?
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পোশাকবিষয়ক নির্দেশনাও তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। সেই নির্দেশনাটিতেও নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ওড়না ও ‘শালীন’ পোশাকের কথা বলা হয়েছিল। ছোট হাতা ও ছোট দৈর্ঘ্যের পোশাক এবং লেগিংস পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। পুরুষদের জন্য ছিল ফরমাল শার্ট ও প্যান্টের বাধ্যবাধকতা; নিষিদ্ধ করা হয়েছিল জিনস ও গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। এমনকি নির্দেশনা না মানলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনার কথাও বলা হয়েছিল। সমালোচনার মুখে তখনো কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এটি নাকি ‘পরামর্শমূলক’ নির্দেশনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো নির্দেশনার সঙ্গে যখন শাস্তির ভয় জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি কীভাবে শুধু পরামর্শ থাকে?
নিকট অতীতে দুটি প্রতিষ্ঠানের এমন অভিজ্ঞতার পরও বাংলাদেশ বেতারের এই উদ্যোগ রীতিমতো বিস্ময়কর। ভাবতে অবাক লাগে, একটা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, স্বাধীনতা যেখানে গুরুত্ব পাওয়ার কথা, সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে সংবাদ উপস্থাপকের পোশাক। প্রশ্ন জাগে, সংবাদ উপস্থাপনার মূল বিষয় কি সংবাদ পাঠের দক্ষতা, সংবাদের নিরপেক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, উচ্চারণ ও পেশাদারত্ব; নাকি উপস্থাপকের পোশাক? একজন সংবাদ উপস্থাপক কত বড় টিপ পরলেন কিংবা ওড়না দুই পাশে নিলেন কি না, সেটি কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা?
লক্ষণীয় যে এ ধরনের নির্দেশনাগুলোয় পুরুষদের পোশাকের বিষয় যদিও অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে নারীর পোশাক। কেউ কেউ বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া বলেও মনে করেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলেই স্পষ্ট হয়, বিশ্বজুড়ে পোশাকের রাজনীতিতে নারী যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, পুরুষ সেভাবে হননি।
নারী কী পরবেন, কীভাবে পরবেন, কতটুকু ঢাকবেন কিংবা কীভাবে চলবেন—এসব নিয়ে সমাজের উদ্বেগের যেন শেষ নেই। নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের তৎপরতা প্রমাণ করে, নারীকে বিভিন্ন কৌশলে নিয়ন্ত্রিত ও অবদমিত করে রাখার সেই চর্চা এক মুহূর্তের জন্যও থেমে নেই। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তর, এমনকি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এই মানসিকতা সদা সক্রিয়। এই নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে নারীকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে তোমার শরীর এবং পোশাক নিয়ে তোমার নিজের মতামতের আগে সমাজের মতামত আছে, সমাজের সিদ্ধান্ত আছে।
পোশাক কখনো মানুষের দক্ষতার মাপকাঠি হতে পারে না। একজন সংবাদ উপস্থাপক, ব্যাংকার কিংবা সরকারি কর্মকর্তা তাঁর কাজের মান, দক্ষতা, সততা ও পেশাদারত্ব দিয়েই মূল্যায়িত হবেন; পোশাকের রং বা ওড়নার অবস্থান দিয়ে নয়। তবু বারবার নারীর পোশাক নিয়েই এত উদ্বিগ্ন কেন?
নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
