আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসের পরেই পিতা–মাতার খেদমত অন্যতম ফরজ ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমার রব এই ফয়সালা দিয়েছেন যে আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা–মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাঁদের কোনো একজন বা উভয়জন যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে (বিরক্তিতে) তাঁদের উফ্ বা উহ্ শব্দটিও বলবে না এবং তাঁদের ধমক দেবে না; বরং তাঁদের সঙ্গে স্নেহসিক্ত কথা বলো। তাঁদের জন্য দয়ার্দ্রতা ও বিনয়ে হস্ত সম্প্রসারিত করো, আর বলো, “রাব্বির হাম হুমা কামা রব্বায়ানি ছগিরা’ (হে আমার প্রতিপালক! আপনি তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছেন)।’ (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ২৩-২৪)।
যারা পিতা–মাতার খেদমত থেকে বঞ্চিত হলো, তারা আল্লাহ–তাআলার রহমত থেকে বঞ্চিত হলো। পিতা–মাতার খেদমতের মাধ্যমে মানুষ জান্নাত লাভ করে। ‘একবার জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) মিম্বারের প্রথম ধাপে পা রেখে বললেন, আমিন! এরপর দ্বিতীয় ধাপে পা রাখলেন, বললেন, আমিন! তারপর তৃতীয় ধাপে পা রাখলেন এবং বললেন, আমিন! এরপর খুতবা দিলেন ও নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে সাহাবায়ে কিরাম জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আজ যা দেখলাম তা ইতিপূর্বে কখনো দেখিনি; এটা কি কোনো নতুন নিয়ম?’ নবীয়ে করিম (সা.) বললেন: ‘না, এটা নতুন কোনো নিয়ম নয়; বরং আমি মিম্বারে ওঠার সময় জিবরাইল (আ.) আসলেন, আমি যখন মিম্বারের প্রথম ধাপে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, যারা পিতা–মাতা উভয়কে বা একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেয়েও তাদের খেদমতের মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করতে পারল না, তারা ধ্বংস হোক।”
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো সন্তান স্বীয় পিতা-মাতার প্রতি মহব্বতের নজরে দৃষ্টিপাত করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’
তখন আমি সম্মতি জানিয়ে বললাম “আমিন!” (তাই হোক)। যখন দ্বিতীয় ধাপে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, যারা রমজান মাস পেল কিন্তু ইবাদতের মাধ্যমে তাদের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, তারা ধ্বংস হোক।” তখন আমি বললাম “আমিন”! আমি যখন মিম্বারের তৃতীয় ধাপে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, যারা আপনার পবিত্র নাম মোবারক (মুহাম্মদ সা.) শুনল কিন্তু দরুদ শরিফ পাঠ করল না, তারাও ধ্বংস হোক।” তখন আমি সম্মতি জানিয়ে বললাম ‘আমিন!’ (মুসলিম)
দুনিয়াতে তিনটি এমন জিনিস আছে, যা দেখলেই সওয়াব হয়: কাবা শরিফ, কোরআন মাজিদ ও পিতা-মাতার চেহারা মোবারক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো সন্তান স্বীয় পিতা-মাতার প্রতি মহব্বতের নজরে দৃষ্টিপাত করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ সাহাবিগণ বললেন, ‘যদি দৈনিক এক শ বার তাকায়’! নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহ মহান ও পবিত্র’।” (বায়হাকি)
আল্লাহ–তাআলা পিতা–মাতার অধিকার বিষয়ে বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে শরিক করো না এবং পিতা–মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৩৬) ‘আর আমি নির্দেশ দিয়েছি মানুষকে, তার পিতা–মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার।’ (সুরা-৪৬ আহকাফ, আয়াত: ১৫) ‘আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি যে তুমি আমার এবং তোমার পিতা–মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।
পরিশেষে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।’ (সুরা-৩১ লুকমান, আয়াত: ১৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ (তিরমিজি ও মুসতাদরাকে হাকিম, সহিহ আলবানি)। ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’ (সুনানে নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ)
নবী করিম (সা.)–কে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) জিজ্ঞেস করলেন,‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! আমার পিতা–মাতা ইন্তেকালের পরও কি তাঁদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের কোনো কিছু দায়িত্ব অবশিষ্ট থাকে?’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, থাকে।
তা হলো তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের গুনাহের জন্য তওবা ইস্তিগফার করা, তাদের শরিয়তসম্মত অসিয়তগুলো পূর্ণ করা, তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের বন্ধুবান্ধবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।’ এগুলো পিতা–মাতার মৃত্যুর পরও তাঁদের সঙ্গে উত্তম আচরণের শামিল।’ (আবুদাউদ)
● অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম