ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পড়েছে। এ সংঘাত আর কেবল আঞ্চলিক সীমার ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত পৌঁছে গেছে বৈশ্বিক স্তরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসী এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী পদক্ষেপে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ শুধু কূটনৈতিক উদ্যোগকে বিপর্যস্ত করেনি, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক কাঠামোকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইরান তার স্বাভাবিক ও স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এটি কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।
আমাদের দেশের জন্য এ যুদ্ধ নিছক সামরিক সংঘাত নয়; এটি টিকে থাকার যুদ্ধ—যেখানে সীমিত লাল রেখা এবং সুস্পষ্ট কৌশলগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইরানের অভিজ্ঞতায় যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। অতীতেও সংবেদনশীল আলোচনার সময় দেশটি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে। ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা—সবই দেখিয়েছে যে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া আগ্রাসনের ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশেষ করে পারমাণবিক আলোচনার সময় এবং নিষেধাজ্ঞা চলাকালে দুই দফা হামলার অভিজ্ঞতা (২০২৫ সালের জুনে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে) একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। তা হলো প্রতিরোধক্ষমতা ও প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি অপরিহার্য। কূটনীতি কার্যকর হতে পারে তখনই, যখন তার সঙ্গে বাস্তব সামরিক সক্ষমতাও যুক্ত থাকে।
অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং ইরানের নেতৃত্ব উত্তরাধিকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তুলেছে, তা নিছক কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো মূলত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীনতাকে গভীরভাবে মূল্য দেওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো অ-পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূমিকাও এ সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জ্বালানিবাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এই দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা খামেনিকে বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে নির্বাচনের ঘটনাই স্বাধীনতার প্রতি এ অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি অত্যন্ত বড়। বর্তমানে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর বিমানবাহী রণতরি বহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।
এ বিপুল উপস্থিতি মূলত শক্তি প্রদর্শন এবং ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এত শক্তি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে নিজেদের সম্পদ পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারছে না।
এলাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন রাডার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। এটি দেখিয়েছে, ইরান উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর হুমকির মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং সংঘাতকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিচালনা করার ক্ষমতাও রাখে।
এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাস্তবতা। বৈশ্বিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এ পথ দিয়ে রপ্তানি হয়। ফলে এ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিরোধক্ষমতা প্রদান করে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানিবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭৩ ডলার। এই দাম ৮ মার্চের মধ্যে বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক এলএনজি উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে খাদ্যবাজার, রাসায়নিক সার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাজারে অনিশ্চয়তা এবং দামের অস্থিরতা বহু দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতিমালা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানিব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছাড়াও এ যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তেহরান নীতির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে ধীরে ধীরে মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছে। ভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ, ভিন্ন নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব কারণ পশ্চিমা জোটের ঐতিহ্যগত ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে।
যুদ্ধকে একতরফা বিজয় হিসেবে তুলে ধরার যে বয়ান যুক্তরাষ্ট্র দিচ্ছে, তা মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রয়োজন থেকেই। এটি করা হচ্ছে ক্ষমতা প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক বৈধতা জোরদারের উদ্দেশ্যে। বাস্তবে অঞ্চলটির সামরিক পরিস্থিতি সেই বয়ানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো অ-পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূমিকাও এ সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জ্বালানিবাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এই দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।
বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি, পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন এবং জ্বালানি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব—সব মিলিয়ে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এ সংকট আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করেছে। তা হলো জটিল নিরাপত্তাহুমকির মোকাবিলায় ইরানের জন্য চারটি বিষয় অপরিহার্য—সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা, সক্রিয় কূটনীতি, জাতীয় নিরাপত্তার নিশ্চিত গ্যারান্টি ও দক্ষ সংকট ব্যবস্থাপনা।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কূটনীতির সমন্বিত প্রয়োগ ভবিষ্যতে আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত এ যুদ্ধ একটি বহুমাত্রিক সংকট, যার মধ্যে সামরিক, অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও মানবিক—সব দিকই জড়িয়ে আছে।
আত্মরক্ষার স্বাভাবিক অধিকারের ভিত্তিতে ইরান তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর আগ্রাসনের মোকাবিলা করার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে।
অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা অপরিহার্য। এ যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে—তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্ন, পশ্চিমা জোটের ভেতরে ফাটল এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের আকারে।
এ যুদ্ধ ইরানের কৌশলগত দর্শনের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন, যেখানে প্রতিরোধক্ষমতা, নিশ্চয়তাপূর্ণ কূটনীতি এবং বুদ্ধিদীপ্ত সংকট ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ রেজা বাহরামি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মহাপরিচালক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ