ইরান যুদ্ধের জ্বালানি–ধাক্কা যে কারণে দীর্ঘস্থায়ী হবে

ইরান যুদ্ধে তেলবাহী ট্যাংকারও আক্রান্ত হয়েছেরয়টার্স

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে এমন এক অস্থিরতা তৈরি করেছে, যা সাময়িক ধাক্কা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছে। এই দাম ২০০৮ সালের জুলাইয়ে ১৪৭ ডলারের রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি।

অনেকেই ২০২২ সালের রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা টেনে আশাবাদী হতে পারেন। তখনো তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল; মার্চে ১৩৯ ডলার ছুঁয়েছিল; পরে আবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই রকম উত্থান-পতন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংকট সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি নয়; বরং তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

২০২২ সালের জ্বালানি–সংকটের মূলে ছিল নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যসীমা। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করায় তেল-গ্যাসের প্রবাহ নতুন পথে ঘুরে যায়। মজুত তেল ছেড়ে বাজার সামাল দেওয়ারও চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া তখনো বিশ্ববাজারে একটি বড় উৎপাদক হিসেবে সক্রিয় ছিল। তখন তাদের তেল ও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কেবল পথ বদলেছিল। ফলে বাজারে সমন্বয়ের সুযোগ ছিল।

আরও পড়ুন

২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ সেই সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে। এখানে সমস্যা কেবল রাজনৈতিক নয়; এখানে সমস্যা সরাসরি ভৌত অবস্থায় রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাসের সরবরাহই কমে গেছে। ট্যাংকার চলাচল ব্যাহত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। কারণ, সংরক্ষণের জায়গা ফুরিয়ে আসছে। তার ওপর ইরানের হামলায় বিভিন্ন তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থাপনা সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, ঝুঁকির মূল্য বেড়েছে, আর সরবরাহ কমে গেছে আরও।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এ পরিস্থিতি বিশ্ব তেলবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ-বিঘ্ন। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল যে পথে যেত, তা এখন কার্যত বন্ধ। উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদন কমেছে দিনে অন্তত এক কোটি ব্যারেল। এই বিপুল ঘাটতি বাজারের স্বাভাবিক সমন্বয়কে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে।

২০২২ সালে মজুত থেকে ১৮ কোটি ব্যারেল তেল ছেড়ে কিছুটা স্থিতি আনা গিয়েছিল। এবার ৪০ কোটি ব্যারেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। কারণ, সমস্যাটি মজুতের নয়, পরিবহনের। এই তেল মূলত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপে সংরক্ষিত। সেগুলো এশিয়ার বাজারে পৌঁছাতে সময়, ট্যাংকার ও নিরাপদ সমুদ্রপথ প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্যাংকারের অভাব থাকায় মজুত তেল ছাড়লেই তা দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে এবং হরমুজ প্রণালি যত দিন কার্যত অচল থাকবে, তত দিন তেল ও গ্যাসের দামও উচ্চপর্যায়ে আটকে থাকবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানিনির্ভর শিল্পে। পেট্রোকেমিক্যাল, সার, অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো খাতে উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যাবে। পরিবহন খাতেও একই চাপ পড়বে। বিমান, জাহাজ ও সড়ক পরিবহনে জ্বালানির খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়বে ভাড়া, টিকিটের দাম ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ে।

বিকল্প পথও খুব সীমিত। সৌদি আরব ও ইরাকের যে পাইপলাইনগুলো হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহন করতে পারে, সেগুলোর অতিরিক্ত সক্ষমতা মিলিয়ে দৈনিক মাত্র সাড়ে তিন থেকে সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন ব্যারেল। বর্তমান ঘাটতির তুলনায় তা অতি সামান্য। ফলে পথ বদলালেই সংকট মিটবে—এ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও একই রকম চাপ তৈরি হয়েছে। বছরে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ) এই প্রণালি দিয়েই যেত। সেটাও এখন বন্ধ। বিকল্প হিসেবে কাতার থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে ওমান পর্যন্ত যে ডলফিন পাইপলাইন রয়েছে, সেটি বছরে ২০ থেকে ২২ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস পরিবহন করে। কিন্তু এর অতিরিক্ত সক্ষমতা নেই। ওমানের এলএনজি টার্মিনালও বাড়তি চাপ নিতে পারছে না। এর সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা হিসেবে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের বাড়তি চাপ যোগ হয়েছে। নতুন উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগে, তাই স্বল্প মেয়াদে ঘাটতি পূরণের কোনো উপায় নেই।

আরও পড়ুন

২০২২ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল পথ বদল, বিকল্প জোগান ও নীতিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাজার কিছুটা হলেও স্থিতিশীল রাখা যায়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এখানে সমস্যা শুধু বাণিজ্যপথেই আটকে থাকেনি। উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি করার সক্ষমতাই এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বাজার আর স্বাভাবিকভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। এর বদলে বাজারের চাহিদা কমাতে এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে এবং হরমুজ প্রণালি যত দিন কার্যত অচল থাকবে, তত দিন তেল ও গ্যাসের দামও উচ্চপর্যায়ে আটকে থাকবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানিনির্ভর শিল্পে। পেট্রোকেমিক্যাল, সার, অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো খাতে উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যাবে। পরিবহন খাতেও একই চাপ পড়বে। বিমান, জাহাজ ও সড়ক পরিবহনে জ্বালানির খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়বে ভাড়া, টিকিটের দাম ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ে।

স্বল্প মেয়াদে জ্বালানির চাহিদা খুব একটা কমে না, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মানুষ ও শিল্প—উভয়ই নিজেদের আচরণ বদলাতে বাধ্য হয়। তারা চলাচল কমায়, খরচ কমায়, বিকল্প খোঁজে। গৃহস্থ স্তরে এর অর্থ হলো—মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় বাড়বে, হাতে থাকা আয় কমবে, ফলে সামগ্রিক ভোগও কমে যাবে।

স্বল্প মেয়াদে জ্বালানির চাহিদা খুব একটা কমে না, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মানুষ ও শিল্প—উভয়ই নিজেদের আচরণ বদলাতে বাধ্য হয়। তারা চলাচল কমায়, খরচ কমায়, বিকল্প খোঁজে। গৃহস্থ স্তরে এর অর্থ হলো—মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় বাড়বে, হাতে থাকা আয় কমবে, ফলে সামগ্রিক ভোগও কমে যাবে।

  • নিকোলাই কোঝানভ কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজ সেন্টারের একজন গবেষণা সহযোগী অধ্যাপক

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ