মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের কী করা উচিত

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া না–দেওয়া নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, সেখানে অংশগ্রহণকারীরা এবং সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এ চ্যালেঞ্জগুলো দীর্ঘ মেয়াদের হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মক্কা চুক্তি নিয়ে  বাংলাদেশের কী করা উচিত সে সম্পর্কে লিখেছেন আলী রীয়াজ

‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফছবি: এএফপি

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষাচুক্তি ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’, যাকে ‘মক্কা চুক্তি’ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে, তাতে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ না পেলেও এ নিয়ে দেশে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। সরকারের বক্তব্যে এ ইঙ্গিত আছে যে সরকার এতে যোগ দিতে আগ্রহী।

এ আলোচনা-বিতর্কের ইতিবাচক দিক হচ্ছে যে যাঁরা দেশের রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা এ তাগিদ অনুভব করছেন যে চুক্তির বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই এর সুবিধা-অসুবিধাগুলো নাগরিকদের সামনে তুলে ধরা দরকার।

বাংলাদেশ যেহেতু অতীতে এ ধরনের কোনো সামরিক চুক্তিতে যোগ দেয়নি, সেই গুরুত্বের বিবেচনায় এ ধরনের চুক্তির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখাটা অত্যন্ত জরুরি। কেননা এ ধরনের চুক্তি কেবল সরকারের বিষয় নয় এবং একটি সরকার চুক্তিতে যোগ দেওয়ার পর অন্য সরকার চাইলেই তা থেকে সরে আসতে পারবে না।

আরও পড়ুন

মক্কা চুক্তি নিয়ে এসব আলোচনা অনুসরণ করলে দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে অনেকেই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতির জন্য অন্য যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, সেগুলোকে পাস কাটিয়ে গিয়ে এ বিষয়কে এককভাবে বিবেচনা করছেন। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আবর্তিত হয়েছে মূলত একটি প্রশ্নকে ঘিরে—বাংলাদেশ কি ভারতের দিকে ঝুঁকবে, নাকি চীনের দিকে?

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করার পর বাংলাদেশের তাতে যুক্ত হওয়া উচিত কি না, সে প্রশ্ন সামনে আসে। সে সময় দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যকার একটি ত্রিমুখী টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশের অবস্থান বলে মনে হচ্ছিল।

শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের একটি অন্যতম ভিত্তি হলো ভারত–নির্ভরতা। ফলে ঐতিহাসিক যোগসূত্রের যুক্তি তুলে এক অসম সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, অন্যদিকে চীনের মুখাপেক্ষী হওয়াকে অর্থনৈতিক প্রয়োজন বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাসিনা সরকারের টানাপোড়েনের উৎস ছিল গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান।

হাসিনা সরকারের পতনের পর এ অবস্থার বদল ঘটে। কেননা ভারত তার আগের বাংলাদেশ নীতি থেকে কার্যত সরে আসতে আগ্রহী হয়নি; তদুপরি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে তাঁকে লেভারেজ হিসেবে ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে থেকেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থা বহাল থেকেছে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে। সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি হয়ে ওঠায় এবং ইরানের আক্রমণ থেকে দেশগুলোকে রক্ষা করতে না পারায় অনেকের ধারণা, এই তিন দেশের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র-পরিপোষিত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এই অবকাঠামো গড়ে উঠছে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এক বিরাটসংখ্যক মানুষের ক্ষোভ যে ভারতের আচরণপ্রসূত এবং বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবিগুলোকে অস্বীকার করার কারণে সৃষ্ট, ভারত ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পরও তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছে বলে মনে হয় না।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এমন পররাষ্ট্রনীতির দিকে ইঙ্গিত দেয়, যা স্পষ্টত ভারতকেন্দ্রিক নয়। কিন্তু চীনের আদর্শিক অবস্থান এবং অন্যান্য দেশের চীন-নির্ভরতার অভিজ্ঞতাও বিবেচিত হওয়া দরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যদিও বিনিময়মূলক বা ট্রানজেকশনাল কূটনীতি ও বাণিজ্যিক দিককেই গুরুত্ব দেয়; কিন্তু তারা এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে একবারে ধর্তব্যের মধ্যে নেবে না এমনও নয় এবং ভবিষ্যতে ভিন্ন প্রশাসন যে ভিন্ন ধরনের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পারে, সেটাও মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশের জন্য এগুলো কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, প্রতিরক্ষা ও কৌশলেরও বিষয়।

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া না–দেওয়া নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, সেখানে অংশগ্রহণকারীরা এবং সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এ চ্যালেঞ্জগুলো দীর্ঘ মেয়াদের হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আমরা আশা করতে পারি যে এগুলো তাঁরা বিবেচনায় নেবেন।

প্রতীকী ছবি

চুক্তিটি আসলে কী নিয়ে

এযাবৎ মক্কা চুক্তি সম্পর্কে খুব বিস্তারিত তথ্য জানা না গেলেও এটুকু স্পষ্ট যে এটি ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫–এর আদলে একটি যৌথ নিরাপত্তা ধারাসংবলিত প্রতিরক্ষাচুক্তি। এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘তিনটি রাষ্ট্রের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিনটির সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে।’

সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, সৌদি আরব প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলোতে আর্থিক সহায়তা ও তহবিল জোগান দেবে; তুরস্ক উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন ও ডিপ-টেক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করবে আর পাকিস্তান সামনের সারির সামরিক জনশক্তি ও তাদের বর্তমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিয়ে সহযোগিতা করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ দিন পর, ৩১ আগস্ট এ চুক্তির অধীনে কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটি এখন চুক্তিতে থাকা রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবায়নের উপযোগী কাঠামোয় রূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলোর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, তা হচ্ছে ন্যাটোর মতো কোনো যৌথ কমান্ড কাঠামো গড়ে উঠবে কি না কিংবা নিয়মিত যৌথ মহড়া, যৌথ সংকট পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, লজিস্টিকস চুক্তি এবং সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি হবে কি না।

আরও পড়ুন

অনেকেই এই নতুন প্রতিরক্ষাচুক্তিকে নিরাপত্তাকাঠামো বলে দাবি করছেন। কিন্তু এটি আসলে কতটা নতুন, সেটাও ভাবা দরকার। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ইতিমধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষাচুক্তি রয়েছে এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার সামরিক প্রশিক্ষণ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র ও প্রতিরক্ষাশিল্প সহযোগিতা আরও প্রসারিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধির ফলে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যকার পুরোনো উত্তেজনাও হ্রাস পেয়েছে।

কিন্তু তার চেয়েও যে প্রশ্ন বড়, তা হচ্ছে একটি যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে হুমকিসংক্রান্ত ধারণা বা থ্রেট পারসেপশনে মিল আছে কি না এবং তাদের তাৎক্ষণিক স্বার্থ এক না হলেও তারা একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে কি না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অবসান

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থা বহাল থেকেছে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে। সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি হয়ে ওঠায় এবং ইরানের আক্রমণ থেকে দেশগুলোকে রক্ষা করতে না পারায় অনেকের ধারণা, এই তিন দেশের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র-পরিপোষিত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এই অবকাঠামো গড়ে উঠছে। কেউ কেউ একে মুসলিম ন্যাটো বলেও বর্ণনা করছেন।

কিন্তু বাস্তবে এই দেশগুলোর কেউই মার্কিন বলয়ের বাইরে নয়। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক বিদ্যমান। তা ছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একটি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলো বেসামরিক ব্যবহারের জন্য সেখানে পারমাণবিক প্ল্যান্ট নির্মাণ করতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণে অস্বস্তির কারণে এই দেশগুলো মার্কিন বলয়ের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা মনে করার কারণ নেই। যে কারণে ট্রাম্প এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে।

মক্কায় ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট, মক্কা, সৌদি আরব।
ছবি: এএফপি

এ চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিয়ে এমন একটি জোট গঠনের দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন নীতিরই ধারাবাহিকতা, যা ইসরায়েলের জন্য কোনো হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না। ১৯৫৫ সালে স্বাক্ষরিত সেন্টো—যা বাগদাদ প্যাক্ট নামেও পরিচিত ছিল—এ ধরনের প্রথম প্রচেষ্টা এবং এর সর্বশেষ সংস্করণ হলো ২০২২ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের স্বাক্ষরকারী দেশগুলো কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কই স্থাপন করেনি; বরং মার্কিন-ইসরায়েলি আধিপত্যকে একপ্রকার মেনে নিয়েছে। একার্থে যারা আব্রাহাম চুক্তির বাইরে ছিল, তাদের এখন একটি চুক্তির ছাতায় নিয়ে আসা হয়েছে; আর সেটিই হলো মক্কা চুক্তি। যদিও বারবার বলা হচ্ছে যে এ চুক্তি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; আসলে বলার চেষ্টা হচ্ছে, এ চুক্তি ইরানের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু ১৯৭৯ সাল থেকে মার্কিন নীতিই হচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বে এ অঞ্চলে এবং সম্ভব হলে বৈশ্বিকভাবে ইরানবিরোধী একটি শক্তি দাঁড় করানো।

বাংলাদেশ কী করবে

এই জোটে যোগ দেওয়ার সপক্ষে যাঁরা আছেন, তাঁরা এর সম্ভাব্য সুবিধাগুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন, যার মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা অর্জন এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা। সবচেয়ে জোরালো যুক্তিটি হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশেরই কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, যা দেশকে অরক্ষিত ও বন্ধুহীন করে রেখেছে।

এক বিশ্লেষক ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে মন্তব্য করেছেন, ‘দেশটি যেহেতু “অমুসলিমদের দ্বারা পরিবেষ্টিত মুসলমানদের একটি দ্বীপ”, তাই এ ধরনের চুক্তি সহায়তা বয়ে আনবে।’

অন্যরা বলছেন যে এটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করবে এবং বাংলাদেশের অস্ত্র আমদানির উৎসকে বহুমুখী করবে। জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে অন্তত সাধারণ মানুষের কাছে এটাই মূল বিবেচ্য বিষয়। তাদের অনেকে মনে করেন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে এই চুক্তিতে যোগদান একটি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশ অমুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি দ্বীপ—এ যুক্তি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ; কারণ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো ধর্মীয় পরিচয় দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়; বরং তা পরিচালিত হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে—সামরিক, কৌশলগত অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক। জোটে যোগ দিলে অস্ত্র আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় হবে, এ যুক্তিও ত্রুটিপূর্ণ এই কারণে যে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তুরস্ক থেকে অস্ত্র কিনছে এবং ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুরু হয়েছে।

পক্ষান্তরে এই জোটে যোগ দেওয়ার গুরুতর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কিছু চলমান সংঘাত এবং দীর্ঘদিনের উত্তেজনা বিদ্যমান, তাই বাংলাদেশের এই জোটে যোগ দেওয়ার অর্থ হলো দূরবর্তী সেই সংঘাতগুলোকে নিজের ঘরে টেনে আনা। আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশ ও শক্তির মধ্যকার সংঘাত—যেমন ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যকার লড়াই—বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থের বিবেচনায় অত্যন্ত নগণ্য। অথচ এ চুক্তি বাংলাদেশকে তার অংশীদার বানিয়ে দেবে।

মক্কা চুক্তির কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশকে যুদ্ধে সেনা পাঠাতে হতে পারে। ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে এটি কি বাংলাদেশের সামরিক সম্পদ ব্যবহারের সেরা উপায়? ভৌগোলিক বা কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যান্য দেশের হুমকিসংক্রান্ত চেতনাকে ধারণ করার বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ অমুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি দ্বীপ—এ যুক্তি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ; কারণ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো ধর্মীয় পরিচয় দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়; বরং তা পরিচালিত হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে—সামরিক, কৌশলগত অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক। জোটে যোগ দিলে অস্ত্র আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় হবে, এ যুক্তিও ত্রুটিপূর্ণ এই কারণে যে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তুরস্ক থেকে অস্ত্র কিনছে এবং ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুরু হয়েছে।

চুক্তিটির প্রতি বাংলাদেশের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে; কারণ, ভারত এটিকে তাদের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের নীরব উপস্থিতির সুযোগ এবং নিরাপত্তাহুমকি হিসেবে দেখছে। এতে বাংলাদেশ ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে যেতে পারবে। ভারতের এ উদ্বেগের বিষয়ে বাংলাদেশের সচেতন থাকা উচিত, কিন্তু জোটে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যেন কেবল এর দ্বারা প্রভাবিত না হয়।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের মাধ্যমে চালিত হওয়া উচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে যেসব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা এর ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য ক্ষতিকে নাকচ করে দেয় না। বর্তমান অবস্থার বিবেচনা এবং আবেগপ্রবণ হয়ে চটজলদি কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সরকারের করণীয় হচ্ছে, সবার সঙ্গে আলোচনা করা। এর জন্য সংসদ আছে। প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীদের স্বল্পাকারে দেওয়া বিবৃতি নয়, দরকার বিস্তারিত আলোচনা—সরকার কী ভাবছে, কেন ভাবছে।

  • আলী রীয়াজ  সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর।

  • মতামত লেখকের নিজস্ব