এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যা করা হয়েছে, তার অনেকটাই সাহসী পদক্ষেপ। স্বাস্থ্য বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। প্রতিটি ইউনিয়নে উন্নত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা আছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার থেকে ভ্যাট তুলে নেওয়া হয়েছে। ক্যানসারের ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক কমেছে। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অসংক্রামক রোগ বা এনসিডি প্রতিরোধকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এগুলো সঠিক পদক্ষেপ এবং এগুলোর প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু এই একই বাজেটে তামাকের বিষয়ে যা করা হয়েছে, তা এসব উদ্যোগের ভিত্তিকে নীরবে ভেঙে দিচ্ছে এবং যেভাবে করা হয়েছে, সেটি শুধু দুর্বল নীতি নয়; বরং পরিসংখ্যান বলছে এটি তামাকশিল্পের পক্ষে নেওয়া একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত।
এনসিডি প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি, তামাকের বাস্তবতা
বাংলাদেশে এখন মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ হয় এনসিডি বা অসংক্রামক রোগ যেমন ক্যানসার, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, স্ট্রোক ইত্যাদি থেকে। তামাক এই রোগগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিবছর দুই লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকালে মারা যান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনসিডি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর কিন্তু সহজ হাতিয়ার হলো তামাকের দাম এতটা বাড়ানো, যাতে মানুষ কিনতে নিরুৎসাহিত হয়।
এখন মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে দেখুন। ২০২১ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিসে যেমন আলু ৮৭ শতাংশ, আটা ৭৫ শতাংশ, অন্যান্য দ্রব্য ৫০-৬০ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি এই সরকার গঠন করার পরও সে ধারা অব্যাহত আছে।
কিন্তু একই সময়কালে সিগারেটের দাম নামমাত্র বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে সিগারেট আসলে আগের চেয়ে সস্তা হয়ে গেছে। রান্নার তেল যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় কিন্তু সিগারেট যায় না, তখন বুঝতে হবে একটি প্রাণঘাতী পণ্য নীরবে সুরক্ষিত থাকছে আর সেটা সরকারের ভুল ও আত্মঘাতী পলিসির কারণেই। তাই বাজেটে এনসিডি প্রতিরোধের জন্য হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে তামাক কার্যত সস্তা রাখা, এই দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল না রেখে সিগারেটকে বাস্তবে সস্তা রাখা; চার স্তর বজায় রেখে কম আয়ের মানুষের ধূমপান ছাড়ার পথ বন্ধ রাখা এবং কর না বাড়িয়ে দাম বাড়িয়ে সরকারি রাজস্বের বদলে তামাক কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা।
চার স্তর বজায় রাখা: কম আয়ের মানুষকে ধূমপানে আটকে রাখার কূটকোশল
বাংলাদেশে সিগারেটের চার স্তরের মূল্য কাঠামো আছে—নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ, প্রিমিয়াম। এটি দেখতে বৈচিত্র্যময় মনে হয়, আসলে এটি একটি মানুষকে বিশেষ করে দরিদ্র ও তরুণদের সিগারেটে আটকে রাখার কূটকৌশল। ওপরের স্তরে দাম বাড়লে ধূমপায়ী নিচের স্তরের সিগারেট ছেড়ে না দিয়ে নিম্নস্তরে যাওয়ার একটা সুযোগ রেখে দেওয়া হয়। সব সময় একটি সস্তা বিকল্প খোলা থাকে, আর এতগুলো স্তর রেখে সরকার মূলত তামাক কোম্পানির কূটকৌশলকে বাস্তবায়নে সহায়তা করে।
বাজারের ৯০ শতাংশ সিগারেট নিম্ন ও মধ্যস্তরের। এই স্তরের ধূমপায়ীরা মূলত কম আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং তরুণ যাঁরা সবচেয়ে বেশি তামাকজনিত রোগে ভোগেন, সবচেয়ে কম চিকিৎসা পান, সবচেয়ে বেশি অকালে মারা যান। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্কুলের নাশতার চেয়েও সস্তায় সিগারেট কেনা যায়, যা কিশোর-কিশোরীদের ধূমপান শুরু করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে নিম্নস্তরে এবার বাড়ানো হয়েছে মাত্র ২ টাকা অর্থাৎ ১০ শলাকার সিগারেট ৬০ থেকে ৬২ টাকা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে এ রকম উদাহরণ খুব কমই আছে। এর মাধ্যমে এটি দরিদ্র মানুষের ধূমপান ছাড়ার সুযোগ আরও একবার নষ্ট করা হলো, আর তরুণদের তামাক শুরু করতে প্রণোদনা দেওয়া হলো।
বাজারে বিক্রি শলাকায়, কিন্তু দাম নির্ধারণ প্যাকেটে: সরকার যেভাবে রাজস্ব হারাচ্ছে
নিম্নস্তরের সিগারেটের সরকারি দাম এখন ৬২ টাকা প্রতি ১০ শলাকা। কাগজে-কলমে প্রতি শলাকার দাম ৬.২ টাকা। কিন্তু বাস্তবে সারা দেশের দোকানে এই সিগারেট একক শলাকায় আগে থেকেই বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকায়। এই ০.৮ টাকার পার্থক্য ছোট মনে হয়, কিন্তু মাত্রাটা বুঝুন।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে শুধু নিম্নস্তরের সিগারেট বিক্রি হয়েছিল ৬৮.৮৯ বিলিয়ন শলাকা। এই বিপুল পরিমাণের বিরুদ্ধে প্রতিটি শলাকায় ০.৮ টাকার করমুক্ত ব্যবধান হিসাব করলে দাঁড়ায় ৫,৫১২ কোটি টাকা। সরকারের ভুল নীতির কারণে এই টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।
সিগারেটের শলাকা বিক্রি বন্ধ করলে (যা অনেক দেশ করেছে) এই ফাঁকি বন্ধ যায়। তরুণদের প্রথমবার সিগারেট কেনার বাধা বাড়ে এবং পুরো প্যাকেটের ভিত্তিতে কর আদায় হয়। কিন্তু এই বাজেটে সে বিষয়ে কিছু নেই। তাই ন্যূনতম দাম ৭০ টাকা রেখে সেই দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে পারলে সরকারের রাজস্ব এখান থেকেই আরও অতিরিক্ত ৫,৫১২ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব ছিল।
কর না বাড়িয়ে দাম বাড়ানো: তামাক কোম্পানির লাভ, সরকারের ক্ষতি
এবারের তামাক নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো: সিগারেটের খুচরা মূল্য বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু করের হার বাড়ানো হয়নি। মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম ৮০ টাকা থেকে ৯২ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক ৬৭ শতাংশ অপরিবর্তিত। ফলে অতিরিক্ত ১২ টাকায় সরকার ৯.৯৬ টাকা বেশি পেলে একই সিগারেট থেকে তামাক কোম্পানিও আগের চেয়ে ২ দশমিক ২ টাকা বেশি মুনাফা পাবে। অথচ সরকার এখানে সুনির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) কর দিলে পুরো বৃদ্ধিটাই সরকারের রাজস্বে আসতে পারত।
উল্লেখ্য, গত বছরের মাঝপথে হঠাৎ কর বৃদ্ধির পর আনুষ্ঠানিক বাজারে সিগারেট বিক্রি ৮৪.৩৩ বিলিয়ন থেকে ৬৫.৬৩ বিলিয়ন শলাকায় নেমেছে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব কমেনি, বরং বেড়েছে। কারণ, প্রতি শলাকায় কর বেশি হলে কম বিক্রিতেও বেশি রাজস্ব আয় সম্ভব। এটাই তামাক করনীতির মূল যুক্তি। কিন্তু সরকার উল্টো দিকে যাত্রা শুরু করল।
জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের যে প্রস্তাব উপেক্ষিত
এবার জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলেন: নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে ন্যূনতম ১০০ টাকা করা, সব স্তরে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা নির্দিষ্ট কর যোগ করা। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসত, পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হতেন, ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকতেন, দীর্ঘ মেয়াদে চার লাখ অকালমৃত্যু ঠেকানো যেত।
সরকার সেই পথে যায়নি। ফিলিপাইন ২০১২ সালে শিল্পের লবিং উপেক্ষা করে কার্যকর সিনট্যাক্স (ক্ষতিকর দ্রব্যের ওপর ধার্য কর) সংস্কার করেছিল। এক দশকে সেখানে ধূমপানের হার প্রায় অর্ধেক হয়েছে এবং সরকারি রাজস্ব দিয়ে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু হয়েছে। বাংলাদেশ এই সুযোগ হাতছাড়া করল।
এই প্রস্তাব কার পক্ষে?
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল না রেখে সিগারেটকে বাস্তবে সস্তা রাখা; চার স্তর বজায় রেখে কম আয়ের মানুষের ধূমপান ছাড়ার পথ বন্ধ রাখা; এবং কর না বাড়িয়ে দাম বাড়িয়ে সরকারি রাজস্বের বদলে তামাক কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা।
এই তিনটির কোনোটিই জনস্বাস্থ্যের পক্ষে নয়। তিনটিই তামাকশিল্পের স্বার্থ রক্ষা করে। প্রতিবছর ৮৪ বিলিয়ন শলাকা সিগারেট বিক্রির বাজারে, যেখানে প্রতিটি শলাকা অতিরিক্ত দামে বিক্রির সুযোগ রেখে ওই টাকা করমুক্ত মুনাফা যাচ্ছে, যেখানে দাম বাড়ানোর প্রতিটি টাকার একটা ভাগ কোম্পানির পকেটে যাচ্ছে, এই বাস্তবতায় এনসিডি প্রতিরোধের কথা বলা একটি ফাঁকা প্রতিশ্রুতি।
শেষ কথা
স্বাস্থ্য বাজেটে যা ভালো করা হয়েছে তা যেন বৃথা না যায়, সেটাই প্রত্যাশা। এই উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে হলে রোগীর সংখ্যা কমাতে হবে। রোগী কমাতে হলে তামাক ব্যবহার কমাতে হবে। আর তামাক ব্যবহার কমাতে হলে দাম কার্যকরভাবে বাড়াতে হবে। শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে।
সরকার এনসিডি প্রতিরোধে বিশ্বাস করে বলে বাজেটে দাবি করেছে। সেই বিশ্বাস পরীক্ষা হয় তামাকের দামে, হাসপাতাল নির্মাণেই নয়।
স্বাস্থ্য রক্ষার কথা বলে তামাকের দাম কার্যকরভাবে না বাড়ানো একটি নীতিগত দুর্বলতাই নয়; এটি একটি পক্ষ বেছে নেওয়া এবং সেই পক্ষ জনগণ বা জনস্বাস্থ্য নয়।
ড. শাফিউন নাহিন অধ্যাপক ও পরিচালক। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
[১৭ জুন ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা তামাক করনীতিতে নীরব আপস কার স্বার্থে শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে]