রূপপুরে জ্বালানি স্থাপন: একটি প্রযুক্তিগত মাইলফলক

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী এলাকায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুল্লিফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি, ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং ইরান ও রাশিয়ার তেলের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল অস্থির হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ তার ব্যবহারযোগ্য জ্বালানির ৬৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মিটিয়ে থাকে। প্রধানত হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে (বিশ্বের জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনের পথ) তেল ও এলএনজি আমদানি করে থাকে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতিমধ্যে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে।

কর্তৃপক্ষ যদিও বলছে, জ্বালানির কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। পেট্রলপাম্পের সামনে এখনো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পেট্রল, অকটেন, ডিজেল ও তরলীকৃত গ্যাস কিনতে হচ্ছে। বিদ্যুতে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। সম্প্রতি সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়েছে। সামনে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কথাও শোনা যাচ্ছে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দেশের নাজুক অর্থনীতির বিবেচনায় দেশের জ্বালানিসংকট আরও জটিল ও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

এ অবস্থায় দেশের এই জ্বালানিসংকটকালে রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি দ্রুত চালুর মাধ্যমে দেশের জ্বালানিনিরাপত্তাকে অনেকটা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানে রয়েছে প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট (ইলেকট্রিক) বা ৩২০০ মেগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতাসম্পন্ন রাশিয়ার তৈরি ৩+ প্রজন্মের দুটি আধুনিক ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর। সম্প্রতি ১৬ এপ্রিল রিঅ্যাক্টর-১-এর যন্ত্রপাতি স্থাপন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনসহ পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানিকে পরিচালনার লাইসেন্স প্রদান করেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সফল ও দ্রুত বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বাংলাদেশ, রাশিয়া এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রিঅ্যাক্টর-১-এ পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। এটি দেশের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত মাইলফলক। রিঅ্যাক্টরে ৩-৫ শতাংশ ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ জ্বালানি স্থাপন বা ফুয়েল লোডিং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর-১ নির্মাণপর্ব থেকে কমিশনিং পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এর পর থেকে সব কার্যক্রমই হবে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর পরিচালনার অংশ।

ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে। এরপর রিঅ্যাক্টর কোরে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া শুরু করার আগে কন্ট্রোল রড, জরুরি শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা আবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। সব পরীক্ষা সফল হলে রিঅ্যাক্টরটির মোট ৩২০০ মেগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশ সক্ষমতায় প্রথম নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া সংঘটিত হবে। এটিকে বলা হয় রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি টেস্ট। এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর প্রথমবারের মতো ‘প্রাণ’ পাবে। কম তাপীয় শক্তিতে এই পরীক্ষা করার কারণ হলো, কোনো ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত ফিশন বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

আরও পড়ুন

এরপর রিঅ্যাক্টরের উৎপন্ন তাপ দিয়ে স্টিম জেনারেটরের মাধ্যমে বাষ্প তৈরি হবে। সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করা হবে। ধাপে ধাপে ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ, ৩০ শতাংশসহ বিভিন্ন ইলেকট্রিক সক্ষমতায় রিঅ্যাক্টর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরীক্ষার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা যাচাই করা হয়। এই প্রক্রিয়াকেই কমিশনিং বলা হয়।

পুরো কমিশনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। এরপর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সব নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানিকে লাইসেন্স প্রদান করবে। সেই দিনটি হবে বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য দিন। একবার বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। এ জন্য একে বেজলোড প্ল্যান্ট বলা হয়।

প্রায় ১৮ মাস পরপর প্রতিটি ইউনিটে প্রায় ২৫ টন ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম জ্বালানি বের করে সেই পরিমাণ নতুন জ্বালানি স্থাপন করতে হয়। এ সময় দেড় থেকে দুই মাস রিঅ্যাক্টর বন্ধ রাখা হয়। এরপর আবার প্রায় ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলে। এভাবে প্রতিটি রিঅ্যাক্টর প্রায় ৬০ বছর পরিচালনা করা সম্ভব। সব যন্ত্রপাতি ঠিক থাকলে রিঅ্যাক্টরটি আরও ১০-২০ বছর পর্যন্ত পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

মোট ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে সহায়ক প্রকল্পসহ রূপপুরে নির্মিত ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি রিঅ্যাক্টর এক দিনও বন্ধ থাকলে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হবে। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ তেল, এলএনজি বা কয়লা দিয়ে উৎপাদন করতে গেলে ব্যয় অনেক বেশি হয়।

এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, রিঅ্যাক্টর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কঠোরভাবে নিরাপত্তা সংস্কৃতি অনুসরণ করা। একই সঙ্গে বৈদেশিক নির্ভরতা কমাতে এবং জাতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সফল ও দ্রুত বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

  • ড. মো. শফিকুল ইসলাম অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র

    [email protected]