গত জুলাই মাসে জ্বালানির দাম একধাপে ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পর বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে যে পরিমাণ গ্যাস চুরি হয়, তা ঠেকানো গেলে দিনে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের সিস্টেম লস এখন অনেক বেশি মাথাব্যথার কারণ। এটার পরিমাণ ৮ থেকে ৯ শতাংশ। বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে বিজ্ঞানসম্মতভাবেই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ লস হবেই। এটাকে কখনোই শূন্যতে নামিয়ে আনা যাবে না। তেলের ক্ষেত্রেও সেটা হয়। কিন্তু সরবরাহ লাইনে লিক না থাকলে গ্যাসে কোনো লস হওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং, গ্যাসের সিস্টেম লসটা পুরোপুরি চুরি। সরকার নিজেও তা জানে, তিতাসও জানে। আমাদের জাতীয় সম্পদ এভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে। আর এখন তো আমরা অনেকটা সোনার দামে এলএনজি কিনে নিয়ে আসছি। জাতীয় স্বার্থে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গ্যাসের এই চুরি বন্ধ করতে হবে।’

জ্বালানিসংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসে লেগেছে আমাদের শিল্প ও ব্যবসা খাতে। উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়েছে শিল্প উদ্যেক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীতে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় তাঁদের কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ কারণে উৎপাদন কমছে। রপ্তানির ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কর্মসংস্থান নিয়েই। ব্যবসায়ীনেতারা এখন চান প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ। তাঁরা বলছেন, প্রয়োজনে দ্রুত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে সরকারকে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করতে হবে।

সম্প্রতি ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনে মাত্রাতিরিক্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কীভাবে পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়াচ্ছে, সে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আইপিডি গবেষণায় দেখিয়েছে, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ২৮ লাখ ইউনিট শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এ যন্ত্রগুলো গড়ে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দৈনিক ৮ ঘণ্টা ব্যবহার করলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় চালালে অন্তত ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব।

গরম ও শীতের মৌসুমে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদার ব্যবধান প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিশাল এ ব্যবধান তৈরি করে দিচ্ছে মূলত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রির নিচে নামতে না দেওয়ার নীতিমালা রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে যেখানে বিদ্যুতের প্রাথমিক জ্বালানির নিশ্চয়তা নেই, বিশ্ববাজার থেকে প্রয়োজনীয় তেল-গ্যাস কেনার মতো ডলার যেখানে নেই, সেখানে প্রতিবছর ঢাকায় ২০ শতাংশ করে এসির ব্যবহার বাড়ছে।

কোভিড–উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার বাড়িয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হয়। ডলারের সংকটে দ্রুত কমে আসতে শুরু করে রিজার্ভ। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে টেকসই নীতি ও পরিকল্পনা কোনোকালেই ছিল না। বিএনপি সরকার নিজস্ব গ্যাস থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র করতে পারেনি। আর আওয়ামী লীগ সরকার প্রাথমিক জ্বালানির উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করে গেছে। কিন্তু আমদানিনির্ভর ও অটেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা যে কতটা ফাঁপা, কতটা ঠুনকো, তা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সংকট তৈরি হলেই দেখা গেল।

গত জুলাই মাসে প্রথমে এক ঘণ্টার পরিকল্পিত লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা বলে সরকার। কিন্তু খুব শিগগির পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা এককথায় লন্ডভন্ড হয়ে যায়। অক্টোবর মাসে এসে লোডশেডিং পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে বলে জানিয়েছিল সরকার। কিন্তু অক্টোবর মাসে এসে দেখা গেল, খোদ রাজধানী ঢাকার কোনো কোনো এলাকায় দিনে–রাতে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। ঢাকার বাইরে কোথাও কোথাও সেটা ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠেকেছে।

আবার লোডশেডিং ফিরে আসায় জনজীবনে বিরক্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নানাভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করছে। কিন্তু জ্বালানিসংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসে লেগেছে আমাদের শিল্প ও ব্যবসা খাতে। উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়েছে শিল্প উদ্যেক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীতে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় তাঁদের কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ কারণে উৎপাদন কমছে। রপ্তানির ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কর্মসংস্থান নিয়েই। ব্যবসায়ীনেতারা এখন চান প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ। তাঁরা বলছেন, প্রয়োজনে দ্রুত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে সরকারকে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করতে হবে। বাসাবাড়ি, সার কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হবে।

এরপর গত ২৬ অক্টোবর শিল্প ও ব্যবসা খাতের নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান। তাঁরা বলেন, প্রয়োজনে তাঁরা গ্যাসের বর্তমান মূল্যের চেয়ে আরও বেশি দাম দিতে রাজি তবুও সরকার বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করুক।

উদ্বেগ যে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও ছড়িয়েছে, তা বিসিআইয়ের আলোচনা সভায় জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর ভাষ্য থেকে স্পষ্ট। তিনি বলেন, দেশের রিজার্ভের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা সম্ভব নয়। আবার কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে সার কারখানাতেও গ্যাসের সরবরাহ কমানো সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে তাঁর সমাধান হলো, সবাই মিলে শপথ করে দিনের বেলা বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ রাখা। উপদেষ্টার এই বক্তব্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, এতোটা শঙ্কিত হওয়ার পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ–জ্বালানির যে সংকট, সেটা দীর্ঘমেয়াদি। দশকের পর দশক ধরে চলা ভুল জ্বালানি নীতির কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এ সংকটের আশু কোনো সমাধান নাই। বিদ্যমান বাস্তবতায় ফ্রিজ ও এসির তাপমাত্রা বাড়িয়ে, অপ্রয়োজনে লাইট–ফ্যান বন্ধ রেখে, প্রয়োজন ছাড়া মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট গাড়ি রাস্তায় বের না করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় করা গেলে, কিছুটা স্বস্তি মিলত। সিস্টেম লসের নামে গ্যাস চুরি বন্ধ করা গেলে তা দিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা যেত। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একটা সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু সেই কাজে নেতৃত্ব দেবে কে? দেশে অর্থনীতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকটটা কতটা, এ থেকে উত্তরণের পথ কী—এসব বিষয়ে কি সরকারের কোনো স্বচ্ছ ভাষ্য ও দিকনির্দেশনা আছে? বরং উপদেষ্টা, মন্ত্রী কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন, তাতে জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে শঙ্কা ও বিভ্রান্তি। প্রশ্ন হলো, সংকটের সময় জাপানিরা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারলে আমরা কেন পারি না?

 রাষ্ট্র, রাজনীতি কিংবা সরকার থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে প্রেস রিলিজ  কিংবা বক্তব্য দিয়ে কি বিদ্যুৎ–জ্বালানি সাশ্রয়ে তাঁদেরকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব? ডলার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার যে আট করণীয় ঠিক করেছিল তা নিজেরা কতটুকু পালন করছে? ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’—এ আপ্তবাক্য যেমন কার্যকর, আবার এর চর্চাও বহু প্রাচীন। জাতীয় সংকটে নাগরিকেরা তাঁদের সামনে কোনো নেতৃত্ব কিংবা দিশা কি দেখতে পাচ্ছেন?

  • মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক