সংসদে ভাষণে কি রক্তাক্ত পদ্মার চর শান্ত হবে

বাড়ির সামনে থেকে ছেলেকে গুলি করে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর স্বপন বেপারীর মা রোকেয়া বেগমের আহাজারি। গত ২০ মে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কালিদাস খালি গ্রামে।ছবি: প্রথম আলো

‘...যেহেতু আওয়ামী লীগের সময় এই সন্ত্রাসটা ছিল না। এখন মানুষ বলছে যে বিএনপি এসে এই সন্ত্রাস শুরু হয়েছে। যেকোনো মূল্যে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, সে বিএনপির যে নেতাই প্রশ্রয় দিক, এই বালুমহাল বন্ধ করতে হবে।’

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা এই বক্তব্য দেন। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা হচ্ছে—এবার কি পদ্মার চরের রক্তাক্ত জনপদ শান্ত হবে?

রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই জনপদ। চার জেলার পদ্মার এই দুর্গম চরাঞ্চলে প্রায় ২০ বছর আগেও দুটি সন্ত্রাসী বাহিনীর উত্থান ঘটেছিল। তাদের ভাগ না দিয়ে কেউ চরের ফসল ঘরে তুলতে পারতেন না।

এ নিয়ে দ্বন্দ্বে তাদের হাতে ওই সময় ৪১ জন মানুষ খুন হন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তখন চরের মাটিতে পা দিতে গা ছমছম করত। দুই বাহিনীর নাম ছিল ‘পান্না বাহিনী’ ও ‘লালচান বাহিনী’। ২০০৫ সালে ‘ক্রসফায়ারে’ পান্না নিহত হন। একইভাবে তাঁর প্রতিপক্ষ লালচানসহ দুই বাহিনীর অন্তত ২৫ জন সদস্য নিহত হন। তারপর শান্ত হয়েছিল পদ্মার চর।

সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লার ভাষণের প্রসঙ্গে আত্মগোপনে থাকা সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘১৫ বছরে চরের চেহারা পাল্টে দিয়েছিলাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল।’

এদিকে গত বছর ২৭ অক্টোবর চরে ফসল কাটাকে কেন্দ্র করে গুলিতে দৌলতপুরে তিন কৃষক নিহত হন। এই ঘটনায় পরে পদ্মার চরে পুলিশ, র‌্যাব ও এপিবিএন সদস্যদের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ পরিচালনা করে মোট ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র। তারপরও থামেনি এই প্রাণহানি।

সর্বশেষ গত ১৬ জুন নাটোরের লালপুর উপজেলার রাইটার চর এলাকায় পদ্মা নদীতে ভাসমান একটি নৌকা থেকে সাহাবুল ইসলাম (৪৫) নামের এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে গত ৯ জুন লালপুরের চরজাজিরা এলাকায় পদ্মা নদীতে ভাসমান একটি স্পিডবোট থেকে এক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। তার আগে গত ১৮ মে রাতে বাঘার কালিদাসখালি এলাকায় বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তরা গুলি করে স্বপন ব্যাপারীকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর কোনো সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। চরে বিভিন্ন পক্ষের আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে গত বছরের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।

গত ৯ মে রাজশাহীর বাঘায় পদ্মার চরে ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট।’
ছবি: সংগৃহীত

এই অবস্থায় সংসদে এই ভাষণ এলাকা শান্ত করতে কতটুকু ভূমিকা রাখবে, গত ২৫ জুন মুঠোফোনে জানতে চেয়েছিলাম সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লার কাছে। তিনি প্রথম আলোকে বললেন, ‘আমি অতিষ্ঠ হয়ে গেছি, আমাদের যে চিলমারীর চর আর মরিচার চরে ধরেন, আমার জমির খড় বিক্রি করছেন আপনি। এখন আগামীবার দল যদি আমাকে নমিনেশন দেয়। আমি যদি ভোট চাইতে যাই এই পাবলিক বলবে, তুমি তো আমার খড়-জমি ঠেকাইতে পারো নাই। বলবে না, বলেন? রাগের চোটে বলেছি। যেটা একটা বাস্তব সত্য কথা। আমি এগুলো নিয়ে খুব বিপদে, বিব্রত আছি।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সাড়া পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমি লিখিত দেব।’ এলাকায় তাঁর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনি খোঁজ নেন। হয়তো সবাইকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। আমার তো শিল্পাঞ্চল। আমি ইচ্ছা করলে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করতে পারতাম “৫ তারিখের পর”। আপনি খোঁজ নেন, কোনো শিল্পপতির বলার ক্ষমতা নেই যে আমি একটি টাকা চাইছি। নির্বাচনের সময় তাঁরা তাঁদের ম্যানেজারকে দিয়ে আমাকে কিছু সাহায্য করেছে। আমি এই সন্ত্রাস বন্ধ করার চেষ্টা করছি। এখন আল্লাহ ভরসা।’  

এই সংসদ সদস্যের ছেলে শিশির মোল্লাকে নিয়েও প্রতিপক্ষ কথা বলছে। তিনি নাকি একটি গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেন। এ জন্য মুঠোফোনে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে জাতীয় সংসদে দেওয়া এই ভাষণে কি পদ্মার চর শান্ত হবে?

জবাবে তিনি বলেছেন ‘নো কমেন্ট।’ এটা সরকারের ব্যাপার। তিনি কিছু বলতে পারেন না। পদ্মার চরের এই বালু ব্যবসায়ের সঙ্গে তাঁর কোনো অংশীদারত্ব  রয়েছে কি না এ ব্যাপারে তিনি খোলাখুলি বলেন, ‘এই ব্যবসায়ের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নাই। থাকলে আপনারা সাংবাদিক, তাঁদের সঙ্গে কোথাও না কোথাও আমাকে দেখতে পেতেন।’ পদ্মার চরের একসময়ের দাপুটে বাহিনী লালচানের লোকজনকে প্রশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে আপনার ভূমিকা রয়েছে বলে এক পক্ষ অভিযোগ করেন।

এই ব্যাপারে আপনি কী বলবেন—জবাবে তিনি বলেন, ‘লালচান ক্রসফায়ারে মারা গেছে। এখন তার ছেলেরা রয়েছে। আত্মীয়স্বজন রয়েছে। তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক কারণে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই হয়েছে। না রাখলে তারা আরেক জায়গায় চলে যাবে। তবে তাদের কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তিনি সমর্থন করেন না। এ জন্যই ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর লালচানের বড় ছেলে রুবেলকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।’

গুলি করে তুলে নিয়ে যাওয়া স্বপন ব্যাপারীর জমিতেই চলছে বালু মজুদের কারবার। এক বছরের জন্য বালু ব্যবসায়ীরা জমিটা ইজারা নিয়েছেন। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কালিদাস খালি গ্রামে।
ছবি: প্রথম আলো।

লালচানের বড় ছেলে রুবেলের সঙ্গে গত ২৭ জুন মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। তাঁর আটকের ব্যাপারে বললেন, তখন একটা জমিজমা নিয়ে ঝামেলার কারণে তাঁকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আবার চরের দুইটা হত্যা মামলা দিয়েছে। আমি এখন আত্মগোপনে রয়েছি। তবে মামলা কোনো ব্যাপার না। যেখানেই থাকি ৫০০ টাকা দিনে রোজগার করার সামর্থ্য আছে। তাহলেই সংসারটা চলবে। আর এসব মামলা মিথ্যা। মামলা টিকবে না।’ এ নিয়ে চিন্তা করছেন না।

রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শামীম সরকার পদ্মার চরে সন্ত্রাস এবং বালুমহালের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। বালু ব্যবসায়ের ওপর তিনিও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর বাড়ি বাঘায়। জাতীয় সংসদে দেওয়া সংসদ সদস্যের এই ভাষণে পদ্মার চর শান্ত হবে বলে মনে করেন কি না জানতে চাইলে শামীম সরকার সংসদ সদস্যের ভাষণের সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে পদ্মার চরে সন্ত্রাস হয়নি, এটা ঠিক না। তখন কাঁকন বাহিনীর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এ জন্য কোনো সংঘর্ষ হয়নি। এখন বিএনপি আসার পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। এই জন্য সংঘর্ষ হচ্ছে। খুনোখুনি হচ্ছে। তিনি মনে করেন না যে শুধু সংসদে ভাষণ দিলেই পদ্মার চর শান্ত হয়ে যাবে।

কথা বলার জন্য রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মো. জালাল উদ্দিন বলেছেন, ‘এখন যারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে, তারা পতিত সরকারের আমলের লোক। আমরা তাদের মোকাবিলা করার জন্য ইতিমধ্যে বাঘার চরে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের কাজ শুরু করেছি। দুর্গম চরে দ্রুত যোগাযোগের জন্য একটি ব্রিজ নির্মাণের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চরের সন্ত্রাস নির্মূলের ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী বলে জানিয়েছেন।

তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী বর্তমানে পদ্মার চরে সক্রিয় বাহিনীগুলো হচ্ছে, কাঁকন বাহিনী, মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাইদ বাহিনী, লালচাদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরিফ তাগী বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী, শুকচাঁদ বাহিনী, গাহারুর বাহিনীসহ মোট ১১টি।

যে খুনগুলো হচ্ছে তার তদন্ত করছে নৌ পুলিশ। সেই তদন্তের খুব একটা অগ্রগতি নেই। পাবনা, নাটোর ও কুষ্টিয়া এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুন্ডা নৌ পুলিশের ফাঁড়ি ইনচার্জ শফিকুল ইসলামের মতে, কুষ্টিয়া ও পাবনায় যদি আরও দুইটা বালুমহাল চালু করা যায়, তাহলে বালুকেন্দ্রিক সহিংসতা কমতে পারে। কারণ, এখন এতদঞ্চলে শুধু রাজশাহীর বাঘা উপজেলার লক্ষ্মীনগরে একটি বালুমহাল চালু রয়েছে। সাম্প্রতিক দুটি খুনের পর সেটিও বন্ধ রাখা হয়েছে।

তাঁর হাতে বর্তমানে তিনটি খুনের মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। আসামিরা নির্দিষ্ট লোকেশনে থাকে না বলে মামলাগুলোর তদন্তের লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি জানান। বাঘার কালিদাসখালির স্বপন ব্যাপারীকে বাড়ির সামনে গুলি করে তুলে নিয়ে যাওয়ার মামলাটিরও তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। তদন্ত কর্মকর্তা চারঘাট ও বাঘা নৌ পুলিশের ইনচার্জ হুমায়ুন কবির বললেন, মামলার কোনো সাক্ষী নাই। তারা অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত করছেন।

কিন্তু স্বপন ব্যাপারীর বাবা সিদ্দিক ব্যাপারী জানান, তাঁরা এখন অনেক হুমকির মুখে রয়েছেন। ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ নিজে এসে বলেছিল, ‘আপনারা এখানে থাকতে পারবেন না। এখান থেকে উঠে যান।’ গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) দিবাগত রাতে তিনি ফোন করে বলেন, তাঁর নাতি স্বপনের ছেলেকে রাতে ঘুমানোর জন্য অন্য একটি বাড়িতে রাখতে হয়। সেই বাড়ির জানালাতেও দুর্বৃত্তরা এসে বাড়ি দিচ্ছে। আমরা আর কোথায় যাব?

  • আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

মতামত লেখকের নিজস্ব