আটার রুটিতে অবিবেচক পাবলিকের অহেতুক আসক্তির প্রতি একটি দেশাত্মবোধক উষ্মা প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা সবাই যেন গমের আটার রুটি খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেছি! আমরা তিন মাস গমের রুটি না খাই। দেখি না কী হয়? আমরা চালের আটার রুটি খাব। অসুবিধা কোথায়?’

আলোচ্য প্রস্তাবাংশে প্রতিমন্ত্রী টানা তিন মাস গমের রুটির বদলে চালের রুটি খাওয়ার মধ্যে অসুবিধা কোথায়—সেই সম্পূরক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই অতি সহজসাধ্য খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের তিন মাসের মেয়াদকাল শেষে আমরা অন্তত ‘দেখি না কী হয়’ ধরনের একটি ফল পাব বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন। যেখানে গমের আটা কেনার খরচ জোগাতে গিয়ে অনেকে ‘কাছা খুলে যাচ্ছে’ বলে দাবি করছেন, সেখানে প্রতিদিন চালের আটার খরচ জোগাতে কেন তাঁদের অসুবিধা হবে, সেটি প্রতিমন্ত্রীর বুঝতে না পারার মধ্যে নিশ্চয়ই সাধারণের উপলব্ধির অতীত কোনো মহৎতর তাৎপর্য রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী মহোদয় সম্ভবত নিশ্চিত যে আমরা যে গম আমদানি করি, তার আটা দিয়ে শুধু পিঁড়িতে বেলন দিয়ে বেলে বানানো বৃত্তাকারের পাতলা রুটি বানানো হয় এবং সেই রুটির আটা জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের ডলার শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের লাখ লাখ বেকারিতে যে পাউরুটি, বিস্কুট, কেকসহ হরেক পদের খাবারদাবার তৈরি হয়; একজন রিকশাওয়ালা কিংবা দিনমজুর সকালে নাশতা হিসেবে দোকান থেকে কলার সঙ্গে যে পাউরুটি কিনে খান তা যে গমের আটা ও ময়দা দিয়ে বানানো হয়, সেটিকে তিনি অত্যন্ত যুক্তিনির্ভরভাবে ‘গোনায়’ ধরেননি। যদি ধরতেন, তাহলে এসব খাবারও চালের আটা দিয়ে বানানো যায় কি না, সে বিষয়ে আমাদের হয়তো একটি নিরীক্ষা চালানোর হ্যাপা পোহাতে হতো।

তবে প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের এ প্রস্তাবের মধ্যে একটি ছোট্ট আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। সেটি হলো তাঁর কথামতো গমের আটা খাওয়া বন্ধ করে আমরা যদি সবাই একযোগে চালের ওপর হামলে পড়ি, তাহলে আমাদের চালের গুদামে যে ‘সুললিত’ শূন্যতা দেখা দেবে, তা খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চঞ্চল করে বসতে পারে। তখন বেশ কিছুদিন আগে যেভাবে বলা হয়েছিল, ঠিক একইভাবে আবারও আমাদের বলা হতে পারে, ‘আমরা অনেক বেশি ভাত খাই। আমরা একেকজন দিনে প্রায় ৪০০ গ্রাম চাল খাই, পৃথিবীর অনেক দেশে ২০০ গ্রামও খায় না।’

সীমাহীন লুটপাটের ওপর দাঁড়ানো একটা ভয়ানক অসম উন্নয়নের পিরামিড থেকে অর্থনৈতিক সুবিধার যে ছিটেফোঁটা চুইয়ে পড়ে, তাতে সর্বজনীন উন্নয়ন হয় না। এই ব্যবস্থায় অল্প কিছু মানুষের ঘরে থাকে ‘জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার’। তাঁরা অবৈধ পথে ফরেন কারেন্সি ফরেনে পাঠিয়ে সাধারণ মানুষকে ভাত কম খেয়ে অথবা চালের আটার রুটি খেয়ে ডলারের ঘাটতি মেটাতে বলেন।

জিনিসপত্রের দাম সামান্য একটু বাড়াতেই লোকেরা কেন উতলা হচ্ছে, সে বিষয়েও প্রতিমন্ত্রী মহোদয় প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দাম সামান্য বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘সবাই বলে জিনিসের দাম বেড়েছে। সবাই বলে এটা হয়েছে, সেটা হয়েছে। জিনিসের দাম কী (কতটুকু) বেড়েছে, বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পারছেন না। এখানে সামান্য বেড়েছে, তাতেই মানুষের মনে অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে।’ জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘এই যে ভোজ্যতেল, সেটি আসে কোত্থেকে? সব আসে ইউক্রেন-রাশিয়া থেকে। আজকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হওয়ার কারণে সারা বিশ্বে ধস নেমেছে। এমনও দেশ আছে, এক কেজি চালের দাম ৫০০ টাকা। অথচ বাংলাদেশের মানুষ এখনো স্বল্পমূল্যে সব খাচ্ছেন।’

এখানে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছি। একটি হলো ‘ভোজ্যতেল সব আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে’। অথচ সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে এত দিন আমরা জেনে এসেছি বাংলাদেশে সয়াবিন তেল মূলত আমদানি করা হয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে। ইউক্রেন থেকে আসে মূলত সূর্যমুখী তেল। পাম অয়েল আসে প্রধানত ইন্দোনেশিয়া থেকে।

প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো বাংলাদেশের মানুষ অন্য দেশের তুলনায় খুবই কম দামে খাবার খাচ্ছে।

লন্ডনে পেট্রলের দাম তিন গুণ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘আজকে বাংলাদেশে পেট্রলের দাম হলো ৯০ টাকা। লন্ডনে গিয়ে দেখি, পেট্রলের দাম এক পাউন্ড ছিল। এক পাউন্ডের দাম হলো ১১০ টাকা। সেখানে এখন পেট্রলের দাম ৩ দশমিক ৫৩ পাউন্ড। এর মানে হচ্ছে লন্ডনে ৩৭০ থেকে ৩৮০ টাকা এক লিটার পেট্রলের দাম। আর আমাদের এখানে সরকার দিচ্ছে ৯০ টাকায়। অথচ মানুষ বুঝতে পারে না কিছু।’ (প্রতিমন্ত্রী এ কথা বললেও সত্য হচ্ছে লন্ডনে পেট্রল কখনোই ২ পাউন্ডের ওপরে যায়নি। এখন তা হচ্ছে ১.৮০ পাউন্ড লিটার।)

আলোচ্য অংশে লন্ডনে একজন মানুষের সর্বনিম্ন আয় কত আর বাংলাদেশের একজন মানুষের সর্বনিম্ন আয় কত তা বিবেচনায় না নিয়েই দুই দেশের তেলের মূল্যের একটি তুলনামূলক রেখাচিত্র তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা আমাদের আমোদিত করেছে। তিনি বলেছেন, লন্ডনে যে তেলের দাম ৩৮০ টাকা, বাংলাদেশে তার দাম ৯০ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষের আয় কত আর যুক্তরাজ্যের একজন মানুষের আয় কত, সেটি উল্লেখ না করার মধ্য দিয়ে আমরা একটি তুলনামূলক সামষ্টিক বাজার অর্থনীতির চিত্র পেয়েছি।

নিন্দুকেরা বলে বেড়ান, সীমাহীন লুটপাটের ওপর দাঁড়ানো একটা ভয়ানক অসম উন্নয়নের পিরামিড থেকে অর্থনৈতিক সুবিধার যে ছিটেফোঁটা চুইয়ে পড়ে, তাতে সর্বজনীন উন্নয়ন হয় না। এই ব্যবস্থায় অল্প কিছু মানুষের ঘরে থাকে ‘জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার’। তাঁরা অবৈধ পথে ফরেন কারেন্সি ফরেনে পাঠিয়ে সাধারণ মানুষকে ভাত কম খেয়ে অথবা চালের আটার রুটি খেয়ে ডলারের ঘাটতি মেটাতে বলেন। তখন সাধারণ মানুষের কিল মারার গোঁসাইয়ের কথা মনে আসে। তাঁদের মনে রাখতে হয়, কিল আসলে সব রাষ্ট্রকেই মারতে হয় তার ক্ষমতা রক্ষার তাগিদে। প্রয়োজনভেদে তার পাত্র ও মাত্রার তফাত ঘটে মাত্র।

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন