ছোট্ট মেয়ের বন্ধু সজারু: কুকুর হত্যা আর আমাদের মানবিকতা

ছোট মেয়ের কোলে বিড়াল আর পিছু পিছু ছুটছে সজারু। শ্রীলঙ্কার একটি গ্রামের এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলে।ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোজ কত–কী দেখি আমরা! প্রতিটি স্ক্রল মানেই নতুন নতুন স্ট্যাটাস কিংবা ভিডিও। এত বেশি তথ্য আমাদের সামনে প্রতিমুহূর্তে আসে যে মগজে খানিকটা ডোপামিন নিঃসরণ ঘটানোর চেয়ে বেশি কিছু আর হয় না, ভুলে যাই মুহূর্তেই; একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে অনলাইনের স্মৃতির আয়ু অতি সামান্য।

কিন্তু কিছু দৃশ্য মানুষ সহজে ভুলতে পারে না। যেমন সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজারের কুমিরকে একটি জীবন্ত কুকুর খাওয়ানোর দৃশ্যটি। কুকুরটি অসহায়ের মতো ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে। মানুষ বাধা দেয়নি, বরং উল্লাস করে দেখছে। ঘটনাটির নিষ্ঠুরতা আশপাশের মানুষদের চোখে পড়েনি, কিন্তু প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছিল নেটিজেনদের।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেল, একটি কুকুরের লেজে ইট বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পানিতে ফেলার পর কুকুরটি প্রাণপণে বাঁচতে চাইছে, কিন্তু তার বাঁচার চেষ্টাকে অনেকের কাছে বিনোদন মনে হলো। যারা বাঁচাতে পারত, তারা আসলে বাঁচানোর পরিবর্তে কুকুরটির ছটফট করতে করতে মরার উত্তেজনাকেই উপভোগ করতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। এখানে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় আছে—এ কাজ করতে কুকুরটি বাধা দেয়নি। কাজটি করা সহজ হয়েছে; কারণ, কুকুরটি মানুষকে বিশ্বাস করেছিল, পরম বিশ্বাসে ইট বাঁধতে দিয়েছে। আঘাত করে বাঁচতে চায়নি বা দৌড়ে পালিয়ে যায়নি।

এই ভিডিওগুলো দেখার পর প্রশ্ন এসেছে স্বাভাবিকভাবেই—কীভাবে একজন মানুষ এমন করতে পারে? আরও বড় প্রশ্ন হলো—এমন দৃশ্য দেখে যারা আনন্দ পায়, ভিডিও ধারণ করে বা নীরব থাকে, তাদের হৃদয়ে কি ধীরে ধীরে কিছু একটা মরে যাচ্ছে? তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন—তারা তো আমাদের আশপাশেরই মানুষ; তাদের সঙ্গে সহাবস্থান কতটা নিরাপদ?

যেদিন পানিতে ডুবে কুকুরটি মারা গিয়েছিল, সেদিন শুধু একটি কুকুর মারা যায়নি; সেদিন আমাদের ভেতরের মানুষটা আরও একটু মারা যায়নি? একের পর এক এমন ঘটনা আমাদের ভেতরে মানবিকতার ছিটেফোঁটাও আর রাখবে শেষ পর্যন্ত?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা এসব ঘটনার আলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা বাস্তব জীবনেও হয়। প্রাণীর প্রতি নৃশংসতার আলাপে আমাদের অনেকের আবার আছে অজুহাতের বক্তব্য—‘এটা তো শুধু একটা প্রাণী।’ কিংবা কারও দৃষ্টিতে এরা আবার ‘ইতর প্রাণী’। কিন্তু পৃথিবীতে ‘শুধু’ বলে কিছু নেই। যে পাখিটি আকাশে উড়ছে, যে কুকুরটি রাস্তায় ঘুমিয়ে আছে, যে বিড়ালটি খাবারের আশায় মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকে, যে গাছটি আমাদের নিশ্বাসের জন্য অক্সিজেন তৈরি করছে—প্রত্যেকেই এই পৃথিবীর একজন বাসিন্দা।

নরসিংদী শহরের নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়
ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

পৃথিবীতে একটা জমি কিনে রেজিস্ট্রেশন করে আমরা আকাশ-বাতাস সব কিনে নিই না; সবকিছুর ওপরে আমাদের শতভাগ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। এখানে প্রাণীদেরও অধিকার আছে। যে সৃষ্টিকর্তা আমাকে সৃষ্টি করেছেন, একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি তারাও।

প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা আসলে প্রাণীদের বিরুদ্ধে নয়; এটি দুর্বলের বিরুদ্ধে। ক্ষুধার জ্বালায় কুকুর চিৎকার করলে তার খাবারের ব্যবস্থা না করে আমরা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে ঝামেলা শেষ করি। কারণ, রাস্তার একটা ‘দুর্বল’ কুকুরই তো! অথচ এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সারা রাত লাউডস্পিকারে গান বাজালে আমাদের সহ্য করা ছাড়া উপায় থাকে না; কারণ, তিনি ক্ষমতাবান। আমাদের প্রতিবাদ করার সক্ষমতা নেই।

দুর্বলের ওপরে যখন আমরা হামলে পড়ি, তখন আমরা ভেবে দেখি না—আমরা সবাই কোনো না কোনো সময়ে কারও না কারও কাছে দুর্বল হয়ে যাই। আজ রাস্তার কুকুরটি আমার চেয়ে দুর্বল, তাই আমার দয়া হয় কি না, সেদিকে তাকিয়ে আছে সে। আগামীকাল হয়তো সে জায়গায় থাকবে একজন পথশিশু, একজন বৃদ্ধ বাবা, একজন অসুস্থ মা, একজন প্রতিবন্ধী মানুষ কিংবা একজন দরিদ্র ভিক্ষুক। আবার একদিন হয়তো আমি বা আপনিই কারও না কারও কাছে দুর্বল অবস্থায় থাকব। দুর্বল হলেই সবল কর্তৃক অত্যাচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকবে—এমন রীতির শিকার আমরাও হয়ে যাব। আমাদের সমাজে এটার প্রকাশ দেখি নিয়মিতভাবেই।

নিষ্ঠুরতা কখনো এক দিনে জন্মায় না। এটি শুরু হয় খুব ছোট একটি জায়গা থেকে, অনেক সময় নিজের অজান্তেই। যখন একটি শিশু দেখে, বড়রা একটি কুকুরকে লাথি মারছে, একটি বিড়ালকে পাথর ছুড়ে আঘাত করছে, একটি পাখির ডানা ভেঙে হাসছে, তখন সে শুধু একটি ঘটনা দেখে না; সে একটি শিক্ষা পায়, ‘যে দুর্বল, তাকে আঘাত করা যায়। এমনকি এটি আনন্দের, উপভোগের বিষয়।’

দুর্বল হওয়া কোনো অপরাধ নয়। অপরাধ হলো দুর্বলকে কষ্ট দিয়ে নিজের শক্তি প্রমাণ করা। আমরা অনেকেই জানি, দুর্বলকে নির্যাতন করে আমরা মূলত আমাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকেই প্রমাণ করি।

নিষ্ঠুরতা কখনো এক দিনে জন্মায় না। এটি শুরু হয় খুব ছোট একটি জায়গা থেকে, অনেক সময় নিজের অজান্তেই। যখন একটি শিশু দেখে, বড়রা একটি কুকুরকে লাথি মারছে, একটি বিড়ালকে পাথর ছুড়ে আঘাত করছে, একটি পাখির ডানা ভেঙে হাসছে, তখন সে শুধু একটি ঘটনা দেখে না; সে একটি শিক্ষা পায়, ‘যে দুর্বল, তাকে আঘাত করা যায়। এমনকি এটি আনন্দের, উপভোগের বিষয়।’

এ শিক্ষাই পরে স্কুলে তুলনামূলক শান্ত-ভদ্র ছাত্র বা মেয়েদের প্রতি বুলিং হয়ে ফিরে আসে। তারাই বড় হয়ে সংসারে পারিবারিক সহিংসতা সৃষ্টি করে। সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে ফিরে আসে। রাষ্ট্রে অন্যায় হয়ে ফিরে আসে। কারণ—

নিষ্ঠুরতার ভাষা একটাই—শুধু শিকারের মুখ বদলে যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও নেতিবাচক বিষয়গুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির এই যুগে অমানবিকতার চর্চা যত বাড়ছে, মানবিকতার চর্চা তত বাড়ছে না। কিন্তু দিন শেষে মানুষ পাশের মানুষকে মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবেই দেখতে চায়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এই বার্তাও দেয় আমাদের।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল একটি ভিডিও নিয়ে প্রথমে তথ্যগত ভ্রান্তি ছিল—শুরুতে মানুষ মনে করেছিল ভিডিওটা বাংলাদেশের, কিন্তু পরে জানা গেল এটি শ্রীলঙ্কার। গ্রামে জমির আল ধরে একটি বাচ্চা মেয়ে একটি বিড়াল কোলে নিয়ে মনের আনন্দে হেঁটে যাচ্ছে আর তার পেছনে হাঁটছে একটি শজারু।

দুটি প্রাণীর সঙ্গে একটি মানবশিশুর এই অসাধারণ সম্পর্ক দেখে ভীষণ আপ্লুত হলো দেশের নেটিজেনরা। বিশ্বাস করি, এই ভিডিও শ্রীলঙ্কার, শুরুতেই এটা জানা থাকলেও এটা মানুষকে একইভাবেই আপ্লুত করত। শুধু সেটাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পৃথিবীর নানা দেশে মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সখ্য, প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণের ভিডিও এই দেশের অসংখ্য মানুষ দেখে, শেয়ার করে।

এটি পরিবেশের বিষয়, চর্চার বিষয়। সেই পরিবেশ কীভাবে তৈরি করা যায়, কী কী চর্চা বাড়িয়ে দিতে হবে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দিন শেষে আমরা কেউই বিচ্ছিন্ন নই। বিচ্ছিন্ন থেকে যা ইচ্ছা তা–ই করার মাশুল কী হতে পারে, সেটা এর মধ্যেই ভালোভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। নিজেদের স্বার্থে হলেও এই পৃথিবীতে সবাইকে নিয়েই আমাদের থাকতে হবে; দেয়ার ইজ নো প্ল্যানেট বি।

  • ড. ফারজানা আলম শিক্ষক, প্রশিক্ষক, উদ্যোক্তা

    মতামত লেখকের নিজস্ব