চীন কেন ইরান, ভেনেজুয়েলার পাশে নেই

ভেনেজুয়েলা ও ইরান মডেল স্পষ্ট দেখাচ্ছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সরকারকে খোলামেলা আগ্রাসনের মাধ্যমে সরাতে চাইছে। এরপরও চীন কেন ভূরাজনৈতিক ‘বন্ধু’দের পাশে নেই, তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ

ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলব’ (পরম সমাধানের খোঁজে অভিযান) এর পর মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরান। এই উভয় দেশ থেকে চীন প্রচুর জ্বালানি তেল কেনে। ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সম্ভাব্য পুতুল সরকার বসিয়ে ট্রাম্প চীনকেও জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সংকটে ফেলতে চাইছেন। বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য চীনকে অর্থনৈতিকভাবে কাবু করা। এবার সেটা নতুন চেহারা নিচ্ছে—তার অর্থনৈতিক সহযোগীদের কাবু করে। ‘বন্ধু’রাষ্ট্রগুলোর বিপদের মুখে গণচীন এখন কী করবে? সি চিন পিং কি পারবেন ট্রাম্পকে থামাতে? কীভাবে সেটা? আদৌ কি চীন এ রকম ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক?

বেছে বেছে চীনের মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আগ্রাসন যে মূলত দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য, সেটা এখন প্রায় সবাই বলছেন। ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ও ভোক্তা চীন। ২০২৪–এর ডিসেম্বর নাগাদ চীনের দৈনিক জ্বালানি তেলের ক্ষুধা ছিল প্রায় ১৬ মিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্ব তেলের বাজারে চাহিদার উত্থান মূলত চীনের মাধ্যমে। ২০১৩ থেকে ২০২৩–এ বিশ্ব তেল বাজারের চাহিদা বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ কারণ ছিল চীন।

কিন্তু দেশটি জ্বালানির বিকল্প উপায় খুঁজে পেতে শুরু করায় অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়াতেও খনিজ তেল নির্ভরতা কমাচ্ছিল চীন। পণ্য তৈরির বদলে সেবা খাতের প্রসার ঘটায়ও জ্বালানি চাহিদায় রকমফের ঘটছে তাদের।

তবে এখনো চীন খনিজ তেলের প্রধান বিশ্বভোক্তা। নিজস্ব চাহিদার ৫০-৬০ শতাংশ খনিজ তেল তারা আমদানি করে। বাকিটা উত্তোলন করে। তেল মজুতে তারা বিশ্বে ১৪তম হয়েও ভোক্তা হিসেবে দ্বিতীয়। ফলে এই খাতে এখনো তারা বড় আমদানিকারক। ভেনেজুয়েলা থেকে চাহিদার কিছু পরিমাণ খনিজ তেল কিনত চীন।

কারাকাসে হামলা চালিয়ে নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : রয়টার্স

বেইজিংয়ের জন্য ভেনেজুয়েলা তেলের বড় উৎস না হলেও দরকারি উৎস। কিন্তু ভেনেজুয়েলার দিক থেকে চীন তেলের বড় ক্রেতা। চীন তাদের বড় এক আর্থিক ভরসাও ছিল। তেলের আগাম দাম হিসেবে চীন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে চীনের জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাতের পাশাপাশি ওই ঋণও আটকে গেল।

যদিও বিশ্বে খনিজ তেলের বড় এক ভান্ডার ভেনেজুয়েলা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধে তারা বেশি তেল উত্তোলন ও বিক্রি করতে পারত না। যে কারণে তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা চলছিল। চীন ঋণের বিনিময়ে তাদের তেল নিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় চীনের ১৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও রয়েছে। সেটাও এখন ঝুঁকিতে। ভেনেজুয়েলা থেকে আনা অপরিশোধিত তেলের বিশেষ খনিজ ধরনের কারণে চীনে অনেক বিশেষায়িত রিফাইনারি গড়ে উঠেছিল। সেগুলোও এখন কারিগরি ও আর্থিক সংকটে পড়ল।

ভেনেজুয়েলার মতো রাশিয়া ও ইরান থেকেও তেল নেয় চীন। ওই দুই দেশের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলছে। ভেনেজুয়েলার মতো ইরান যেসব দেশে তেল বেশি পরিমাণে রপ্তানি করে, সেই তালিকার প্রথমে আছে চীন। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার বড় এক কারণ চীনও। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমস্যা তৈরিও এসব দেশের বিরুদ্ধে অবরোধ ও যাবতীয় আগ্রাসনের একটা লক্ষ্য। তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি বন্ধুদেশগুলোকে দেওয়া ঋণ আটকে দেওয়া এবং বিশ্বের নানা দিকে চীনের বাণিজ্য ভিত্তিকে নতুন করে মুশকিলে ফেলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে পিছু হটতে হবে চীনকে?

বিগত দশকগুলোতে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব বাড়ানোর দুটি হাতিয়ার ছিল পণ্যবাণিজ্য ও ঋণবাণিজ্য। গত দুই দশকে চীন দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছিল। এখানকার অধিকাংশ দেশে তার বিপুল বিনিয়োগ আছে। গত বছরই দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সম্মেলন হলো চীনের রাজধানীতে। সেখানে সি চিন পিং নতুন করে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর সূত্রে ব্রাজিল, কিউবা, প্যারাগুয়ে, পেরু ও ভেনেজুয়েলায় চীনা নাগরিকের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। এই অঞ্চলে ২০০৫ সালে চীন থেকে যে পরিমাণ পণ্যবোঝাই কার্গো গিয়েছিল, ২০২৪ সালে সেটা পাঁচ গুণ বেড়েছে। একই সময় আমদানি বেড়েছে ছয় গুণ।

২০২৪–এ বেইজিং চিলি, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, নিকারাগুয়া ও পেরুর সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করেছে। এই অঞ্চলের অন্তত ২০টি দেশ চীনের ‘সিল্করুট উদ্যোগে’ যুক্ত। ২০০৫ থেকে এই দেশগুলোতে চীনের বিভিন্ন ব্যাংক ঋণ দিয়েছে অন্তত ১২০ বিলিয়ন ডলার। এসব দেখেই যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি আমূল বদলে ফেলেছে বলা যায়।

অতীতে নানা অজুহাতে দক্ষিণ আমেরিকাসহ সমগ্র বিশ্বে ওয়াশিংটন গোপন বা আধা গোপন প্রক্রিয়ায় স্বাধীনভাবে চলতে ইচ্ছুক সরকারগুলোকে উৎখাত করেছে। ভেনেজুয়েলা ও ইরান মডেল স্পষ্ট দেখাচ্ছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সরকারকে খোলামেলা আগ্রাসনের মাধ্যমে সরাতে চাইছে এখন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা ইতিমধ্যে জানাচ্ছে, পশ্চিম গোলার্ধে তারা চীনের কোনো উপস্থিতি দেখতে চায় না। অর্থাৎ পুরো অঞ্চল তাদের কাছে আত্মসমর্পিত থাকতে হবে। ২০২৫ সালে ঘোষিত তাদের ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র’ও সেই আলোকে তৈরি। অন্যদিকে ইসরায়েলকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যকেও তারা একইভাবে দেখতে চায়। এসব অঞ্চলের যেসব দেশের সরকারকে ‘আমেরিকার স্বার্থের বিরোধী’ মনে হবে, সেখানেই তারা সিআইএ ও ডেল্টা ফোর্সের মতো সংস্থাগুলোকে পাঠিয়ে দেবে মনে হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা একে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো ‘মনরো মতবাদ’–এর একালের নবায়িত রূপ। প্রায় দুই শতাব্দী আগের প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো দক্ষিণ আমেরিকাকে উপনিবেশতুল্য গণ্য করার এ রকম লক্ষ্যের কথা বলতেন। ট্রাম্পের হাত ধরে দেশটির সেই নয়া উপনিবেশবাদী বাসনা এবার পুরোদস্তুর নতুন এক বিশ্বব্যাবস্থার চেহারা নিচ্ছে।

সে রকম লক্ষ্যের অংশ হিসেবেই ভেনেজুয়েলার পর ইরানকে টার্গেট করা হলো। রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারের কারণে ইরানের শহরাঞ্চলে অনেক দিন ধরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে এবং ইসরায়েলের গত বছরের হামলায় ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। স্থানীয় মুদ্রার মান অনেক পড়ে গেছে। এসব নিয়ে সেখানে জন–অসন্তোষ তীব্র। রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ চলছে এ সপ্তাহে।

ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনের অভিযোগ করেছে ইরান।
ছবি: এএফপি

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেখানে ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহ’র বংশধরদের প্রবাস থেকে এনে ক্ষমতায় বসাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহে দেশটিতে এরই মধ্যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার মতোই ইরানের তেল সম্পদের দখল নিতে ইচ্ছুক। এর মানে দাঁড়াবে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল মজুত আছে এমন তিনটি দেশের দুটিকে নিয়ন্ত্রণে পাওয়া। অপর দেশ সৌদি আরবে ওয়াশিংটনের বহুকালের পুরোনো মিত্ররা শাসক হিসেবে রয়েছে। এখন ইরান অধ্যায়ে সফল হলে তেলের বাজার, দাম ও বিপণনকে যুক্তরাষ্ট্র সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

আরও পড়ুন

চীন এখন কী করবে

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, চীন এখন কী করবে? বিশ্ব দেখছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের গত জুনের হামলায় (অপারেশন মিডনাইট হ্যামার) চীন শক্তভাবে তেহরানের পাশে ছিল না। সিরিয়া-লিবিয়া-ভেনেজুয়েলায় মার্কিনদের গোপন ও প্রকাশ্য কোনো হস্তক্ষেপে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বেইজিং কার্যকর প্রতিরোধ গড়েনি বা গড়তে পারেনি বা চায়ওনি। রাশিয়ার ভূমিকাও তদ্রূপ। তাহলে ট্রাম্পের চলমান আগ্রাসী সামরিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলো কি চলতেই থাকবে? আগামী অনিরাপদ বিশ্বে ছোট দেশগুলোর তাহলে সুরক্ষা কী?

আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, চীন কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়ানো এড়িয়ে পুরো মনোযোগ দিতে চাইছে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দিকে। তারা মনে করছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনের বিশ্বকে অচিন্তনীয় মাত্রায় পাল্টে দেবে। এতদিনকার গড়া সামরিক ও আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী যেভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থায় রয়েছে, চীন মুখ্যত শান্তিপূর্ণ পথে প্রযুক্তিজ্ঞানের মাধ্যমে তার অবসান ঘটাতে চায়। তারা মনে করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের সামরিকভাবে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করে তুলবে শিগগির।

গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে চীনের এই অনুমানের সমর্থনে বাস্তব কিছু প্রমাণ মেলে। এই যুদ্ধে ফ্রান্স থেকে সংগৃহীত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের বিপরীতে চীন থেকে পাওয়া পাকিস্তানের স্যাটেলাইট জ্যামিং প্রযুক্তির সফল ব্যবহার পাশ্চাত্যকে চমকে দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় জল-স্থল-আকাশ মিলিয়ে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে অপহরণ করতে পারল, সেটা এখনো তার সামরিক ও গোয়েন্দা সামর্থ্যের বড় সাক্ষ্য। এভাবেই ডেল্টা ফোর্স ইরানের জেনারেল সোলাইমানি এবং আল-কায়েদার প্রধান লাদেনকে হত্যা করেছিল।

ওয়াশিংটনের সামরিক ও গোয়েন্দা যোগ্যতা একই সঙ্গে বিশ্বের অনেক স্থানে অনেক শক্তির বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকায় সক্রিয় থাকতে সক্ষম। তবে এসব অভিযান যতটা একটা দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে, ততটা বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করে না এবং চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান থামাতেও তা সরাসরি কোনো ভূমিকা রাখছে না। গত বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্কযুদ্ধও চীনকে বেশি কাবু করতে পারেনি।

ঠিক এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা এখন আরও খোলামেলাভাবে চীনের কৌশলগত জায়গাগুলো ক্ষতবিক্ষত করার নীতি নিয়েছে। কিন্তু চীনের বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র বিগত বছরগুলোতে যত দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানকার সংঘাত থেকে তার পক্ষে সফলতার ইমেজ নিয়ে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি সংঘাতে তাকে প্রতিনিয়ত নিজস্ব ‘এজেন্ট’দের সহায়তা দিয়ে যেতে হচ্ছে। এখন হয়তো ওই সব দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সে রকম ‘সহায়তা’র খরচ তুলবে তারা।

যুদ্ধ বা আগ্রাসন শুরু করা সহজ হলেও তা থেকে বেরিয়ে আসা যে দুরূহ হয়ে পড়তে পারে, তার নজির হিসেবে রাশিয়ার চার বছর পুরোনো ইউক্রেন অভিযানের কথাও বলা যায়। চীন হয়তো এসব অভিজ্ঞতার সারসংকলন হিসেবে সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে চরম রক্ষণশীল। কিন্তু চীনের নীতি স্বাধীনভাবে চলতে ইচ্ছুক ছোট দেশগুলোকে মার্কিন আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সমর্থ কি না, বা কোনো ব্যবহারিক ভরসা তৈরি করছে কি না?

সিরিয়া, ইরান, ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতায় এই প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। চীন বা এখনকার রাশিয়া এমন কোনো আদর্শিক অঙ্গীকারে নেই যে ‘বন্ধু’রাষ্ট্রগুলোকে আগ্রাসনের মুখে পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা দেবে। কড়া ভাষার ‘নিন্দা’ এবং বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের প্রকাশ্য অবস্থান। চীন বিশেষভাবে তার পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রের বাজার না হারানোর বিষয়েও সদা সতর্ক। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাজার সম্প্রসারণ এবং সম্পদ সংগ্রহের দ্বন্দ্ব যতটা বড় দেখায়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আদর্শে ফারাক তত ব্যাপক নয়। মাদুরোর অপহরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে বেইজিং নিশ্চিতভাবে আগামী এপ্রিলে ট্রাম্পের চীন সফর বন্ধ করতে চাইছে না।

আরও পড়ুন

ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলব’ নিশ্চিতভাবে অনেক দিনের গোপন পরিকল্পনার ফসল। কিন্তু প্রতিপক্ষের এসব পরিকল্পনার বিষয়ে চীন ওয়াকিবহাল ছিল কি না বা থাকলেও ভেনেজুয়েলাকে আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছিল কি না বা ভবিষ্যতে তাদের দিক থেকে ‘বন্ধু’দেশগুলো সে রকম কোনো সহযোগিতা পাবে কি না, সেসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ এমনও বলছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটাবে এই মনস্তত্ত্বও ওয়াশিংটনেরই তৈরি। এর মাধ্যমে তারা স্বদেশে নিজেদের আগ্রাসী নীতির একটা বৈধতা তৈরি করতে চায়।

এ রকম পরিস্থিতিতে, বিশ্ব যখন নব্য এক বর্বর ভবিষ্যতে প্রবেশ করছে, তখন ক্ষুদ্র দেশগুলোর মানুষদের সামনে সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে করণীয় কী? দেশে দেশে এ রকম দেশগুলোর নাগরিকদের নতুন এক গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী এবং অপর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিভিত্তিক বৈশ্বিক জোটবদ্ধতা ছাড়া ট্রাম্পের মতো আগ্রাসী শক্তিকে রুখে দেওয়া কঠিন। কিন্তু আপাতত সে রকম সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্বসংহতি নেই। এটা সেই অবস্থা, যা ধ্বনিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদী মুসোলিনির কারাগারে গ্রামসির কথায়: ‘পুরোনোর মৃত্যু ঘটছে, কিন্তু নতুনের জন্ম হতে পারছে না, সময়টা দানবের।’

সর্বত্র আজ ‘দানব’ নিজে অভিযোগকারী, বিচারক এবং পুলিশ। এটা প্রকৃতই এক অনিশ্চিত যুগসন্ধিক্ষণ। গ্রিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ইন্টাররেগনাম’। ৩৫ বছর আগে বিশ্ব থেকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাড়াতে আমেরিকার প্রচার আন্দোলনে কে কোথায় কীভাবে জ্বালানি জুগিয়েছিল তার কার্যকারণ-উৎসাহদাতাদের নিয়ে তত্ত্বতালাশেরও সময় এটা।

  • আলতাফ পারভেজ ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব