আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাবুলে এ ড্রোন হামলা তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন কোনো ড্রোন হামলা চালাতে গেলেও অসুবিধার মুখে পড়বে। তবে এটা ভাবা ঠিক হবে না, এই হামলা আঞ্চলিক স্থিতাবস্থার ক্ষেত্রে বড় বাঁকবদল ঘটাবে। একটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর নেতার মৃত্যুর পর সেই সংগঠন কতটা টিকবে, তা তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। সংগঠন পরিচালনা পদ্ধতি, টেকসই মতাদর্শ ও জনসমর্থন। তিন ক্ষেত্রেই আল–কায়েদা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

প্রথমত, সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি রয়েছে আল-কায়েদার। আল– জাওয়াহিরি তাঁর পূর্বসূরিদের মতো চৌকস নেতা ছিলেন না। কিন্তু লাদেনের মৃত্যুর পর তিনি একটি বিস্তৃত এবং স্বনির্ভর আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। সংগঠনে খুব স্পষ্ট একটা নেতৃত্ব-শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনের ভাগ্য একক কোনো নেতার ওপর যেন নির্ভরশীল না থাকে, সেটা নিশ্চিত করেছেন তিনি। আল–জাওয়াহিরির আমলে আল-কায়েদা এমন একটি সাংগঠনিক মডেল বেছে নিয়েছে, যেটিকে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ বলাটাই সবচেয়ে ভালো হবে। তাঁর নেতৃত্ব আল-কায়েদা মালি থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত একই ধরনের মডেলে বিস্তার লাভ করেছে। আল-কায়েদার যেকোনো শাখা অনেক বেশি স্বশাসিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এসব শাখা তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে ও কাজ করতে সক্ষম। সে কারণে একজন নেতার মৃত্যুতে আল-কায়েদার নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে, সেটা ভাবা ঠিক হবে না।

আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো গুহায় লুকানো অবস্থায় আল-জাওয়াহিরিকে খুঁজে পায়নি আমেরিকা। কাবুলের শহরতলির একটি জায়গায় তাঁকে পাওয়ার পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তালেবান অথবা আল-কায়েদার মধ্যে কেউ কি তাঁর অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে কিংবা তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে সহযোগিতা করেছে?

দ্বিতীয়ত, আল-কায়েদা একটি সহিংস মতাদর্শের প্রতি অনুগত। এই মতাদর্শ ব্যাখ্যা ও প্রচারের জন্য নেতার প্রয়োজন পড়ে না। আল-কায়েদা যেসব ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত, সেগুলোর অস্তিত্ব আল-কায়েদা সৃষ্টি হওয়ার অনেক আগে থেকেই ছিল। আল-কায়েদা কোনো দিন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও বিচ্ছিন্নভাবে এর অস্তিত্ব থেকে যাবে। আল-জাওয়াহিরি মতান্ধ নন। তিনি জানতেন, সংগঠনের বিস্তার ও দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য তাঁর মতো একজনের প্রয়োজন নেই। নেতা কে হলেন, তার চেয়ে আল-কায়েদার মতাদর্শই মানুষকে কাছে টানবে।

তৃতীয়ত, জাওয়াহিরির আমলে আল-কায়েদা যে যে এলাকায় বিস্তার লাভ করেছে, সেখানকার মানুষের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমর্থন পেয়েছে। জাওয়াহিরি অনেক বেশি বাস্তববাদী সংগঠক ছিলেন। আইএসের মতো বিরোধী মতাদর্শের লোকদের দমনের পথ বেছে নেননি। আল-কায়েদানিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্থানীয় অধিবাসী এবং স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার তিনি করেননি। বরং তাদের সঙ্গে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছিলেন। আল-কায়েদা এটিকে সংগঠন বিস্তৃতির কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে। সিরিয়ায় তারা হায়াত তাহরির আল-সামকে নিজেদের পক্ষভুক্ত করে। আফ্রিকার সাব-সাহারায় জাওয়াহিরির অনুসারীরা তাঁদের অবস্থান পোক্ত করতে, স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট করেছেন এবং গোত্র নেতা, যাযাবর ও কৃষকদের সমর্থন আদায় করে নিয়েছেন। জাওয়াহিরির হত্যার পর এ জনসমর্থন প্রত্যাহার হবে, এমনটা ভাবা ঠিক হবে না।

আল-জাওয়াহিরির আমলে আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা নয়, বরং সংগঠনটি ভেঙে সৃষ্টি হওয়া আইএসআইএলের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। আইএসআইএল শুধু আল-কায়েদার সদস্যদের তাদের দলে টানেনি, সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাওয়াহিরির আমলাতান্ত্রিক ও বিকেন্দ্রীকরণ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা হাজির করেছে। আইএসআইএলের উত্থান আল-কায়েদার অস্তিত্বের ওপর যে চ্যালেঞ্জ চাপিয়ে দিয়েছিল, তা তারা উতরে গেছে। জাওয়াহিরির মৃত্যুতে আল-কায়েদা বড় ধরনের অস্তিত্বসংকটে পড়বে না।

আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো গুহায় লুকানো অবস্থায় আল-জাওয়াহিরিকে খুঁজে পায়নি আমেরিকা। কাবুলের শহরতলির একটি জায়গায় তাঁকে পাওয়ার পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তালেবান অথবা আল-কায়েদার মধ্যে কেউ কি তাঁর অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে কিংবা তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে সহযোগিতা করেছে?

২০২০ সালের দোহা চুক্তি অনুযায়ী আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। শর্ত ছিল, তালেবান তাদের ভূমি ব্যবহার করে আল-কায়েদা কিংবা আইএসআইএলকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে দেবে না। এ বিবেচনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন কাবুলে জাওয়াহিরিকে ‘আমন্ত্রণ জানানো ও আশ্রয় দেওয়ার’ অভিযোগ তুলে তালেবানকে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য দোষারোপ করেছে। অন্যদিকে ড্রোন হামলাকে চুক্তির লঙ্ঘন বলে অভিযোগ তুলেছে তালেবান। ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদ থেকে ওসামা বিন লাদেনকে আটক ও হত্যার পর পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও এ ধরনের দোষারোপ ও পাল্টা দোষারোপ চলেছিল।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার মতো একটি পথ খুঁজে বের করেছিল। জাওয়াহিরির হত্যাকাণ্ডের পর তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একই ধরনের ঘটনা ঘটবে বলে আমরা আশা করি। কেননা যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান দুই পক্ষেরই একটি সাধারণ শত্রু রয়েছে। সেটা হলো ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান প্রভিন্স (আইএসআইএস–কে), আইএসআইএলের আফগান সংস্করণ। এখন চীন ও রাশিয়াকে ঠেকাতে বাইডেন প্রশাসনকে পুরোপুরি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। সে কারণে আইএসআইএল-কে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের তালেবানকে প্রয়োজন। অন্তত আফগানিস্তানে শান্তি রক্ষার জন্য তা করা দরকার।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: মনোজ দে

ইব্রাহিম আল-মারাশি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন