‘ইনশাআল্লাহ’ থেকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’: আল-সাইদের এই উত্থান কীভাবে?

মিশিগানে মুসলিম-আমেরিকান সিনেটর হিসেবে আবদুল আল-সাইদের বিজয় ডেমোক্র্যাট দলের ভেতর ক্ষমতা-ভরকেন্দ্রে বড় ধরনের অদলবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন চিকিৎসক আবদুল আল–সাইদ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তাঁর এই জয় অনেক মুসলিম আমেরিকানের কাছে আনন্দ ও আশার কারণ হয়ে উঠেছে।

মিশিগানের মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে আবদুল আল–সাইদ পরিচিত মুখ। ২০১৮ সালে গভর্নর পদে নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় মসজিদে জুমার খুতবা—বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচনী প্রচারের সময়ও তিনি শুধু মুসলিমদের নয়, মিশিগানের সব মানুষের পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। প্রচারের চাপ বাড়লেও মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আন্তরিকতা বজায় ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম রাজনীতিকদের প্রায়ই এমনভাবে দেখা হয়, যেন নির্বাচনের আগে মসজিদে যাওয়া কিংবা সালাম দেওয়া তাঁদের সমর্থন পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এল-সায়েদ মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরের কেউ নন; তিনি নিজেই এই সম্প্রদায়ের অংশ। এ কারণেই তাঁর প্রার্থিতা মুসলিম ভোটারদের মধ্যে আলাদা উৎসাহ তৈরি করেছিল।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতি বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের সমর্থনের প্রতিবাদে অনেক মুসলিম ভোটার ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের সেই ক্ষোভ এখনো কাটেনি। তবে এবার তাঁরা এমন একজন প্রার্থীকে পেয়েছেন, যিনি শুরু থেকেই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সহিংসতার বিরোধিতা করেছেন। একই সঙ্গে মিশিগানের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনের মতো বিষয়েও কথা বলেছেন।

ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের সমালোচনা করায় আবদুল আল–সাইদ ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী মহলের বিরোধিতার মুখে পড়েন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার তাঁর নাম নিয়ে বিদ্রূপ করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং কিছু ভোটার তাঁর মুসলিম পরিচয়কে সন্দেহের কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। এমনকি যেসব সংগঠনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই, সেগুলোর সঙ্গেও তাঁকে জড়িয়ে অভিযোগ তোলা হয়।

কিন্তু এসব আক্রমণের জবাবে আবদুল আল–সাইদ নিজের পরিচয় আড়াল করেননি। তাঁর নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কথা বলেছেন।

আবদুল আল-সাইদ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনে গণহত্যার বিরোধিতা করায় তাঁকে সমালোচনা করা হলে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, শিশুদের বোমার ভয় ছাড়া বেঁচে থাকার অধিকার চাওয়া কীভাবে ঘৃণার প্রকাশ হতে পারে? সরকারি পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য একজন মুসলিমকে নিজের সম্প্রদায় কিংবা ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান ত্যাগ করতে হবে—এমন ধারণাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

জয়ের পর দেওয়া ভাষণে আল–সাইদ নিজের পুরো নাম—আবদুর রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ—উচ্চারণ করেন। প্রচারের সময় জয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রায়ই ‘ইনশা আল্লাহ’ বলতেন। বিজয়ী হওয়ার পর তিনি বলেন, এবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার সময় এসেছে। এই মুহূর্তটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তাঁর মুসলিম পরিচয়কে নির্বাচনে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের পরিচয় নিয়েই জয়ী হয়েছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারে বিপুল অর্থও ব্যয় করা হয়েছিল। আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সুপার পিএসি মিশিগানের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে প্রায় তিন কোটি ডলার খরচ করে। উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিরোধিতা করা আল–সাইদকে পরাজিত করা। কিন্তু তিনি জয়ী হয়েছেন। এতে প্রমাণ হয়েছে, আইপ্যাকের মতো প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠীর অর্থব্যয়ই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে না।

আরও পড়ুন

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির জয়ের পর অনেকে মনে করেছিলেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে সরব কোনো মুসলিম প্রার্থী শুধু উদারপন্থী বড় শহরেই জয়ী হতে পারেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জেতা কোনো অঙ্গরাজ্যে তাঁর পক্ষে জয় পাওয়া কঠিন। কিন্তু আল–সাইদ ছোট শহর, গ্রাম, শিল্পাঞ্চল ও শহরতলি ঘুরে প্রচার চালিয়েছেন। গির্জা ও মসজিদ—দুই জায়গাতেই গেছেন। শেষ পর্যন্ত পুরো অঙ্গরাজ্যেই জয় পেয়েছেন।

মিশিগান দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম আমেরিকানদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ডিয়ারবর্নের আরব রেস্তোরাঁ ও কফিশপ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর হ্যামট্রামিক—এ অঞ্চলে কয়েক প্রজন্ম ধরে মুসলিমরা মসজিদ, স্কুল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। একই সঙ্গে তাঁদের সন্দেহ ও বৈষম্যের মুখেও পড়তে হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় আরও কয়েকজন মুসলিম প্রার্থীও ইতিহাস গড়েছেন। দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের, আবের কাওয়াস ও নাবিলা সৈয়দসহ অনেকে কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে নীরব থাকাকে রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার শর্ত হিসেবে মেনে নেননি।

আরও পড়ুন

তবে আবদুল আল–সাইদের জয় নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবাই একমত ছিলেন না। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে প্রচারে অংশ নেওয়ায় কেউ কেউ তাঁর সমালোচনা করেছেন। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় সহায়তা এবং বিভিন্ন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বেসামরিক মানুষের ওপর ড্রোন হামলার মতো বিষয় তাঁদের ক্ষোভের কারণ। অনেকেই আবদুল আল–সাইদকে ভোট দিয়েছেন তাঁর আন্তরিকতার ওপর আস্থা রেখে। কারণ, তিনি বারবার স্পষ্ট করেছেন যে তাঁর প্রচারে সমর্থন দেওয়া সবার নীতির সঙ্গে তিনি একমত নন।

একজন সিনেটর একা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি কিংবা দেশের ভেতরের বৈষম্যমূলক কাঠামো বদলে দিতে পারবেন না। মুসলিম প্রতিনিধিত্বকেই মুক্তির একমাত্র পথ মনে করলে তা অর্থহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে আবদুল আল–সাইদের প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, তিনি যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও ন্যায্য মজুরির দাবিকে যুক্ত করেছেন। তিনি এমন মায়ের কথা বলেছেন, যিনি সন্তানের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ব্যবস্থা করতে লড়ছেন। বলেছেন শ্রমিকের ইউনিয়ন গঠনের সংগ্রামের কথাও। তাঁর বক্তব্য ছিল, অন্য দেশের শিশুদের হত্যা করতে যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের জীবনেও পড়ে।

আবদুল আল–সাইদের জয় রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে ন্যায়সংগত করে তুলবে না। ফিলিস্তিনের কোনো শিশুকেও ফিরিয়ে আনবে না। ডেমোক্র্যাটদের কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের দায়ও এতে মুছে যাবে না। সিনেটর হিসেবে তাঁর কাজের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

তবে তাঁর জয় একটি প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। সেটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সফল হতে হলে মুসলিম আমেরিকানদের নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় আড়াল করতে হবে। বছরের পর বছর তাঁদের বলা হয়েছে, সফল হতে চাইলে নিজেদের নাম, বক্তব্য ও দাবিদাওয়া বদলাতে হবে। কিন্তু মিশিগানের নির্বাচনের ফল দেখিয়েছে, মুসলিম পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।

আবদুল আল–সাইদ নিজের অঙ্গরাজ্যের মানুষের সেবা করতে মুসলিম পরিচয় কমিয়ে আনেননি। নিজেদের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ চাইতে অন্য মুসলিমদেরও নিজেদের পরিচয় নিয়ে সংকোচ করার প্রয়োজন নেই।

  • বিলাল ইরফান বায়োএথিসিস্ট। তিনি হার্ভার্ডের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেনস হাসপাতাল ও ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে গবেষণা করেছেন

    আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।