দ্বিতীয় মেয়াদে এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে এমন এক নতুন ভাষা দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে জবরদস্তি, ভয় দেখানো আর চাপ প্রয়োগই হয়ে উঠেছে মূল হাতিয়ার। শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং নানা অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করে তিনি প্রতিপক্ষ তো বটেই, মিত্রদেশগুলোকেও একধরনের কোণঠাসা করার কৌশল নিয়েছেন। দিন যত যাচ্ছে, এই গ্যাংস্টারসুলভ নীতির ক্ষতিকর দিক ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হোয়াইট হাউসে ফেরার পর খুব দ্রুতই ট্রাম্প বুঝিয়ে দেন, তাঁর কাছে শুল্ক কোনো সাধারণ বাণিজ্যনীতি নয়, বরং তা এক ধরনের অস্ত্র। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তিনি তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের ঘোষণা দেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের আমদানির ওপর দেশভেদে উচ্চ হারে কর বসানো হয়। প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোই লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে এই হারগুলো অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে খুব একটা খাপ খায়নি; বরং লক্ষ্য ছিল অন্য। সেটি হলো, যে দেশ নিজেদের বাণিজ্যবাধা কমাবে, তাদের জন্য শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছাড় আদায় করা হবে।
কিন্তু বাস্তবে এই পদক্ষেপ চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এতে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক—দুপক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার ওপর ট্রাম্পের অনিয়মিত সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কখনো শুল্ক ঘোষণা, কখনো তা স্থগিত, আবার হঠাৎ বাড়ানো—সবকিছুই হয়েছে খুব কম সময়ের নোটিশে এবং স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই।
এরই মধ্যে বিচারব্যবস্থাও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়েছেন। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারায় প্রায় সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসানোর উদ্যোগও বাতিল করে দেন।
অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ে থেমে থাকেনি। তারা আপিল করেছে এবং অন্য পথে শুল্ক চালু রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য বাণিজ্য’ অভিযোগ এনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্ট যখন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শাসনের এই প্রবণতা নিয়ে ক্রমেই সন্দিহান, তখন ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ব্যাপক শুল্কব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তারপরও ট্রাম্প শুল্ককে এক ধরনের ‘প্রোটেকশন র্যাকেট’-এ পরিণত করতে পেরেছেন। বাণিজ্য আলোচনাকে ব্যবহার করে তিনি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সৌদি আরব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগে বাধ্য করেছেন।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলো এই শুল্ক কূটনীতির প্রকৃতি স্পষ্ট করে। এই দুই দেশের গাড়ি রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়—যা তাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত। পরে জাপানের ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়, আবার জাপান যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি কৃষিপণ্য, বিশেষ করে চাল আমদানি করতে রাজি হওয়া এবং সেমিকন্ডাক্টর, ওষুধশিল্প ও জাহাজ নির্মাণের মতো খাতে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তা কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামানো হয়।
একজন অভিজ্ঞ গডফাদারের মতো ট্রাম্প এক দেশকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার কৌশল নেন। জাপানের সঙ্গে চুক্তিকে সামনে রেখে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে রাজি হয় এবং বিনিময়ে শুল্ক কমে ১৫ শতাংশে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাছাতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার পার্লামেন্ট অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই বিনিয়োগ তহবিল গঠনের আইন পাস করে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার অভিযোগ তোলেন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি এবং শুল্ক আবার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করে দেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার অনীহা অস্বাভাবিক নয়। কারণ চুক্তি অনুযায়ী, তাদের বিনিয়োগের অর্থ কোথায় খরচ হবে, তা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করবে। বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লাটনিকের নেতৃত্বে একটি কমিটি প্রকল্প বাছাই করবে এবং ট্রাম্পের অনুমোদনের জন্য তা পেশ করবে।
এই বিনিয়োগগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকেও খুব যুক্তিযুক্ত নয়। প্রকৃত অর্থে লাভজনক হলে বেসরকারি সংস্থাগুলো নিজেরাই বিনিয়োগ করত। অথচ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেসব খাতে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খরচ বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক বেশি, সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণশিল্প তার বড় উদাহরণ, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়।
অবশ্য লাভজনকতা শুধু উৎপাদন দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। করনীতি, ভর্তুকি এবং সরকারি নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন বিদেশি পুঁজি রাজনৈতিকভাবে পছন্দের সংস্থাগুলোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন মুক্তবাজার ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সীমারেখা প্রায় মুছে যায়।
চাপ প্রয়োগ এখানেই থেমে থাকছে না। মূলধন ও সুদ পরিশোধের পরও অবশিষ্ট লাভের ৯০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র পাবে—যদিও প্রাথমিক বিনিয়োগে তাদের কোনো অবদান নেই। এর পাশাপাশি আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়—এই চুক্তিগুলো কার্যকর হবে কীভাবে, কতটা সরকারি অর্থ বেসরকারি খাতে ঢালা হবে এবং প্রকল্পগুলো আদৌ কোনো সুসংগঠিত ব্যয়সুবিধা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যাবে কি না।
সবদিক বিচার করলে, এগুলো বিনিয়োগ চুক্তির মতো নয়; বরং খাজনা আদায়ের মতো। এমনকি এটিকে দুর্নীতির কাছাকাছি বললেও অত্যুক্তি হয় না। গুরুতর অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াই কোরিয়া বা অন্য কোনো দেশের পক্ষে এত বড় অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, সেটাও একটি বড় প্রশ্ন।
এখানেই একধরনের তীব্র বিদ্রূপ লুকিয়ে আছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাবেন। কিন্তু যদি এই বিপুল বিনিয়োগ বাস্তবে আসে, তবে তা ডলারের মান আরও বাড়াবে, আমদানি বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ঘাটতিই আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা কমানোর কথা বলা হয়েছিল।
এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে নীতিগত বার্তা। যুক্তরাষ্ট্র আর মুক্তবাজার নীতিতে অটল নেই—এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে ব্যবসায়ী ও বিদেশি সরকারের মধ্যে; বরং শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে দুর্বল দেশগুলোর কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের প্রবণতা বাড়ছে। যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে বাজার প্রতিযোগিতার জায়গায় রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বসে যায়, তখন তার বিকৃতি গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়া অবধারিত।
অ্যান ও. ক্রুগার বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রথম উপব্যবস্থাপনা পরিচালক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ