রমজান কোরআনমাফিক জীবন গড়ার শ্রেষ্ঠ সময়

রমজান মাস কোরআন অনুশীলনের সর্বোত্তম সময়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে আল কোরআন, মানুষের জন্য হিদায়াত রূপে এবং পথনির্দেশনার প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্য নিরূপণকারী হিসেবে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫) ‘নিশ্চয় আমি কদরের রাতে কোরআন নাজিল করেছি।’ (সুরা-৯৭ কদর, আয়াত: ১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোরআনওয়ালাই আল্লাহওয়ালা এবং আল্লাহর খাস পরিবারভুক্ত।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১২২৯২) ‘যে অন্তরে কোরআন নেই, তা যেন পরিত্যক্ত বিরান বাড়ি।’ (তিরমিজি: ২৯১৩) ‘হাশরে বিচারের দিনে কোরআন তোমার পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষী হবে।’ (মুসলিম: ২২৩)

তিনটি জিনিস দেখলেই সওয়াব হয়, তা হলো কোরআন করিম, কাবা শরিফ ও পিতা–মাতার চেহারা মোবারক। নবীজি (সা.) বলেন, ‘কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত সর্বোত্তম ইবাদত।’ (বায়হাকি)

কিয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র পথনির্দেশ কোরআন মাজিদ। কোরআন পাঠ ব্যতিরেকে প্রধান ইবাদত নামাজও আদায় হয় না। তাই সহিহভাবে কোরআন তিলাওয়াত শেখা ফরজে আইন।

‘কোরআন’ অর্থ পড়া, পাঠ করা, পাঠযোগ্য, যা বারবার পাঠ করা হয়। কোরআন অর্থ কাছে যাওয়া, নিকটবর্তী হওয়া; কোরআন পঠন ও অনুশীলনের
মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করে। (লিসানুল আরব)। কোরআন আল্লাহর কালাম, আল্লাহর খাস সিফাত বা বিশেষ গুণ; কোরআন সৃষ্ট নয়। লিপি, পাঠ ও ভাব—এই তিনের সমন্বিত নাম কোরআন। (শারহুল আকায়িদ)

কোরআন করিম না বুঝে পড়লেও সওয়াব রয়েছে; কিন্তু বুঝে পড়লে অনেক বেশি নেকি হয়। ‘কোরআন তিলাওয়াতে প্রতি হরফে কমপক্ষে ১০টি করে নেকি হয়, প্রতিটি নেকি আল্লাহ ১০ গুণ করে দেন।’

কোরআন মাজিদ শিক্ষা করা ফরজ; অশুদ্ধ বা ভুল পাঠ করা পাপ। যাঁরা পড়তে জানেন না তাঁদের শিখতে হবে, যাঁরা শিখে ভুলে গেছেন, তাঁদের আবার পড়তে হবে; যাঁরা ভুল পড়েন, তাঁদের সহিহ–শুদ্ধ করতে হবে। রোজ হাশরে ‘রাসুল (সা.) বলবেন, হে আমার রব! এই লোকেরা কোরআন পরিত্যাগ করেছিল।’ (সুরা-২৫ ফুরকান, আয়াত: ৩০

প্রিয় নবীজি (সা.)–কে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছিল কোরআন করিম অধ্যয়ন, অনুশীলন ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়েই। হজরত ইব্রাহিম (আ.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব! আপনি তাদের মধ্য থেকে এমন রাসুল পাঠান, যিনি আপনার আয়াত পাঠ করে শোনাবেন, কিতাব ও হিকমত শেখাবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন। নিশ্চয়ই আপনি স্নেহশীল ও পরম কৌশলী।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১২৯)

কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত করা এবং তিলাওয়াত শোনা ও শোনানো ইবাদত। রাসুলে আকরাম (সা.) নিজে পাঠ করে সাহাবিদের শোনাতেন ও সাহাবিদের কাছ থেকেও তিলাওয়াত শুনতেন। প্রতি রমজান মাসে এর আগে যতটুকু কোরআন নাজিল হয়েছে, তা নবীজি (সা.) হজরত জিবরাইল (আ.)–কে শোনাতেন এবং হজরত জিবরাইল (আ.) ও তা নবীজিকে শোনাতেন। নবীজির (সা.)–এর জীবনের শেষ রমজানে উভয়ে উভয়কে দু–দুবার করে পূর্ণ কোরআন পাঠ করে শোনান। (তাফসিরে ইবনে কাসির)

কোরআন করিম না বুঝে পড়লেও সওয়াব রয়েছে; কিন্তু বুঝে পড়লে অনেক বেশি নেকি হয়। ‘কোরআন তিলাওয়াতে প্রতি হরফে কমপক্ষে ১০টি করে নেকি হয়, প্রতিটি নেকি আল্লাহ ১০ গুণ করে দেন।’ (তিরমিজি: ২৯১০) রমজানে প্রতিটি আমলের প্রতিদান ৭০ থেকে ৭০০ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। রমজানে বেশি বেশি কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত করা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ ও রমজানের খাস সুন্নত আমল। সাহাবায়ে কিরাম কোরআন বুঝতেন এবং বেশি বেশি তিলাওয়াতও করতেন।

কোরআন করিম আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম। ‘দয়াময় রহমান আল্লাহ কোরআন শেখাবেন বলে মানুষ সৃষ্টি করলেন।’ (সুরা-৫৫ রহমান, আয়াত: ১-৩) ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে (কোরআন) সম্মিলিতভাবে সুদৃঢ়রূপে ধারণ করো আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩)

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

    সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

    [email protected]