২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুল পুনর্দখল করার পর পাকিস্তান ছিল আফগানিস্তানের ইসলামি আমিরাতের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকদের একটি। দুই দশকের যুদ্ধের পর আশরাফ গনির নেতৃত্বাধীন প্রজাতন্ত্রের পতনকে আফগানিস্তানে নিজের কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিল ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের মূল্যায়ন ছিল, কাবুলে একটি মিত্র সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব হ্রাস পাবে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে পাকিস্তান তখন একটি বাস্তববাদী অবস্থান নেয়। যখন অধিকাংশ দেশ আফগানিস্তান থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছিল, ইসলামাবাদ তখন কাবুলে দূতাবাস খোলা রাখে, বিশৃঙ্খল ন্যাটো প্রত্যাহারের সময় লোকজনকে দেশ ছাড়তে সহায়তা করে এবং আফগানিস্তানে মানবিক উদ্যোগে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা চালায়।
তবে চার বছর পর দেখা যাচ্ছে, সেই প্রাথমিক সমর্থন থেকে পাকিস্তান প্রত্যাশিত কোনো কৌশলগত সুবিধা পায়নি। বরং তালেবান সরকারের অক্ষমতা কিংবা অনিচ্ছার কারণে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি ভুগছে আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে।
২০২১ সালের আগেও পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ মূল্য দিয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে ৮০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, বেসামরিক নাগরিক ও শিশুরাও রয়েছে। ২০১৪ সালে আর্মি পাবলিক স্কুলে হামলায় ১৩২ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনা পাকিস্তানের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। অবকাঠামো ধ্বংস, বিনিয়োগ হ্রাস ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে পাকিস্তানের ক্ষতির পরিমাণ ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে ধারণা করা হয়।
তালেবান কাবুলে ফেরার পর ইসলামাবাদ আশা করেছিল সহিংসতা কমবে। বাস্তবে ঘটেছে বিপরীত। সীমান্তপারের হামলার নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে, যার মূল চালিকা শক্তি তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিগারসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানের প্রশমন নীতি ও আদর্শিক সহানুভূতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আফগানিস্তানে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে সেখানে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টিটিপি যোদ্ধা রয়েছে। পাশাপাশি আল–কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট খোরাসান শাখার উপস্থিতিও অব্যাহত রয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় আফগান নাগরিকদের সম্পৃক্ততা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তান প্রায় ৭৫ হাজার গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে ২ হাজার ৫৯৭ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ২২০ জন আফগান নাগরিক। পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণা, বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ জঙ্গি হামলায় আফগান নাগরিক জড়িত।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি সত্ত্বেও পাকিস্তান প্রথমে সংঘাত এড়িয়ে সতর্ক সম্পৃক্ততার নীতি অনুসরণ করে। ইসলামাবাদ তালেবান সরকারের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে যেতে চায়নি। এ জন্য দ্বিপক্ষীয় সংলাপ, ধর্মীয় মধ্যস্থতা ও আঞ্চলিক কূটনীতিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি কর্মকর্তারা নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় চ্যানেলে উদ্বেগ জানিয়ে আসেন। একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামেও কাবুলকে দোহা চুক্তির অঙ্গীকার রক্ষার আহ্বান জানানো হয়। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে টিটিপি যোদ্ধাদের সীমান্ত অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি সমঝোতার মধ্যস্থতা করেছিল।
২০২২ সালে মুফতি তকি উসমানির নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী উলেমা প্রতিনিধিদলকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান আফগান তালেবান ও টিটিপিকে হামলা বন্ধে রাজি করানোর চেষ্টা চালায়। কিছু প্রতিশ্রুতি মিললেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ হয়নি।
২০২২ সালে মুফতি তকি উসমানির নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী উলেমা প্রতিনিধিদলকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান আফগান তালেবান ও টিটিপিকে হামলা বন্ধে রাজি করানোর চেষ্টা চালায়। কিছু প্রতিশ্রুতি মিললেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ হয়নি। পাকিস্তানের অভিযোগ, তালেবান সরকার টিটিপির বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং সীমান্ত এলাকা থেকেও তাদের সরায়নি। ফলে কেবল সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আশা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পরিসরে তালেবানের ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা ইসলামাবাদের হতাশা বাড়িয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে কেবল রাশিয়া, তবে তালেবান সরকার এখন বিশ্বের ৩৯টি রাজধানীতে কার্যকর উপস্থিতি বজায় রাখছে। উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, অর্থনৈতিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে কাবুল তার কূটনৈতিক পরিসর বিস্তৃত করছে।
পাকিস্তানের দৃষ্টিতে, এই আন্তর্জাতিক স্বাভাবিকীকরণ তালেবানকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে, যাতে তারা ইসলামাবাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করতে পারে। আফগান ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চললেও কার্যকর জবাবদিহির মুখোমুখি না হয়ে তালেবান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে বলে পাকিস্তান মনে করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তালেবান ও ভারতের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার বিষয়টি। ভারত কাবুলে আবার কূটনৈতিক উপস্থিতি স্থাপন করেছে, মানবিক সহায়তা বাড়িয়েছে এবং তালেবান নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে।
ইসলামাবাদে এসব উন্নয়নকে নতুন কৌশলগত ঘেরাও হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিম সীমান্তে চলমান নিরাপত্তা সংকট এবং সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান আবার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে বলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা মহলে আশঙ্কা বাড়ছে।
এ বাস্তবতায় পাকিস্তান তার আফগান নীতি পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছে। উদ্ভূত নতুন পদ্ধতিকে ইসলামাবাদে দুই মাত্রার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার ভিত্তি সংলাপ ও প্রতিরোধ। সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও কেবল কূটনীতির ওপর নির্ভর করেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না বলে পাকিস্তান এখন মনে করছে।
এই প্রতিরোধ নীতির অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় টিটিপির ঘাঁটি, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও কমান্ডকাঠামো লক্ষ্য করা হয়। অক্টোবরে টিটিপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি অভিযান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি।
একই সঙ্গে কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। সরাসরি ও পরোক্ষ উভয় চ্যানেলেই সংলাপ অব্যাহত রয়েছে। তুরস্ক ও কাতারের মতো দেশগুলো এ সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের আফগান নীতি এখন একটি জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সামরিক চাপ ও মধ্যস্থতামূলক সম্পৃক্ততার এই সমন্বয় তালেবানের আচরণে আদৌ কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারবে কি না। একই সঙ্গে ইসলামাবাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই কৌশলের ভারসাম্য রক্ষা করা, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল না হয়ে ওঠে।
খুররম আব্বাস পাকিস্তানভিত্তিক নিরাপত্তা থিঙ্কট্যাংক ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইসলামাবাদের পরিচালক
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত