এদিকে আমাদের দেশে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে ফিলিমন বাস্কে ফোনে জানিয়েছেন, গত ২৩ জুলাই তাঁরা ঢোল-মাদল-বাদ্য বাজিয়ে, নেচে, গেয়ে আনন্দমিছিল করেছেন শহরে। এই গরমেও গাইবান্ধা শহরের রাস্তায় হাসিখুশি নারী-পুরুষেরা মিলে বের করেছেন বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক র‍্যালি। কারণ কী? তাঁদের সাঁওতাল জাতির একজন দ্রৌপদী মুর্মু ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। কত দূরে ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলা। তারপর উপারবেদা গ্রাম। ভৌগোলিক দূরত্ব শত শত মাইল হলেও জাতিগত ও সংস্কৃতিগত টান যেন অন্য রকম। তাই গোবিন্দগঞ্জের জয়পুর গ্রামের সাঁওতাল নারী প্রিসিলা মুর্মু, সুচিত্রা মুর্মু, সুফল হেমব্রম আর আন্দ্রিয়াস মুর্মুরা এই আনন্দে তাৎক্ষণিক গান বেঁধেছেন, সুর দিয়েছেন, গেয়েছেন। সাঁওতালি ভাষার গানের অর্থ এ রকম—ভারত এত বড় দেশ, কত দল, কত শত মানুষ, তুমি হয়েছ মাননীয় রাষ্ট্রপতি, দ্রৌপদী মুর্মু, আজ সাঁওতাল জাতি খুশি, আমাদের জয় হয়েছে। আন্তরিকভাবে মুখে মুখে তাৎক্ষণিক বানানো গান।

সাঁওতালরা ঐতিহাসিকভাবে বীরের জাতি। ইতিহাসের নানা পথপরিক্রমায় সাঁওতাল সমাজ আজ নিঃস্ব, রিক্ত। পৃথিবীর অন্যতম গণতন্ত্রের দেশে যেখানে ১৩০ কোটি মানুষ বাস করে, সেই দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন একজন সাঁওতাল নারী, এই ঘটনা অন্তত বেশ কিছুদিন ওদের সব দুঃখ–কষ্ট ভুলে যেতে সাহায্য করলে খুশি হব।

দ্রৌপদী মুর্মুর জন্য বাংলাদেশের আদিবাসীদের উচ্ছ্বাস–আনন্দ দেখে আমি অনেক ভেবেছি, কেন এমন হয়! সব মানুষের মনের খবর তো আমি জানি না। জয়পুর গ্রামের সাঁওতাল নারী প্রিসিলা মুর্মু, সুচিত্রা মুর্মুরা হয়তো জাতিগত ও সাংস্কৃতিক কারণে, অথবা হৃদয়ের অজান্তে পরস্পরের জীবনসংগ্রামে, বঞ্চনায়, আনন্দ–উৎসবে মিল খুঁজে পেয়েছেন। এটুকুই তাঁরা মনের টানে বাঁধতে চান। ‘যেন দুঃখ–সুখের বুকের মাঝে একই যন্ত্রণা’ ওদের মনে। দ্রৌপদী মুর্মুর কারণে নিশ্চয় এখানে এই সাঁওতালদের জমির অধিকার ফিরে আসবে না। ওদের নতুন কোনো উন্নত জীবনের আশাও আমি দেখি না। হয়তো কোনো দিন এখানে দ্রৌপদী মুর্মুর আসাও হবে না। দেখা হবে না কোনো দিন দুই দেশের পাশাপাশি বাসিন্দাদের। তবু হয়তো অজান্তেই তাঁদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে গেছে এত উঁচু সম্মানীয় পদে আসীন একজন সাঁওতাল নারী, যাঁর কাছে তাঁদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। কেবল শুভকামনা, অভিবাদন জানানো আর নির্মল হাসি–আনন্দ। এই দুঃখের মাঝেও গর্ব করার চেষ্টা।

এই ঢাকা শহরেও জনজাতির মানুষেরা তাৎক্ষণিক সমবেত হয়েছিলেন ২২ জুলাই সংসদ ভবনের সামনে। সাঁওতালরা এসে যোগ দিয়েছেন। গান গেয়েছেন। এনোস হাসদা, প্রভাত টুডু, নিকোলাশ বাস্কে, বিষুরাম মুর্মুরা এসেছেন। কয়েকজন সাঁওতাল নারী নেচেছেন, গান গেয়েছেন। এনোস হাসদা ও বিশুরাম মুর্মু সাঁওতাল ভাষায় দ্রৌপদী মুর্মুকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আর অনুরোধ করেছেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেন তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে কোনো দিন এমন দিন আসবে।

দ্রৌপদী মুর্মু নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করেছেন, ‘ভারত রচনা করে ইতিহাস, ইন্ডিয়া স্ক্রিপ্টস হিস্টরি।’ তারপর অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, ‘আজ আমাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার এক কন্যা, যিনি ট্রাইবাল সমাজের।’ আমাদের দেশে ভারতের নতুন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে নিয়ে খুব বেশি খবর প্রচারিত হয়নি। আমি দেখলাম, কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা রিপোর্ট করেছে। প্রথম আলো ২৩ জুলাই বেশ বড় রিপোর্ট করেছে ‘দ্রৌপদীকে ভোট দেন বিরোধীরাও’ এই শিরোনামে। আমরা দেখলাম, বিরোধী দলের ১৭ জন এমপি এবং ১২৫ জন এমএলএ বা বিধায়কের ভোট তিনি পেয়েছেন। সম্মিলিত বিরোধী প্রার্থী যশবন্ত সিনহা, রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকেই দ্রৌপদীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

সাঁওতালরা ঐতিহাসিকভাবে বীরের জাতি। ইতিহাসের নানা পথপরিক্রমায় সাঁওতাল সমাজ আজ নিঃস্ব, রিক্ত। পৃথিবীর অন্যতম গণতন্ত্রের দেশে যেখানে ১৩০ কোটি মানুষ বাস করে, সেই দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন একজন সাঁওতাল নারী, এই ঘটনা অন্তত বেশ কিছুদিন ওদের সব দুঃখ–কষ্ট ভুলে যেতে সাহায্য করলে খুশি হব। প্রিসিলা মুর্মু, সুচিত্রা মুর্মু, সুফল হেমব্রম আর আন্দ্রিয়াস মুর্মুদের জন্য শুভকামনা।

  • সঞ্জীব দ্রং কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন