প্রায় দেড় বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের নাটকীয় ঘটনাবলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মঞ্চস্থ হয়ে গেল গত দুই সপ্তাহে। রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বের প্রতি কয়েক মাসের বিষোদ্গার ও হুমকির ভাড়াটে সেনাদল ভাগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন সত্যি সত্যিই বিদ্রোহ করলেন। প্রিগোশিনের বাহিনী প্রথমে রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর রোস্তভ-অন-দনে প্রবেশ করে। এরপর মস্কো অভিমুখে এগোতে থাকে এবং রাশিয়ার বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে।
অবশেষে রাজধানীর মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে প্রিগোশিন তাঁর বাহিনীকে থামাতে এবং বেলারুশে নির্বাসনে যেতে রাজি হন। এর ফলাফল কী হতে পারে, সেটা এখন পর্যন্ত অনেক বেশি অজানা।
ভাগনার সেনাদের বিদ্রোহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আশপাশে অবস্থান নিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম রমজান কাদিরভের বাহিনী। সংকটকালে ক্রেমলিন চেচনিয়ার এই যুদ্ধবাজকে ডেকেছিল। ভাগনার বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জ জানাতে কাদিরভের সেনাদের রোস্তভ ও মস্কো দুই শহরেই দেখা গেছে। ভবিষ্যতে কোনো বিদ্রোহ হলে ক্রেমলিনের প্রতিরক্ষার জন্য কাদিরভের সেনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন, কিন্তু সে ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন রয়েছে।
রাশিয়ার রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তাপ্রধানদের মধ্যে অনেকেই পুতিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে লাভবান হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে রমজান কাদিরভ সম্ভবত সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। ২০০৪ সালে বাবা আখমাদ কাদিরভের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসেন। দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধে রাশিয়া বিদ্রোহীদের কাছ থেকে প্রদেশটি পুনরায় জয় করে নেয়। এরপর চেচনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে রমজান কাদিরভের সঙ্গে চুক্তি করে মস্কো।
চেচেন বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও কাদিরভ এখনো তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হবে কি না, এই ভয়ে ভীত থাকেন। মস্কো ও রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর দিক থেকে তাঁকে অবজ্ঞা করা হয় কি না, সেই শঙ্কায় শঙ্কিত থাকেন তিনি। ইউক্রেনে চেচনিয়ার বিদ্রোহীদের যখন পুনর্জন্ম হচ্ছে, তখন কাদিরভের পক্ষে তাঁর অনুগত বাহিনীকে ঝুঁকির মুখে ফেলা সম্ভব নয়।
তরুণ কাদিরভের প্রতি রাশিয়ার সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিপুল অবজ্ঞা ছিল। তা সত্ত্বেও চেচনিয়ায় প্রায় স্বায়ত্তশাসন চালিয়ে যেতে কাদিরভকে পুরো মাত্রায় পৃষ্ঠপোষকতা করেন পুতিন। কাদিরভের ওপর একমাত্র দায়িত্ব ছিল আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন গুঁড়িয়ে দেওয়া।
পুরস্কার হিসেবে কাদিরভের নেতৃত্বে পরিচালিত চেচেন সরকারকে বিপুল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দেওয়া হয়। চেচেন সরকারের বাজেটের ১০ ভাগের ৯ ভাগ অংশের জোগান দিয়েছে মস্কো। পুরস্কার ও প্রণোদনা—দুই অর্থেই এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।
কাদিরভ ও তাঁর অনুগতরা গ্রজনিতে অতুলনীয় স্বায়ত্তশাসন ভোগ করলেও সব সময়ই তাঁর শক্তিশালী শত্রুর অভাব ছিল না। শুরু থেকেই ভাগনার গ্রুপ কাদিরভের অন্যতম শত্রু হয়ে উঠেছিল।
ভাগনার গ্রুপের পেশাদার সৈনিকদের অনেকেই ছিলেন চেচেন যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনা। তাঁরা একসময় চেচনিয়ার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। একপর্যায়ে জাতিগতভাবে চেচেনদের ভাগনার গ্রুপে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতিতে কাদিরভ ও প্রিগোশিনের মধ্যে একটা মিল দেখতে পাওয়া গেছে। দুজনেই রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে কুৎসা রটান এবং রাশিয়ার শীর্ষ জেনারেলদের আক্রমণাত্মক ভাষায় সমালোচনা করেন। দুজনেই মনে করেন, রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্ব অপদার্থ, শুধু তাঁদের ভাড়াটে বাহিনী একমাত্র সক্রিয়।
কিন্তু এটি অনেকটাই ‘সুবিধার বিয়ের’ মতো ব্যাপার। এর প্রমাণ হলো, গত ১ জুন ভাগনারের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার দিমিত্রি উটকিন প্রকাশ্যে কাদিরভের শীর্ষ কমান্ডারকে সরাসরি দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
বিদ্রোহে কাদিরভের ভূমিকা
প্রিগোশিনের বিদ্রোহকে চ্যালেঞ্জ জানাতে কাদিরভ সময়ক্ষেপণ করেননি। পুতিন তাঁকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে এসেছেন এটা শুধু সেই কারণে নয়, ভাগনারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।
এই হিসাব থেকেই ভাগনার বিদ্রোহে কাদিরভ যথার্থভাবেই তাঁর সেনাদের মোতায়েন করেছিলেন। সাঁজোয়া যানসহ এক কলাম সেনা রোস্তভে আর এক কলাম সেনাকে মস্কো প্রবেশের রাস্তায় নিয়োগ করা হয়েছিল। মস্কোর প্রবেশপথে রাশিয়ার সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বিশ্বস্ত বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল। রোস্তভে কাদিরভের চেচেন যোদ্ধারা ভাগনার বাহিনীর একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছিলেন, তাতে উত্তেজনাকর অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কাদিরভের বাহিনী সংঘাতে জড়ায়নি। তারা প্রিগোশিনের সেনাদের দিকে গুলি ছোড়েনি। আর ক্রেমলিন ও ভাগনারের মধ্যে আচমকা চুক্তি হওয়ার পর মস্কোয়তে পৌঁছান কাদিরভের সেনারা। বিদ্রোহের পর খুব দ্রুত নিজের সেনাদের নিয়োগ করার মধ্য দিয়ে পুতিনের প্রতি কাদিরভ তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু সংঘাতে না জড়িয়ে শুধু বাগ্যুদ্ধ করেছেন এবং প্রিগোশিনকে জোরগলায় বেইমান বলেছেন।
প্রিগোশিনের বিদ্রোহে কাদিরভ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, এ ঘটনার সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে তাঁর ভূমিকার বিষয়টির মিল রয়েছে। ইউক্রেন আগ্রাসনে পুতিনের প্রতি তিনি আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের লোকদের কোনো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেননি। যুদ্ধের প্রথম দিকে কাদিরভের বাহিনী কিয়েভ, সেভেরোদোনেস্ক ও মারিউপোলে ঝোড়ো আক্রমণে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু শিগগিরই গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে কাদিরভ নিজের বাহিনীকে সরিয়ে নেন। গত গ্রীষ্মের পর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে খুব কম লড়াইয়ে দেখা গেছে তাদের।
চেচেন বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও কাদিরভ এখনো তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হবে কি না, এই ভয়ে ভীত থাকেন। মস্কো ও রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর দিক থেকে তাঁকে অবজ্ঞা করা হয় কি না, সেই শঙ্কায় শঙ্কিত থাকেন তিনি। ইউক্রেনে চেচনিয়ার বিদ্রোহীদের যখন পুনর্জন্ম হচ্ছে, তখন কাদিরভের পক্ষে তাঁর অনুগত বাহিনীকে ঝুঁকির মুখে ফেলা সম্ভব নয়। কাদিরভের টিকে থাকায় পুতিনের অবদান যতই থাকুক না কেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করার জন্য নিজের বাহিনীকে নামমাত্র নিয়োগ করা ছাড়া চেচেন নেতার পক্ষে অন্য কিছু চিন্তা করা কঠিন।
রমজান কাদিরভ নিজেকে ‘পুতিনের অনুগত সৈন্য’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন, কিন্তু নিজের বাহিনীকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে তিনি রাজি হবেন না।
নেইল হাওয়ার জর্জিয়ার সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত