সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণ

সম্ভাব্য নতুন সেনাপ্রধানকে ঘিরে এবারের বাড়তি আগ্রহের কারণ বর্তমান ‘চিফ’ কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে ইমরান খানের বিরোধ। ইমরান মনে করেন, তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনীর মদদ ছিল। বাজওয়া দুই মেয়াদে ছয় বছর চাকরি করে ২৯ নভেম্বর অবসরে যাচ্ছেন। বছরের মাঝামাঝি অনুমান ছিল তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়বে। ৬১ বছর বয়সী বাজওয়ার হাতে এখনো সেনাপ্রধানের পদে থাকার জন্য তিন বছর সময় আছে। কিন্তু তিনি ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, এ পদে আর থাকতে চান না। তাঁর এই না চাওয়া ইমরানের সঙ্গে তিক্ততার জের।

অথচ রাজনীতিতে ইমরানের উত্থান জেনারেল ‘বাজওয়ার আমলেই’। শরিফদের মুসলিম লিগ এবং ভুট্টোদের পিপিপি বরাবর অভিযোগ করেছে, তাদের কোণঠাসা করতে গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ইমরানকে সহায়তা করেছে রাজনীতিতে এবং ২০১৮ সালের ভোটেও।

পাকিস্তানে অনেকে সেটা বিশ্বাসও করেন। ২০১৯ সালের আগস্টে বাজওয়ার চাকরি দ্বিতীয় মেয়াদে তিন বছর বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান সেই বিশ্বাসকে আরও পোক্ত করেন। বাজওয়ার মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে সৃষ্ট বিতর্ক তখন আদালতে গড়ায়। কিন্তু ইমরান ‘প্রতিদান’ দিতে মরিয়া ছিলেন। ফলে বিবাদের সুরাহা হয়েছে নতুন আইন করে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে এলেও তাঁর সঙ্গে সামরিক আমলাতন্ত্রের রেষারেষি শেষ হবে না। বিশ্বের নবম বৃহৎ সেনাবাহিনীর পছন্দ-অপছন্দ একজন রাজনীতিবিদের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ যে বাহিনী দেশের স্বার্থে রাজনীতিতে যুক্ত থাকা জরুরি মনে করে। কিন্তু ইমরান কি বাস্তবতা মেনে তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে রাজি হবেন? নতুন সেনাপ্রধান কি পরিস্থিতি শান্ত করতে পারবেন? আপাতত এ দুই প্রশ্ন পাকিস্তানকে বিদ্যুৎ গতিতে টেনে নিচ্ছে ২৯ নভেম্বরের দিকে।

তবে ইমরান ও বাজওয়ার ‘মধুচন্দ্রিমা’ বেশি দিন টেকেনি। ক্ষমতার তৃতীয় বছরেই বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে ইমরানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিরোধ বাধে। এ সময় নাটকীয়ভাবে বিরোধী আন্দোলনও বেগবান হয়ে ওঠে এবং পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে ভুট্টো ও শরিফ বংশের কাছে হারে পিটিআই। কিন্তু আহত বাঘের মতো ইমরান হাল ছাড়তে নারাজ ছিলেন এবং তাঁর পতনের জন্য সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করে ক্রমাগত মানুষকে সংঘবদ্ধ করেছেন। ইমরানের দল এই অর্থে সফল—সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখন এটা বিশ্বাস করে, তাদের প্রিয় সেনাবাহিনী ইমরানের পতনে ইন্ধন দিয়েছে।

ঠিক এ সময়ই বাজওয়ার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আবার সামনের বছরই পাকিস্তানে ভোট হবে। ফলে বন্যা, খাদ্যাভাব কিংবা অর্থনৈতিক দুরবস্থার চেয়েও নতুন সেনাপ্রধান পাকিস্তানের রাজনীতির জন্য এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। এই ‘গুরুত্ব’ যতটা প্রতিরক্ষার কারণে, তার চেয়ে অধিক রাজনৈতিক কারণে। দেশটির প্রায় সব প্রধান দল মনে করে ক্ষমতায় যেতে চিফ অব আর্মি স্টাফের সহানুভূতি লাগবে।

মানুষও এটা বিশ্বাস করতে শিখেছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়। কিন্তু এ রকম ভাবমূর্তি যে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর জন্য আত্মঘাতী, সেটা স্পষ্ট হলো এবার। পাকিস্তানিরা তাদের ক্রিকেট টিমের মতো সেনাবাহিনীকে নয়নের মণি মনে করত। কিন্তু হঠাৎ তারা এখন জেনারেলদের রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত ও হতাশ। রাস্তায় কান পাতলেই সেটি বোঝা যায়।

পরিস্থিতি প্রেসিডেন্টের সালিস দাবি করছে

এ মুহূর্তে সেনাপ্রধান পদের সম্ভাব্য পাঁচ দাবিদারের মধ্যে জেনারেল আসিফ মুনির, সাহির শামশাদ ও ফয়েজ হামিদ এগিয়ে থাকলেও গুজব আছে তাঁদের মধ্যে প্রথম জন ‘শরিফ’দের প্রতি এবং শেষের দুজন পিটিআইয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল। ক্ষমতায় থাকার সময় ইমরানের দলের প্রত্যাশা ছিল, জেনারেল ফয়েজ হবেন পরবর্তী ‘চিফ’। ইমরানের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে তিনি ডিজি আইএসআই ছিলেন। মুসলিম লিগ ও পিপিপির যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে চৌকস এই জেনারেলের প্রতি।

অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠদের ঘিরে পছন্দের এ রকম ভিন্নতা থাকায় অনিবার্যভাবে নজর যাচ্ছে তালিকার চতুর্থ ও পঞ্চমজনের দিকে। চতুর্থজন জেনারেল নুমান মেহমুদকে মনে করা হয় পিপিপিবান্ধব। ফলে পেশাগত বিবেচনায় খানিক পিছিয়ে থেকেও নাম আসছে পরের জন জেনারেল আজহার আব্বাসের। আসিফ মুনির ছাড়া বাকি চারজন একই ব্যাচের। এই পাঁচজনের পরে ষষ্ঠ পছন্দ হিসেবে আছেন জেনারেল আমির।

পাকিস্তানে এ মুহূর্তের বিস্ময়ের দিক হলো, ওপরের তালিকার যিনিই পরবর্তী ‘চিফ’ হবেন, তাঁর জন্য প্রতিরক্ষার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দেশটির চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে ভূমিকা রাখা। অন্তত সাধারণ মানুষ তা-ই মনে করছে। নতুন সেনাপ্রধানের নাম ঘোষণা হওয়ামাত্র নতুন করে রাজনৈতিক-সামরিক সমীকরণ শুরু হয়ে যাবে দেশজুড়ে। আরেক দফা সেনা অভ্যুত্থানের সমীকরণও এখন মাঠে আছে। ইমরান খান, ক্ষমতাসীন শরিফ-ভুট্টো জোট এবং সেনাবাহিনীর মধে৵ ত্রিমুখী যে বিদ্বেষমূলক পরিস্থিতি চলছে, তার সমাধান হিসেবেই কেউ কেউ ওই রকম শঙ্কা করছেন।

কিন্তু দেশটির অর্থনীতি খুব বিপন্ন। জনতার সঙ্গে সেনাবাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনও খুব বেশি। এ অবস্থা আরেক দফা জরুরি অবস্থার জন্য উপযোগী নয়। ঠিক এ কারণেই পরস্পরের দিকে প্রত্যহ বিদ্বেষ বর্ষণের মধে৵ সব পক্ষ গোপনে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভিকে কাজে লাগাচ্ছে একটা আপসের জন্য।

ঠিক এ কারণে হঠাৎ পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট পদটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ মাসে। তাঁর দরবারে সালিসের বিষয় নির্দিষ্ট হয়েছে দুটি—১. নতুন নির্বাচনের তারিখ; ২. নতুন সেনাপ্রধান বাছাই।

ইমরান খান, শরিফ বংশ ও ভুট্টো বংশ সবাই এখন প্রেসিডেন্টকে সামনে রেখে দর-কষাকষিতে আছে। অবশ্যই ২৯ নভেম্বরের কয়েক দিন আগে সবাইকে একটি সমঝোতায় আসতে হবে। ‘ডিপ স্টেট’ও এই সালিসের সফলতা চাইছে। তারা ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো নৈতিকভাবে কোণঠাসা বোধ করছে।

সেনাবাহিনী বনাম ইমরান দ্বন্দ্ব শিগগিরই থামছে না

কেবল সশস্ত্র বাহিনী নয়, রাজনীতিবিদেরাও পাকিস্তানে জটিল এক দুঃসময়ে আছেন এখন। মুসলিম লিগ ও পিপিপি পার্লামেন্টে গরিষ্ঠতার জোরে ‘ক্ষমতা’ পেলেও তাদের জনপ্রিয়তা ইমরানকে মোকাবিলার মতো নয়।

আবার জনতার একটি বড় অংশ ইমরানকে পছন্দ করলেও সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁকে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইছে না। যুক্তরাষ্ট্রকেও যথেষ্ট খেপিয়েছেন ইমরান। কিন্তু সমাজের যে মনোভাব, তাতে ভোট হলে তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জেতার সম্ভাবনা বেশি।

যে কারণে শরিফ ও ভুট্টোরা এখনই নির্বাচনের বিরুদ্ধে। ইমরান অভিজ্ঞ ক্রিকেট ক্যাপ্টেনের মতো সব প্রতিপক্ষকে চাপে রাখছেন মাঠের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। গুলিবিদ্ধ হয়েও তিনি অপেক্ষা করতে ইচ্ছুক নন; বরং দ্রুত নির্বাচন চাইছেন।

কিন্তু সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গত কয়েক মাস তিনি সত্য-মিথ্যার মিশেলে যেভাবে বিষোদ্‌গার করেছেন, তাতে তাঁকে ভবিষ্যতে কিছু না কিছু রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে এলেও তাঁর সঙ্গে সামরিক আমলাতন্ত্রের রেষারেষি শেষ হবে না। বিশ্বের নবম বৃহৎ সেনাবাহিনীর পছন্দ-অপছন্দ একজন রাজনীতিবিদের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ যে বাহিনী দেশের স্বার্থে রাজনীতিতে যুক্ত থাকা জরুরি মনে করে। কিন্তু ইমরান কি বাস্তবতা মেনে তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে রাজি হবেন? নতুন সেনাপ্রধান কি পরিস্থিতি শান্ত করতে পারবেন? আপাতত এ দুই প্রশ্ন পাকিস্তানকে বিদ্যুৎ গতিতে টেনে নিচ্ছে ২৯ নভেম্বরের দিকে।

আলতাফ পারভেজ ইতিহাস বিষয়ে গবেষক