বাগেরহাটে আসন কমানো কতটা যৌক্তিক

বাগেরহাটে আসন কমানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটি। বাগেরহাট শহরে দশানীর মোড় এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

বাগেরহাট আয়তনের দিক থেকে মোটামুটি একটি বড় জেলা। ১৯৮৪ সালে জেলা সৃষ্টির পর থেকেই এখানে সংসদীয় আসন চারটি।

আমরা অনেকেই জানি, তারপরও বলছি—ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও চিতলমারী, এই তিন উপজেলা নিয়ে বাগেরহাট-১ আসন। সদর ও কচুয়া নিয়ে বাগেরহাট-২। আর রামপাল ও মোংলা নিয়ে বাগেরহাট-৩ এবং শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ নিয়ে বাগেরহাট-৪ আসন।

সম্প্রতি বাগেরহাট জেলার সংসদীয় আসন কমানোর আলোচনা উঠেছে। গত ৩০ জুলাই নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ কারিগরি কমিটি’ বাগেরহাট জেলার চারটি আসন কমিয়ে তিনটি করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই কমিটি গঠিত হয়েছে ‘বিশেষজ্ঞ’দের নিয়ে। নির্বাচন কমিশনের সিস্টেম ম্যানেজার রফিকুল হককে আহ্বায়ক করে গঠিত সাত সদস্যের কমিটিতে আছেন মোস্তাফিজুর রহমান (ভূগোলবিদ), কে এইচ রাজিমুল করিম (মানচিত্রকর), মোশিউর রহমান রিমু (তথ্যপ্রযুক্তিবিদ), ড. ফারহানা আহমেদ (নগর–পরিকল্পনাবিদ), হিফজুর রহমান (পরিসংখ্যানবিদ) ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (নির্বাচনসহায়তা-১)।

ইতিমধ্যে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ–সংক্রান্ত শুনানি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ২৩ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের এই শুনানিতে দেশের ৩৩ জেলার ৮৪টি আসন ঘিরে ওঠা আপত্তি ও সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করা হয়। ইসির তথ্যমতে, এবার মোট ১ হাজার ৮৯৩টি আপত্তি ও সুপারিশ জমা পড়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ১৮৫টি আপত্তি ও ৭০৮টি সুপারিশ।

নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত আসন সীমানায় জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। এতে আসন সীমানা পুর্নির্ধারণ আইন ২০২১–এর ৬ ধারাকে উল্লেখ করা হয়।

ইসির প্রস্তাবে জেলার চারটি আসনের মধ্যে বাগেরহাট-১ আগের মতো বহাল রাখা হয়েছে। বাগেরহাট সদর, কচুয়া ও রামপাল নিয়ে বাগেরহাট-২ আসন এবং মোংলা, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা নিয়ে বাগেরহাট-৩ আসনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কারিগরি কমিটি বলছে, জনসংখ্যার আনুপাতিক হিসাব ধরে আসন কমানো নাকি যুক্তিযুক্ত হবে।

এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনে এ বিষয়ে শুনানি হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিনিধিরা শুনানিতে অংশ নিয়ে জোরালোভাবে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁদের কথা—কোনোভাবেই বাগেরহাট জেলার আসন কমানো যাবে না। এরই মধ্যে জেলাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সব রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন মিলে গঠন করেছে সম্মিলিত কমিটি। তারা অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচিও পালন করেছে। কর্মসূচি থেকে এই সিদ্ধান্ত বাগেরহাটের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনলাইন-অফলাইনে চলছে নানামুখী আলোচনা।

রাজনীতিবিদেরা অবশ্যই আসন কমানোর পক্ষে নন, এটা বোঝাই যায়। কারণ, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সব দল এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নানা হিসাবনিকাশ ও ‘ইকুয়েশন’ আছে। সেখানে যদি ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে তা মেনে নেওয়ার মতো নয়। এটি অনেকটা ‘সাজানো বাগানে মই দেওয়া’র মতো।

অবশ্য রাজনীতির হিসাবের বাইরেও এ রকম বড় ইস্যু নিয়ে রাজনীতিবিদদের বক্তব্য থাকা উচিত এবং সেটি তাঁরা দিচ্ছেন। এটা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত।

২.

একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে এবং বাগেরহাট জেলা যেহেতু আমার জন্মস্থান, সেই দাবিতে কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। কেবল জেলার আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা কম বলে আসন কমাতে হবে, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। যদি আয়তনের সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাত বিবেচনা করা হয়, তবে বাগেরহাটের আয়তনের একটি বড় অংশ হচ্ছে সুন্দরবন। সেখানে কোনো জনমানুষ বাস করে না। ফলে সেই আয়তনের সঙ্গে অনুপাত হিসাব করলে জনসংখ্যা কমই হবে।

বাগেরহাটের ভৌগোলিক অবস্থান দুর্যোগপ্রবণ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন—এ রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবছরই এই জেলা এবং এর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী ক্ষতির শিকার হয়। অপর দিকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের বড় অংশটি এই বাগেরহাট জেলার মধ্যে পড়েছে।

জেলায় রয়েছে হজরত খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার, ‘খাঞ্জেলী দীঘি’, ষাট গম্বুজ মসজিদ, সিংগাইর মসজিদ, ৯ গম্বুজ মসজিদ, জিন্দাপীর মসজিদ ও অযোধ্যা মঠ। এর সবই পুরাকীর্তি। বাগেরহাট একটি পুরাকীর্তিসমৃদ্ধ জেলা।

বাগেরহাটে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা। সক্ষমতায় যে বন্দরটির এত দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি চলে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু হয়নি। বাংলাদেশে যত মিঠাপানির চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি হয়, এর বড় অংশ আসে বাগেরহাট থেকে।

প্রকৃতপক্ষে বাগেরহাট শুধু একটি জেলা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ এবং অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। অথচ এই জেলার উন্নয়নে যতটা বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল, তার ছিটেফোঁটাও হয়নি। এখন যদি সংসদীয় আসনই কমে যায়, তাহলে বাগেরহাট জাতীয় রাজনীতিতে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে।

আসন কমানোর জন্য জনসংখ্যা একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। বাগেরহাটের মতো ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত, দুর্গম ও অবহেলিত জেলায় মানুষের সমস্যা বেশি; সেগুলো সমাধানে বেশি প্রতিনিধিত্ব দরকার। একটি আসনের মধ্যে যখন অতি দূরের ইউনিয়নগুলো পড়ে, তখন সবার সমস্যা সংসদে তুলে ধরা সম্ভব হয় না।

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, গত ১৫ বছরে এই জেলা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা জাতীয় সংসদে শুনিনি। পুরো জেলার সড়ক যোগাযোগ নাজুক। মোংলা পোর্টে যাওয়ার রাস্তাটিতে বড় বড় গর্ত। গ্রামীণ সড়কগুলোর খুবই বাজে অবস্থা। উচ্চশিক্ষায় এই জেলার মানুষ এগিয়ে নেই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পরেই তরুণদের একটি অংশ প্রবাসে চলে যাচ্ছে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ায়। এটিকে ভালো প্রবণতা বলতে পারছি না। কারণ, তরুণেরা উচ্চশিক্ষা না নিলে এখানকার ভবিষ্যৎ নিয়ে কারা ভাববেন?

৩.

আমার মতে, কেবল মোংলা নিয়ে একটি সংসদীয় আসন হওয়া দরকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পাঞ্চল; বিশেষ করে খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, এমনকি পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলা এখন মোংলা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, নেপাল ও ভুটানও ট্রানজিট–সুবিধার জন্য এই বন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহী। কিন্তু পশুর নদের নাব্যতা সংকট, পলিমাটি জমে যাওয়া এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি মোংলা বন্দরের বড় সমস্যা।

এখন এর সঙ্গে রয়েছে রামপাল উপজেলা। ধান, সবজি, মাছ চাষ রামপালের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল শক্তি। এখানে রয়েছে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতের এনটিপিসি ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত। সুন্দরবনের কাছে হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

এখন কেবল জনসংখ্যা কম হওয়ায় রামপালকে বের করে বাগেরহাট সদর ও কচুয়ার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক হয় না। রামপালের সঙ্গে কচুয়ার কোনো মিল নেই। একটি উপজেলা থেকে আরেকটি উপজেলার দূরত্বও অনেক। একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে তিন উপজেলা সামাল দেওয়া আপাতদৃষ্টে সহজ হবে না।

এরপর আসা যাক শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ সম্পর্কে। এটি বাগেরহাট-৪ আসন। দুটিই নদীঘেঁষা উপজেলা। কৃষি ও মৎস্য চাষ এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সুন্দরবনের প্রভাবে প্রাকৃতিক ঝুঁকি—ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উভয় উপজেলায় বিদ্যমান।

শরণখোলা সুন্দরবনসংলগ্ন। যোগাযোগসুবিধা মোরেলগঞ্জে বেশি, শরণখোলায় তুলনামূলক সীমিত। ভাষার দিক থেকে বাগেরহাটের অন্যান্য উপজেলা থেকে এই অঞ্চল ভিন্ন। এখানকার অধিবাসীরা পিরোজপুর-বরিশালঘেঁষা। এ দুটি উপজেলা যেন ‘বাগেরহাটের বরিশাল’। মোংলা এর সঙ্গে যুক্ত কীভাবে হয় বুঝি না!

বাগেরহাটের আসন কমানোর চিন্তা কেবল একটি জেলার প্রতি নয়; বরং দেশের ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত স্বার্থের বিরুদ্ধেও যাবে। এই জেলার মানুষের কণ্ঠস্বরকে ছোট করার বদলে বড় করা দরকার। উন্নয়ন, সুরক্ষা ও ঐতিহ্যের স্বার্থেই আসন কমানোর প্রস্তাব ভ্রান্ত মনে করছি।

  • কাজী আলিম-উজ-জামান উপবার্তা সম্পাদক, প্রথম আলো

ইমেইল: [email protected]

* মতামত লেখকের নিজস্ব