লটারি-প্রক্রিয়া অনুসরণের পেছনের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তেমন প্রশ্নের অবকাশ নেই। শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে যে ভর্তিযুদ্ধ, তা শুধু অযৌক্তিক নয়, কিছুটা নিষ্ঠুরও ছিল। বই, প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং সেন্টার আর আমাদের অভিভাবকের নানা চাপে আমাদের শিশুরা নানাভাবেই ভারাক্রান্ত। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য সারা বছর ধরে শিশুদের শৈশব হরণ করে পরীক্ষার কঠিন চাপ দুঃখজনক একটা ব্যাপার ছিল। তাই বলে তৃতীয়, ষষ্ঠ, নবম শ্রেণিতে একই নীতি অনুসরণের যৌক্তিকতা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত। শিক্ষকমণ্ডলীর মান ও সুনাম, স্কুলের ঐতিহ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, নানা রকম সহশিক্ষা কার্যক্রম, পাঠাগার, খেলার মাঠ, স্কুল প্রশাসনের সুনাম—এ ধরনের নানা রকম ক্ষেত্রে আমাদের স্কুলগুলোর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

অপ্রিয় সত্য হলো এ দেশে ভালো স্কুলে পড়াটা একটা বিশেষ সুযোগ। যারা অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করতে পারবে, তাদেরই এই ধরনের বিশেষ সুযোগ পাওয়া উচিত। পুরোপুরি ভাগ্যনির্ভর ব্যবস্থায় ওপরের শ্রেণির কোনো শিশুর কোনো স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়া কোনো বিশেষ সুবিধার জন্য নিজেকে যোগ্য না করেই সেটা পাওয়ার মতো একটা ব্যাপার। আর সাধারণত যখন মানুষ বিনা পরিশ্রমে কোনো বিশেষ সুযোগ পায়, তখন অনেক সময় সে তার মূল্য দেয় না। আর যেখানে আমরা সব শিশুকে যথেষ্ট সুবিধা দিতে পারছি না, মেধাবী ও অধ্যবসায়ী শিশুকে সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা অসমীচীন মনে হয়। ঐতিহ্যগতভাবেই আমরা অনেকেই অতি নিয়তিবাদী।

আমরা অনেক সময়ই নিয়তিবাদকে আমাদের অলসতা বা ফাঁকিবাজির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করি। আর আমরা যেন লটারির মাধ্যমে আমাদের শিশুদের মনোজগতেও ‘পরিশ্রমের ফলে পুরস্কার’—এই ধারণার পরিবর্তে অতি নিয়তিবাদকে উৎসাহিত করছি।
অস্ট্রেলিয়ার মতো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশেও নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যে লক্ষ্য করেছি, বিদ্যালয়ের একটা শ্রেণির পর ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ স্কুলগুলোতে উচ্চতর শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারত। সে ক্ষেত্রে নানা রকম প্রাইভেট টিউশন-সংস্কৃতিও লক্ষ্য করেছি। অস্ট্রেলিয়ার পদ্ধতি আমাদের এখানেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিয়ে আসবে এবং আমাদের দেশেও তা-ই থাকতে হবে, এমন ভাবনার কারণ নেই। কিন্তু লক্ষণীয় যে, সব শিশুই ভর্তির বেলায় মেধা নয়, বরং ভাগ্যের ভিত্তিতে সমান সুযোগ পাবে—এ রকম চিন্তা তারা করেনি।

আমাদের স্কুলে প্রাইভেট টিউশনি বা কোচিংয়ের দুঃখজনক সংস্কৃতির পেছনে ভর্তি পরীক্ষার অবদান কতটুকু ছিল, তা নিশ্চিত নয়। ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ করার মাধ্যমে এই কোচিং-সংস্কৃতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না, হয়তো এর রূপ কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষকদেরই দোষারোপ করা হয়ে থাকে।

অনেক সময় শিশুদের বিভিন্নভাবে প্রাইভেট টিউশনি করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়, তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু এ দেশের স্কুলে শিক্ষকমণ্ডলীকে যে অল্প বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, সে নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না। তথাকথিত নামমাত্র কিছু সম্মান ছাড়া আমাদের শিক্ষকসমাজের মূল্যায়ন সমাজে খুবই কম। দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই স্কুল পর্যায়ে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি অনেক অপ্রতুল।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পক্ষে ছাত্রদের প্রতি যথেষ্ট সময় দেওয়ার অবকাশ অনেক কম। দেশের বহু স্কুলে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ছাড়াও নানা রকম কাজ, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে শিক্ষাবহির্ভূত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও সময় ব্যয় করতে হয়। নির্বাচনী তালিকা হালনাগাদ করা, ক্যাচমেন্ট এলাকার মানচিত্র তৈরি করা (স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকার মানচিত্র), শিশু শুমারি, স্যানিটেশন বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা, বৃক্ষরোপণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সতর্কতা, ছাত্র পরিষদ গঠন ইত্যাদি কার্যক্রমে তাঁদের যুক্ত থাকতে হয়।

অথচ শিক্ষার সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক খুবই ক্ষীণ। নীতিনির্ধারকদের শিক্ষকের প্রতি আচরণ দেখে অনেক সময় মনে হয়, শিক্ষকের যেহেতু কাজ অনেক কম বা গুরুত্বহীন, শিক্ষকদের দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তাঁরা নিজেদের হাতে নিয়েছেন। এই মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলোকে উপেক্ষা করে শুধু ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে প্রাইভেট টিউশন-নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপরে অযৌক্তিক চাপ কমানো যাবে—এই ভাবনা অসাড়।

স্কুলে ভর্তিপ্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি দুঃখজনক ব্যাপার হলো ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো পরিবর্ধন-পরিমার্জনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে বলে মনে হয় না।

স্কুলে ভর্তিপ্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি দুঃখজনক ব্যাপার হলো ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো পরিবর্ধন-পরিমার্জনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথমত দেশের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, প্রশাসক এমনকি শিক্ষার্থীদের মতামত ব্যাপকভাবে গ্রহণ এবং সেগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে দেখা যায়, আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র দিয়ে বড়জোর হয়তো কিছু শিক্ষাবিদের সঙ্গে ন্যূনতম আলোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ করা হয়।

বলাবাহুল্য এর ফলাফল সাধারণত ভালো হয় না। অবশ্য এ ধরনের অংশীদারবিহীন নীতিমালা প্রণয়ন শুধু অবহেলিত শিক্ষা ক্ষেত্রে নয়, এ দেশে অনেক ক্ষেত্রেই হামেশাই ঘটে থাকে। অংশীদারত্বমূলক নীতিমালা নির্ধারণ পুথিগত আর সেমিনারের ভাষা হিসেবে থাকবে না, বাস্তবে প্রতিফলিত হবে—এটা সময়ের দাবি। যদি তা হয়, অনেক তুঘলকি কাণ্ড থেকে আমাদের দেশ মুক্তি পেতেও পারে।

  • মো. রিজওয়ানুল ইসলাম অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ; সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়