কনেপক্ষ থেকে ব্যবসার জন্য টাকা চাওয়া কি যৌতুক নয়!

আমাদের এক আত্মীয়র খুব ছোটবেলার ঘটনা। জীবনের প্রথম দাওয়াত খেতে যাচ্ছেন। খুদে মানুষটি ভীষণ উত্তেজিত। দাওয়াত, সেটা না জানি কী! কিন্তু দাওয়াত খেতে গিয়ে তাঁর যে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল, সেটা এই মধ্যপঞ্চাশে এসেও তিনি স্মরণ করতে পারেন, ব্যাপারটা তাঁকে এতটাই আশাহত করেছিল।

ঘটনা হচ্ছে, দাওয়াতে যথারীতি পোলাও, রোস্ট, মাংসসহ নানা মুখরোচক পদের আয়োজন ছিল। কিন্তু সেই খুদে অতিথি অপেক্ষায় ছিলেন ‘দাওয়াত’ নামের সেই বিশেষ পদের জন্য। সবশেষে মিষ্টিও চলে এল, কিন্তু তাঁর সেই ‘দাওয়াত’ পদটাই চেখে দেখা হয়নি! অথচ শুরু থেকেই তিনি অপেক্ষায় ছিলেন মজা করে ‘দাওয়াত’ খাবেন বলে। সেই আফসোস তাঁর এখনো আছে।

গল্পটা মনে পড়ল সম্প্রতি যৌতুক বিষয়ে হাইকোর্টের একটি রায়ের পর্যবেক্ষণে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি যৌতুক নয়।’ তাহলে এই ‘যৌতুক’ বস্তুটা আসলে কী, সেটা কেউ আমাকে বুঝিয়ে বলবেন? এটা কি চারকোনা, নাকি গোল? তরল, কঠিন, নাকি বায়বীয়? এটার রং লাল, নীল, নাকি বেগুনি?

আরও পড়ুন

এত দিন জানতাম, ব্যবসার নাম করে বা বিদেশযাত্রার জন্য অর্থসংস্থানের কথা বলে কিংবা গাড়ি বা সম্পত্তি কেনার উসিলায় যৌতুক চাওয়া হতো। এখন জানতে পারলাম, এসব কারণে স্ত্রীর কাছে অর্থ দাবি করলে নাকি সেটা যৌতুক নয়। তাহলে যৌতুক জিনিসটা আসলে কী?

প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, ‘কনেপক্ষের কাছে শুধু ব্যবসার জন্য টাকা দাবি করলেই তা যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না বলে রায়ে বলা হয়েছে। তখনই যৌতুক হবে, যদি বিয়ের সময় অথবা সংসারজীবন চলাকালে টাকা দাবি করে এবং ওই অর্থ না দিলে যদি শর্ত দেওয়া হয় যে ডিভোর্স দেওয়া হবে কিংবা সংসার চালিয়ে না নেওয়ার কথা বলা হলে। শর্ত ছাড়া ব্যবসা, বিদেশে যাওয়া কিংবা গাড়ি কেনার জন্য টাকা চাওয়া হলে তা যৌতুকের সংজ্ঞায় আসে না।’

সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে, স্ত্রীর যদি নিজস্ব কোনো সঞ্চয় না থাকে বা নির্দিষ্ট আয়ের উৎস না থাকে, তাহলে এই অর্থ দাবি করা কতটা যৌক্তিক? কোথা থেকে আসবে এই অর্থ?

প্রশ্ন হচ্ছে, নারী নির্যাতন বা যৌতুকের মিথ্যা মামলা কি আদালতে দায়ের হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে, আকছার হচ্ছে এবং এসব মিথ্যা মামলায় অনেক নিরপরাধ মানুষের জেল-জরিমানা হচ্ছে, তাঁদের জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালত, বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব একটি নিরপরাধ মানুষও যেন কোনো মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার না হয়, সাজা না পায়, সেটা নিশ্চিত করা।

যাঁরা পত্রপত্রিকা পড়েন, তাঁদের নিশ্চয়ই বিভিন্ন সময় প্রকাশিত যৌতুক দাবিসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো চোখে পড়েছে। এগুলো খুব বিরল ঘটনা নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো এমন, স্বামী নানা প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি করেছেন এবং তা দিতে অস্বীকার করায় বা অপারগতা প্রকাশ করায় সেই স্ত্রী নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীকে হত্যাও করা হয়েছে।

ফলে আমরা দেখতে পাই, যৌতুকের দাবিগুলো নানা যৌক্তিক প্রয়োজনের ছদ্মাবরণে আত্মপ্রকাশ করে পর্যায়ক্রমে স্বরূপে আবির্ভূত হয়, যেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রক্তক্ষয়ী, সহিংস।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করা প্রয়োজন। ‘ফ্ল্যাটের টাকার জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন, ট্রাফিক সার্জেন্টের কারাদণ্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, মামলার এজাহার অনুযায়ী, ফ্ল্যাট কিনতে স্ত্রীর কাছে ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন নাজিম। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় ২০২০ সালের মার্চ ও জুনের বিভিন্ন তারিখে স্ত্রীকে মারধর করেন তিনি।

আরও পড়ুন

ওই বছরের ১৭ আগস্ট স্ত্রী আশরেফা জাহান বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দেয়। ৯ সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে আদালত রায় দেন।

আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম হচ্ছে ‘যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীর চুল কেটে পালালেন সেলুনকর্মী’। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বীন ইসলাম পেশায় সেলুনকর্মী। বর্তমানে নরসিংদীতে সেলুনে কাজ করেন। একসময় ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় একটি সেলুনে কাজ করতেন। কয়েক দিন ধরে নরসিংদীতে নতুন একটি সেলুন দিতে স্ত্রীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন দ্বীন ইসলাম ও তাঁর মা-বাবা। এতে রাজি না হওয়ায় প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন দ্বীন ইসলাম।

লক্ষ করুন, এ দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে কোথাও কিন্তু সরাসরি ‘যৌতুক’ চাওয়া হয়নি, খুব ‘সংগত’ কারণেই ‘ফ্ল্যাট কেনা’ বা ‘সেলুনের ব্যবসা’ দেওয়ার জন্য টাকা চাওয়া হয়েছে। এমন আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। আগ্রহী ব্যক্তিরা একটু কষ্ট করে গুগল সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন।

আরও পড়ুন

শুরুতেই যে মামলার রায়ের প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল, সেই মামলার রায়ে আদালত বলেছেন, বর্তমান মামলায় নথিতে থাকা সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়ন করে দেখা যায় যে আপিলকারী তাঁর স্ত্রীর (অভিযোগকারী) কাছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এক লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। ঘটনার সময় আপিলকারী যৌতুক হিসেবে টাকা দাবি করেছিলেন—রাষ্ট্রপক্ষ তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং এক লাখ টাকা দাবির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা আইনের ২(ঞ) ধারায় উল্লেখিত যৌতুকের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না।

স্ত্রীর কাছে ব্যবসার প্রয়োজনে বা বাড়ি-গাড়ি কেনার জন্য টাকা চাইলেই সেটা যৌতুক নয় এবং যৌতুক শব্দটিও স্বামী উচ্চারণ করেননি। ঠিক আছে, মানলাম। এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, স্ত্রীর কাছে যে টাকা চাওয়া হচ্ছে, সেই টাকা স্ত্রী কোথায় পাবেন? তাঁর যদি নিজস্ব আয়ের সংস্থান না থাকে, সঞ্চিত টাকা না থাকে, তাহলে কীভাবে দেবেন? এর উত্তর সবারই জানা।

এ দেশের বাস্তবতায় স্ত্রীদের টাকা নিয়ে আসার একমাত্র উৎস হচ্ছে নিজের বাপের বাড়ি। এখন সেই বাবা যতই দরিদ্র বা অপারগ হোন না কেন, মেয়ের জামাইয়ের এমন ‘যৌক্তিক দাবি’ মেনে নিতে তিনি বাধ্য; কারণ, সেটা না মানলে সেই সংসারে যে ঝড় উঠবে, এর প্রথম শিকারই হবে তাঁর আদরের কন্যাটি।

আশঙ্কা হচ্ছে, আদালতের এই রায়ের রেফারেন্স দিয়ে ভবিষ্যতেও অনেক যৌতুকের মামলা ব্যবসায়িক প্রয়োজন, বিদেশযাত্রা বা বাড়ি-গাড়ি কেনার জন্য টাকা চাওয়ার মতো নিরীহ দাবিতে অভিহিত হয়ে নারীকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে দেবে কি না! আইন প্রয়োগ বা আইন মানার ক্ষেত্রে আমাদের নিদারুণ অনীহা থাকলেও আইনের ফাঁকফোকরগুলো যথাযথ ব্যবহারে আমরা সিদ্ধহস্ত নই, এ দুর্নাম আমাদের শত্রুও দিতে পারবে না। আর সে কারণেই এ আশঙ্কা।

প্রশ্ন হচ্ছে, নারী নির্যাতন বা যৌতুকের মিথ্যা মামলা কি আদালতে দায়ের হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে, আকছার হচ্ছে এবং এসব মিথ্যা মামলায় অনেক নিরপরাধ মানুষের জেল-জরিমানা হচ্ছে, তাঁদের জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালত, বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব একটি নিরপরাধ মানুষও যেন কোনো মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার না হয়, সাজা না পায়, সেটা নিশ্চিত করা।

আদালতের রায় অনুযায়ী উল্লেখিত মামলাটিতেও স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, আদালতের বিচার কিংবা রায় নিয়ে এখানে কোনো প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ নেই। তবে এ আশঙ্কা অমূলক নয়, আদালতের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের অতি সরলীকরণের মাধ্যমে এর অপব্যবহারের সুযোগ থাকছে কি না। আর সেই সুযোগ নিয়ে ‘বিশেষ প্রয়োজনের’ মোড়কে যৌতুক দাবি করার সুযোগটা প্রশস্ত হলো কি না, সেটাও ভেবে দেখা দরকার।

  • গোলাম কিবরিয়া গণমাধ্যম বিশ্লেষক, উন্নয়নকর্মী

    ই–মেইল: [email protected]