ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে। নির্বাচনের পর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে গণপ্রতিনিধিদের শপথ নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ অধিবেশন শুরু করতে হয়। সেটি শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। ঈদের ছুটির কারণে অধিবেশন স্থগিত ছিল। সেটি আবার শুরু হয়েছে।
গত কয়েক দিনের আলোচনা দেখে, শুনে ও পড়ে মনে হচ্ছে, দেশে সমস্যা একটাই—সংবিধান। এটা সংশোধন হবে, নাকি সংস্কার হবে। তারপর আছে গণভোট নিয়ে বিতর্ক। এটি বহাল আছে, নাকি তামাদি হয়ে গেছে। লেখাটা যখন শুরু করি, তখন ফোন দিলেন অগ্রজপ্রতিম ডেনিস দীলিপ দত্ত। তিনি ১৯৬০-এর দশকের একজন বামপন্থী ছাত্রনেতা। বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনে সামনের কাতারে ছিলেন। পরে হয়ে যান মিশনারি। এখন অবসরজীবন যাপন করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘গাফিলতি’ নিয়ে কিছু লিখুন।
কদিন ধরেই একটা বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম। দত্তদা সেটি উসকে দিলেন। আমি ‘গাফিলতি’ শব্দের অর্থ খুঁজতে থাকি। পেয়েও যাই। ‘গাফিলতি’ শব্দটি হলো অসতর্কতা, অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য। সাধারণত কোনো কাজ করার সময় মনোযোগের অভাব বা দায়িত্বে উদাসীনতা বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ কেউ সময়মতো না করে বা নিয়ম মেনে না চলে, তখন বলা হয় সে গাফিলতি করেছে।
একটা সভ্য সমাজে কোনো দুর্ঘটনায় তিরিশ-চল্লিশজন মানুষ একসঙ্গে মারা গেলে সেখানে জাতীয় শোক দিবস পালনের নজির আছে। ওই সব দেশ তাদের নাগরিকদের নিয়ে মাথা ঘামায়। কারণ, দেশগুলো নাগরিকদের। আমাদের দেশে সবই উল্টো। এখানে দেশ চেপে বসে আছে নাগরিকদের ঘাড়ে। কথায় কথায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা।
গত কয়েক দিন আমরা অনেক খবর শুনেছি ও জেনেছি। তার মধ্যে দুটি খবর মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। আমার ধারণা, যেকোনো বিবেকবান মানুষ এসব খবর জেনে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারবেন না। প্রথমটি হচ্ছে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের পন্টুনে উঠতে গিয়ে পদ্মায় একটি যাত্রীবাহী বাসের ডুবে যাওয়া। মাত্র কয়েকজন যাত্রী জীবিত বের হয়ে আসতে পেরেছেন। বাসটি ডুবে ৯০ ফুট পানির নিচে চলে যায় বলে খবরে প্রকাশ। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ বাসটি তুলতে পেরেছে। ততক্ষণে বাসের ভেতরে কারও আর বেঁচে থাকার কথা নয়। পাঁচ দিন অনুসন্ধান চালিয়ে উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখনো অনেকে নিখোঁজ।
এ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। এমনও বলা হচ্ছে, এটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না। এটি একটি হত্যাকাণ্ড। কেন এমন কথা বলা হচ্ছে? বলা হচ্ছে এ কারণে যে নদী পারাপারের ব্যবস্থাটাই এমন, এখানে ঝুঁকি প্রবল। অবকাঠামো ও সাজসরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ নেই। এসব দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁরা এ নিয়ে মাথা ঘামান না। একজন এমন মন্তব্যও করেছেন যে প্রধানমন্ত্রী বা কোনো মন্ত্রী তো বাসে যাতায়াত করেন না। তাই এ নিয়ে কর্তাদের মাথাব্যথা নেই। এটা কি হত্যাকাণ্ড, নাকি নিয়তি। অনেকেই ধরে নেয়, হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে! আমাদের একটি পেনাল কোড আছে। ব্রিটিশরা আমাদের জন্য এটি তৈরি করে দিয়েছেন। জানি না, এ বিষয়ে সেখানে কী ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। এটা যে নিদারুণ ‘গাফিলতি’, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
দ্বিতীয় উদাহরণে আসি। কয়েক দিন ধরে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। বড়রাও বাদ পড়ছে না। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলো সামাল দিতে পারছে না। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। মফস্সলের এক হাসপাতালে কোনো ভেন্টিলেটর না থাকার খবর জেনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘তাঁদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো উচিত।’ তিনি হয়তো রেগে গিয়ে এ মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বিষয়টি তো রাগারাগি বা মান-অভিমানের নয়। জানা গেল, বেশ কয়েক বছর নাকি হামের টিকা দেওয়া হয়নি। দেশে টিকার মজুত নেই। তড়িঘড়ি করে টিকা আমদানির ব্যবস্থা হয়েছে। টিকা না দেওয়ার কারণে যদি রোগের প্রাদুর্ভাব এবং সংক্রমণ হয়, মৃত্যুর মিছিল লম্বা হতে থাকে, তাহলে এটিকে ঠান্ডা মাথায় খুনও বলা যেতে পারে।
টিকা দেওয়া হয়নি, টিকার মজুত নেই, এ দায় কার? বিষয়টি অনুসন্ধান করা দরকার। অভিযোগের আঙুল অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে। এ বিষয়ে ওই সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের ভাষ্য জানা দরকার। আমাদের দেশে তো মিনিটে মিনিটে তদন্ত কমিটি তৈরি হয়। এ নিয়েও একটা কমিটি হয়তো হবে। তদন্ত কমিটির
রিপোর্ট আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না, সেটি তো ভবিষ্যতের ব্যাপার। আপাতত এটির খোঁজ নেওয়া দরকার। এটা যে বড় রকমের একটা ‘গাফিলতি’, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এবার ফিরে তাকাই সংসদ অধিবেশনের দিকে। সেখানে কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে? আলোচনা হচ্ছে জুলাই সনদ, সংবিধান, গণভোট ইত্যাদি নিয়ে।
সংবিধান সংস্কার হবে, নাকি সংশোধন হবে; এ নিয়ে হচ্ছে বাহাস। মনে পড়ে ষাট ও সত্তরের দশকে আমাদের দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কথা। সেখানে শব্দ নিয়ে মারামারি হতো। দেশে আধা নাকি সিকি সামন্তবাদ, সে নিয়ে তৈরি হতো শব্দঝড়। সে ঝড়ে পার্টি ভেঙে যেত। সংসদে এখন চলছে শব্দঝড়। সংসদে ব্যবহার করা মাইক্রোফোন নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করতে পারেন, এসবই বায়বীয় বিষয়। মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা, ঘাটতি ও সমস্যা নিয়ে কোনো কথা হয় না।
একটা সভ্য সমাজে কোনো দুর্ঘটনায় তিরিশ-চল্লিশজন মানুষ একসঙ্গে মারা গেলে সেখানে জাতীয় শোক দিবস পালনের নজির আছে। ওই সব দেশ
তাদের নাগরিকদের নিয়ে মাথা ঘামায়। কারণ, দেশগুলো নাগরিকদের। আমাদের দেশে সবই উল্টো। এখানে দেশ চেপে বসে আছে নাগরিকদের ঘাড়ে। কথায় কথায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এক ভাষণে বলেছিলেন, আমাদের নাকি অসভ্য যুগ থেকে সভ্য যুগে উত্তরণ ঘটেছে। আসলে
আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সে তিমিরেই রয়ে গেছি। একটা সনদ বানিয়ে বা সংবিধানে দু-চারটি শব্দ এদিক-ওদিক করে সভ্য হওয়া যায় না। রাষ্ট্রের সব
স্তরে যে অনিয়ম, কাণ্ডজ্ঞানহীনতা, স্বেচ্ছাচার আর গাফিলতি দেখছি; সেখানে সভ্য হওয়ার দাবি বাগাড়ম্বর মনে হয়। সব জায়গায় গাফিলতি। দেশ চলছে
বাগাড়ম্বর দিয়ে।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব