এরপর কয়েক দিন ধরে ঢাকার বিভাগীয় সমাবেশের স্থান নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সঙ্গে বিএনপির নেতাদের আলোচনা চলছিল। দলের পক্ষ থেকে ডিএমপিকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হয়। বিএনপি তখন নয়াপল্টনে দলীয় অফিসের সামনের সড়কে মহাসমাবেশ করার জন্য মরিয়া। অন্যদিকে সরকার কোনোভাবে সেখানে সমাবেশ করতে দেবে না। একপর্যায়ে ডিএমপির পক্ষ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতির কথা জানানো হলে বিএনপির নেতারা ভাবলেন, সরকারকে আরেকটু চাপ দিলেই দাবি আদায় করতে পারবেন।  

তাঁরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার প্রস্তাব এই বলে নাকচ করে দিলেন যে সেখানে তঁারা নিরাপদবোধ করছেন না। উদ্যানে প্রবেশের পথ মাত্র দুটি। একবার নেতা-কর্মীরা সেখানে ঢুকে পড়লে বের হতে দেওয়া হবে না।

বিএনপি চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টার কাছে জানতে চাইলাম, তাঁরা কেন উদ্যানে সমাবেশ করলেন না? তাঁর জবাব ছিল, ‘সেখানে নিরাপত্তাঝুঁকি ছিল এ কথা ঠিক কিন্তু আমরা যদি বেশি লোকসমাগম করত পারতাম, তাহলে সেই ঝুঁকি হাওয়ায় মিলিয়ে যেত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সোহরাওয়ার্দীর প্রবেশপথ বন্ধ করলেও আশপাশের সড়ক তো বন্ধ করে রাখতে পারত না।’ 

আমরা জানি না বিএনপির নেতারা ঢাকার সমাবেশে কত লোক আশা করছিলেন। যদি তাঁরা অন্তত দুই লাখ লোকের সমাবেশ হবে বলেও আশা করে থাকেন, তাহলেও কি সমাবেশে আগত মানুষকে আটকে রাখা সম্ভব? সরকার যখন উদ্যানে সমাবেশের অনুমতিই দিয়েছে, সেখানকার নিরাপত্তা দেওয়ারও দায়িত্ব তাদের। সমাবেশের স্থান নিয়ে এই বাদানুবাদের মধ্যে ৭ তারিখে নয়াপল্টনে দলীয় নেতা-কর্মীদের সমবেত হওয়াকে কেন্দ্র করে অঘটন ঘটল। এই অঘটনের জন্য সরকার বিএনপিকে এবং বিএনপি সরকারকে দায়ী করলেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেদিন দলের একজন কর্মী নিহত ও বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। দলীয় অফিস কয়েক দিন তালাবদ্ধ ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির অফিসে বিস্ফোরক ও চাল-ডাল মজুত করা হয়েছিল এবং তারা লাগাতার রাস্তায় অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল। বিএনপির নেতারা বলেছেন, দলীয় অফিসে হামলা চালাতেই এসব ভিত্তিহীন অজুহাত খাড়া করা হয়েছে।

এর আগে বিএনপির একজন নেতা বলেছিলেন, ১০ ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়ার কথায়। ৮ তারিখ রাতে পুলিশ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে বাসা থেকে তুলে ডিবি অফিসে নেয়। ডিবি থেকে প্রথমে বলা হয় বিএনপির অফিসের ঘটনা ও সমাবেশের স্থান নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করতে নিয়ে আসা হয়েছে। পরে দেখা গেল বিস্ফোরক আইনে দুই নেতার নামে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে রাজপথে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। যাঁরা ১০ তারিখের পর দেশ খালেদা জিয়ার কথায় চলবে বলে আওয়াজ তুলেছিলেন, তাঁরা নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। 

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নেতারা মহাসচিবের মুক্তি চেয়ে ঢাকায় সমাবেশ করাকেই অধিক গুরুত্ব দিলেন। একদিকে একের পর এক জামিন আবেদন নামঞ্জুর, অন্যদিকে সমাবেশের মাঠ নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা। শেষ পর্যন্ত বিএনপি ঢাকার এক প্রান্তে অবস্থিত গোলাপবাগ মাঠে সমাবেশ করল। বিএনপি বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে যেভাবে দেশবাসীর মনোযোগ কেড়েছিল, ঢাকায় সেটা হয়নি। যদিও এই সমাবেশ থেকেই তারা আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। বিএনপি চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টার কাছে জানতে চাইলাম, তাঁরা কেন উদ্যানে সমাবেশ করলেন না? তাঁর জবাব ছিল, ‘সেখানে নিরাপত্তাঝুঁকি ছিল এ কথা ঠিক কিন্তু আমরা যদি বেশি লোকসমাগম করত পারতাম, তাহলে সেই ঝুঁকি হাওয়ায় মিলিয়ে যেত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সোহরাওয়ার্দীর প্রবেশপথ বন্ধ করলেও আশপাশের সড়ক তো বন্ধ করে রাখতে পারত না।’ 

বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দলের কিছু নেতার উগ্র মনোভাব ও বক্তৃতা–বিবৃতির জন্যই ৭ তারিখের অঘটন ঘটেছে। দলের বেশির ভাগ নেতা উদ্যানে সমাবেশের বিষয়ে নীতিগতভাবে রাজি থাকলেও অদৃশ্য নির্দেশে সেটি আর কার্যকর হয়নি। অদৃশ্য নির্দেশ কিংবা বিদেশিরা কখন সরকারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়, তার ওপর নির্ভর করে আর যা–ই হোক, গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে না। 

১০ ডিসেম্বরের সমাবেশে বিএনপির ছয়জন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘোষণা নিয়েও দলে প্রশ্ন উঠেছে। এই সিদ্ধান্ত কি স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতভাবে নিয়েছে, না এটিও নির্দেশিত ছিল? পদত্যাগকারী একাধিক সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বেশির ভাগ সদস্য একমত ছিলেন না। পদত্যাগের প্রধান যুক্তি হলো যে নির্বাচন ও সংসদকে বিএনপি অবৈধ বলে দাবি করছে, সেই সংসদে তাদের সদস্যরা থাকেন কীভাবে? এই চার বছর যদি তাঁরা এই সংসদে থাকতে পারেন, বাকি এক বছর বা ৯ মাসে সমস্যা কী ছিল। বরং তাঁরা পদত্যাগ করায় সরকারকে এখন আর সংসদে কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। 

রুশ বিপ্লবের নেতা ভি আই লেনিন আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করতে গিয়ে ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড টু স্টেপ ব্যাকওয়ার্ডের কথা বলেছিলেন। বিএনপি নেতৃত্বের কৌশল দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা এক পা এগিয়ে চার পা পিছিয়ে চলাকে নিরাপদ মনে করছেন। 

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]