যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস: ৩ লাখ চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে কেন এই প্রতারণা

সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ঘটনায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পরীক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টায়ছবি: জাহিদুল করিম

একটি সরকারি চাকরির জন্য কতটা পরিশ্রম করতে হয়, কতটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা যাঁরা পরীক্ষা দেন তাঁরাই ভালো জানেন। অনেকের জন্য পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি থাকে দূরের জেলা থেকে ঢাকায় আসার খরচ, আবাসনের ব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের চাপ।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া প্রার্থীদেরও এমন প্রস্তুতি ছিল। ১১তম গ্রেডের এই পদে প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ১ হাজার ২৬২ জন। মোট শূন্য পদ ২৪২টি। বাসস জানায়, রাজধানী ঢাকার ৯৫টি কেন্দ্রে ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে পৌঁছে তাঁরা জানতে পারলেন, পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

কারণ, পরীক্ষার আগের রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

এখানে প্রশ্ন শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের নয়। যাঁরা মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিয়ে, অর্থ খরচ করে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছালেন, তাঁদের এই ভোগান্তির দায় নেবে কে? যাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের ব্যর্থতার মূল্য কেন চাকরিপ্রার্থীদের দিতে হবে?

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

প্রতিবছর দেশে আনুমানিক ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কর্মসংস্থান হয় বিদেশে। বাকিদের কাজের সুযোগ খুঁজতে হয় দেশের শ্রমবাজারে। কাজের সুযোগ ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকারি চাকরি অনেক তরুণের কাছে কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তবে এই হিসাব দিয়ে কর্মসংস্থানের পুরো চিত্র বোঝা যায় না।

পরীক্ষা স্থগিতের পর বিষয়টি নিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানান, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দূর–দূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া প্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি ‘দুর্ঘটনা’। দুর্ঘটনা ঘটলে সবাইকেই ভুগতে হয়।

সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ঘটনায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পরীক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টায়
ছবি: জাহিদুল করিম

প্রশ্ন হলো, এই দুর্ঘটনা কি চাকরিপ্রার্থীরা ঘটিয়েছেন? যাঁরা মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করেছেন, যাঁরা দূর–দূরান্ত থেকে কেন্দ্রে পৌঁছেছেন, তাঁরা কি প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন, ছাপিয়েছেন কিংবা বিতরণ করেছেন? অবশ্যই না। তাহলে অন্যের ব্যর্থতার দায় তাঁদের বহন করতে হবে কেন?

প্রশ্নপত্র তৈরি, মুদ্রণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যকার কোনো পর্যায় থেকেই যে প্রশ্নপত্র বাইরে এসেছে তা জানার জন্য ‘রকেট সায়েন্টিস্ট’ হওয়া লাগে না। কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো, তা তদন্ত করে বের করতে হবে। কারও অবহেলা বা যোগসাজশ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

একটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যর্থ হলে পরীক্ষা স্থগিত করা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু পরীক্ষা স্থগিতের কারণে যে ভোগান্তি তৈরি হলো, তার দায় কি সবাইকে সমানভাবে নিতে হবে? যাঁরা কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন, তাঁদের কেন সময়, অর্থ ও শ্রমের ক্ষতি মেনে নিতে হবে?

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

এখানেই ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি যথেষ্ট নয়। দুর্ঘটনা বললেই ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা হয়ে যায় না, দায়িত্বও শেষ হয়ে যায় না।

দেশে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে এর আগেও বড় ধরনের অভিযোগ ও তদন্তের ঘটনা ঘটেছে। পিএসসির অধীন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শিক্ষা নেওয়ার কথা। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা, দায়িত্বের প্রতিটি ধাপে নজরদারি এবং অনিয়মের ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

তারপরও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় এমন ঘটনা ঘটল কেন? আগের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলোর পর প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এবার সেই ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল? দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারও অবহেলা বা যোগসাজশ ছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর অধিদপ্তরকেই দিতে হবে।

সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ঘটনায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অবরোধ করে পরীক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টা
ছবি: জাহিদুল করিম

প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ হয়তো অন্যায্য প্রতিযোগিতা ঠেকিয়েছে। কিন্তু তাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস বন্ধ হয়েছে, এমন নিশ্চয়তা নেই। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ঘটনায় শুধু নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস খুঁজে বের করতে হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটি পরীক্ষা স্থগিত হওয়া কর্তৃপক্ষের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা হতে পারে। কিন্তু একজন চাকরিপ্রার্থীর জন্য তা কয়েক মাসের প্রস্তুতি, ধার করা টাকা, দূরের পথ পাড়ি দেওয়া এবং পরিবারের প্রত্যাশা নিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়া। পরীক্ষা আবার নেওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের হারানো সময় ও অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

  • সৈয়দ রিফাত মোসলেম প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক

    মতামত লেখকের নিজস্ব