কৌতুক ২। সুন্দরবনে এক বাঘ ঘুমাচ্ছে। এক বাঁদর অন্য প্রাণীদের বলল, ‘আসো, তোমাদের মজা দেখাই। বনের রাজার কান মলে দিই।’
ঘুমন্ত বাঘের গায়ে বসে বাঁদর তার কান মলে দিতে লাগল।

বাঘের ঘুম ভেঙে গেল। সে দেখতে পেল, একটা বাঁদর তার গায়ে বসে আছে আর বাঁদরের হাত বাঘের কানে।

বাঘ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসতেই বাঁদর ছুটে পালাতে লাগল। বাঘ তাকে ধাওয়া করল। বাঁদর বন ছেড়ে ঢুকে পড়ল জনপদে। বাঘও ছুটছে তার পিছু পিছু। বাঁদর ঢুকে গেল একটা অফিসে। গিয়ে দেখল, অফিসার নেই, চেয়ার খালি, পেছনে কোট, সামনে একটা প্রথম আলো পত্রিকা। বাঁদরটা চেয়ারে বসে কোট গায়ে দিয়ে প্রথম আলো পত্রিকাটা মেলে ধরে নিজের মুখ ঢেকে রাখল।

একটু পরে বাঘ এসে ঢুকল সেই কক্ষে। বলল, ‘ভাই, এখানে কি কোনো বাঁদরকে ঢুকতে দেখেছেন?’

বাঁদর গলা মোটা করে পত্রিকা পড়তে পড়তে বলল, ‘কোন বাঁদরটা? আজ তিনটা তেত্রিশ মিনিটে সুন্দরবনের কটকা এলাকায় যে বাঁদরটা একটা বাঘের কান মলে দিয়েছে? আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা জানান...’

বাঘ বলল, সর্বনাশ। এই খবর কি প্রথম আলোয় ছাপা হয়ে গেছে?
বাঘ দৌড়ে বনের ভেতর এসে গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ল।

আমরা দেখেছি, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে কাজ হয়। সন্ত্রাসীরাও নিজেদের লুকিয়ে ফেলে। প্রথম আলোয় কোনো মানবিক খবর ছাপা হলে হৃদয়বান মানুষেরা এগিয়ে আসেন।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিষয়ে একটা কৌতুক বলি। এটা সংবাদপত্র নিয়ে কৌতুক নয় যদিও। আব্রাহাম লিংকন প্রেসিডেন্ট হলে মন্ত্রী পদপ্রার্থীরা ভিড় করেন। তখন তিনি এই কৌতুক বলেছিলেন।

এক রাজা যাচ্ছেন শিকারে। তিনি আবহাওয়াবিষয়ক মন্ত্রীকে বললেন, সামনে আবহাওয়া কেমন?
মন্ত্রী বললেন, চমৎকার।

সামনে এক গাধার পিঠে চড়া এক ধোপা বলল, ‘মহারাজ, আর এগুবেন না। সামনে বৃষ্টি হবে। রাস্তা পিছল।’

তা-ই হলো। খানিক এগোতেই শুরু হলো বৃষ্টি। রাজা তখন মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে ধোপাকে মন্ত্রী বানালেন।

ধোপা বলল, ‘মহারাজ, আমার গাধার যখন কান নড়ে, তখন আমি বুঝি সামনে বৃষ্টি হবে।’

রাজা তখন ধোপাকে বরখাস্ত করে গাধাকে মন্ত্রী বানালেন।
তখন রাজার বাড়ির সামনে ভিড় লেগে গেল। সবাই বলতে লাগল, ‘আমরাও তো গাধা। আমাদেরও মন্ত্রী বানান।’

এই গল্পের উপদেশ হলো, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিদূষক, উপকারভোগীদের কাছ থেকে দেশের পরিস্থিতিবিষয়ক রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয় না। তাঁরা সব সময়ই বলবেন, দেশের পরিস্থিতি খুব ভালো। দেশে কোনো সমস্যা নেই।

আসল খবর পেতে হবে পেশাদার স্বাধীন দায়িত্ববান সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে, যারা রাজাকে খুশি করার জন্য কথা বলবে না। যারা সত্য বলবে মানুষের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে।

এবার লাইট বাল্ব কৌতুক।
একটা লাইট বাল্ব বদলাতে কতজন বডি বিল্ডার লাগে?
১০১ জন। একজন বাল্বটা লাগায়। ১০০ জন বিল্ডিংটাকে শোয়ায়।
একটা লাইট বাল্ব বদলাতে কতজন সাংবাদিক লাগে? তিনজন। একজন খবর দেয়, লাইট বাল্ব বদলাতে হবে। একজন অ্যাসাইনমেন্ট দেয়। একজন খবরটা লেখে।
কর্তৃপক্ষের লোক এসে লাইট বাল্ব বদলে দেয়।

প্রথম আলো ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘সত্যে তথ্যে ২৪’ এই স্লোগান প্রচার করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা প্রবন্ধ আছে ‘তথ্য ও সত্য’ নামে। এতে তিনি তথ্য থেকে সত্যটাকে আহরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন পাঠকদের। জ্ঞানদাসের কবিতা ‘রূপের পাথারে আঁখি ডুবিয়া রহিল, যৌবনের বনে মন পথ হারাইল’ পড়ে পাঠক যেন না ভাবতে বসেন, যৌবনের বন কোন দেশের বন? সেখানে পথ পায়ই বা কে আর হারায়ই বা কী উপায়ে? তিনি বলছেন, একবার বৌদ্ধ কাহিনি থেকে একটা কবিতা তিনি লিখেছিলেন। অনাথপিণ্ডদ প্রভু বুদ্ধের নামে শ্রাবস্তী নগরে ভিক্ষা করতে বের হলেন।

ধনীরা ধন দিল, কেউ বা দান করল হীরা–মানিক। এক গরিব ভিখারিনী। তার আর কিছুই নেই, পরনের কাপড় ছাড়া। মেয়েটি তা–ই দান করল। এই কবিতা লিখে রবীন্দ্রনাথ মুশকিলে পড়লেন। ভদ্রলোকেরা ছি ছি করতে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ যতই বলেন, এটা বৌদ্ধ ধর্মের কাহিনি, তাঁরা ততই ছিছিক্কার বাড়িয়ে দেন। রবীন্দ্রনাথ তাই বলছেন, সত্যের দিকে তাকাতে, তথ্যের দিকে এমন নির্জলা দৃষ্টিতে যেন আমরা না তাকাই।

রবীন্দ্রনাথ কবি। তিনি এ কথা বলতেই পারেন। কিন্তু প্রথম আলোয় খবর ছাপার আগে সাতবার খোঁজ নিতে হবে, যাচাই-বাছাই করতে হবে, ক্রস চেক লাগবে এবং লাগবে অভিযুক্তর মত। প্রথম আলোর খবর বিশ্বাসযোগ্য। তাই কোনো ঘটনা আসলেই ঘটেছে কি না, ঘটলে কী ঘটেছে, জানার জন্য আমি প্রথম আলো ডটকমে যাই। আর কেন ঘটল, ব্যাপারটার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কী পড়বে, জানার জন্য পরদিনের প্রথম আলোর কাগজ পড়ি।

তারপর সেসব খবর নিয়ে কী করে কৌতুক করা যায়, ভাবতে ভাবতেই বৃহস্পতিবার সকালে শুক্রবারের লেখাটা লিখতে বসি। সেটাই আপনারা এখন পড়ছেন।

  • আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক