আফ্রিকার দেশগুলো কি এবার বিশ্বকাপ বর্জন করবে?

২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে স্পেনকে পরাজিত করার পর ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন করেছে মরক্কোর ফুটবল দল।ছবি: এএফপি

৬ জানুয়ারি ব্রিটেনের ২৫ জন সংসদ সদস্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেখানে তারা ফুটবলের বৈশ্বিক ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ ফিফার প্রতি একটি আকস্মিক আহ্বান জানান। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

ইউরোপে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা বাড়ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব এসেছে। কারণ, বিশ্বকাপ এমন একটি আয়োজন, যা লাখ লাখ মানুষ দেখবে এবং যা আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

নেদারল্যান্ডসের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তেউন ভান দে কেকেন বিশ্বকাপ বর্জনের দাবিতে ওঠা এক জন–আবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। একইভাবে ফ্রান্সের সংসদ সদস্য এরিক কোকরেল সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বকাপের এই আসরে অংশ নেওয়া মানে এমন নীতিকে পরোক্ষে বৈধতা দেওয়া, যা তার মতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে দুর্বল করে।

সমালোচনার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিকে ঘিরে। জানুয়ারিতে অভিবাসন অভিযানের সময় মিনিয়াপোলিসের বাসিন্দা রেনি নিকোল গুড ও অ্যালেক্স প্রেট্টির মৃত্যু দেশজুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ফেডারেল অভিবাসন সংস্থার গুলিতে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন অথবা আটকাবস্থায় মারা গেছেন।

এ ঘটনাগুলো গুরুতর। তবে প্রশ্নটি কেবল দেশীয় দমননীতি নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ক্ষমতা ও জবাবদিহির বৃহত্তর প্রসঙ্গ; যা যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির পরিণতির দিকেও ইঙ্গিত করে। গাজায় যুদ্ধ এখন গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মিত্র।

কূটনৈতিক সুরক্ষা, রাজনৈতিক সমর্থন এবং প্রতিবছর প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে। এই অংশীদারত্বই আজ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে চলমান ধ্বংসযজ্ঞকে অর্থায়ন ও প্রভাবিত করছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর হামলায় ৭২ হাজার ৩২ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৬১ জন।

গাজার অধিকাংশ ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, পানিব্যবস্থা ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এদিকে পশ্চিম তীরে জেনিন, নাবলুস, হেবরন ও জর্ডান ভ্যালিতে অভিযান, জমি দখল ও চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বেড়েছে।

আফ্রিকা মহাদেশে এই আক্রমণগুলো গভীর ঐতিহাসিক অনুরণন তৈরি করে। কারণ, সংগঠিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সেখানে মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন সোয়েটোতে ১৫ বছর বয়সী হেস্টিংস নডলোভু হাজারো শিক্ষার্থীর সঙ্গে আফ্রিকানস ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যোগ দেন।

সেদিনই পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। সেদিন পুলিশ ৫৭৫ জন তরুণকে হত্যা করে এবং হাজারো মানুষ আহত হয়। এই রক্তপাত সত্ত্বেও বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে কয়েকটি পশ্চিমা দেশের কূটনৈতিক ও ক্রীড়া সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি।

প্রায় ৩০০ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও নাগরিক প্রতিবেদক এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্ববাসী সরাসরি দেখছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অস্ত্র, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং জাতিসংঘে ভেটো সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতির সমালোচনা থাকলেও গাজায় যে বিপর্যয় চলছে, তার পরিসর সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এর কয়েক সপ্তাহ পর নিউজিল্যান্ডের জাতীয় রাগবি দল অল ব্ল্যাকস জোহানেসবার্গে পৌঁছায়। তারা বর্ণবাদী শাসনের মধ্যেই প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে আসে। এতে ক্ষুব্ধ হয় বহু আফ্রিকান দেশ। এর প্রতিক্রিয়া পৌঁছে যায় ১৯৭৬ সালের মন্ট্রিয়ল অলিম্পিকে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ২২টি আফ্রিকান দেশ অলিম্পিক বর্জন করে।

মরক্কো, ক্যামেরুন, তিউনিসিয়া ও মিসর খেলা শুরু করেও সরে দাঁড়ায়। নাইজেরিয়া, ঘানা ও জাম্বিয়া পুরুষ ফুটবল প্রতিযোগিতা থেকে নাম প্রত্যাহার করে। সাত শতাধিক ক্রীড়াবিদ অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ ত্যাগ করেন।

আফ্রিকান নেতারা জানতেন, সিদ্ধান্তটি কঠিন। তবু তাঁরা মনে করেছিলেন, অংশ নিলে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনই সম্মান ও স্বীকৃতি পাবে। এই ইতিহাস ২০২৬ সালের জন্যও এক শিক্ষা রেখে যায়। বর্জনের মূল্য আছে। এতে ত্যাগ, সমন্বয় ও রাজনৈতিক সাহস লাগে; কিন্তু সমষ্টিগত প্রত্যাখ্যান বিশ্বজনমতকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। পাঁচ দশক পর গাজা এক অনুরূপ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাফার সাত বছরের শিশু সিদরা হাসৌনার কথা ধরা যাক। ২০২৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ গাজায় আশ্রয় নেওয়া একটি বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সে নিহত হয়। তার গল্প হাজারো শিশুর গল্পের প্রতিচ্ছবি।

আরও পড়ুন

প্রায় ৩০০ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও নাগরিক প্রতিবেদক এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্ববাসী সরাসরি দেখছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অস্ত্র, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং জাতিসংঘে ভেটো সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতির সমালোচনা থাকলেও গাজায় যে বিপর্যয় চলছে, তার পরিসর সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরে জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত চলা এক মাসের ফুটবল উৎসব কি চলতে পারে, যখন একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে বৃহৎ পরিসরে বেসামরিক ধ্বংসযজ্ঞকে সমর্থন দিচ্ছে।

আফ্রিকার রাজনৈতিক স্মৃতি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করতে পারে। আবার সরে দাঁড়ানো সেই চিত্র ভেঙেও দিতে পারে। যদি মরক্কো, সেনেগাল, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর, আইভরি কোস্ট, ঘানা, কেপ ভার্দে ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলো সমন্বিতভাবে সরে দাঁড়ায়, তবে তার প্রভাব হবে তাৎক্ষণিক। টুর্নামেন্টের বৈশ্বিক অন্তর্ভুক্তির দাবি দুর্বল হবে। করপোরেট পৃষ্ঠপোষকদেরও জবাব দিতে হবে।

বর্জন কখনো সরাসরি যুদ্ধ থামিয়ে দেয় না, তবে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে শান্তিতে পুরস্কার দেন। এতে ফিফার নিরপেক্ষতার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়াই একটি নৈতিক অবস্থান। এতে গাজার ট্র্যাজেডি সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে না; কিন্তু এটি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সামরিক অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করবে। হেস্টিংস ও সিদরার মতো শিশুদের স্মৃতিকে সম্মান জানাবে।

ইতিহাস অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষদের মনে রাখে। নীরব থাকা মানুষদের দায়ও ইতিহাস ভুলে যায় না। গাজা সিটি, রাফা, খান ইউনিস, জেনিন ও হেবরনের বাস্তবতা উপেক্ষা করে যদি আফ্রিকান দলগুলো ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেয়, তবে তা ঔপনিবেশিক শক্তির কাঠামোকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। ফুটবল খেলা শহীদ শিশুদের কবরের ওপর থেকে পারে না। আফ্রিকাকে ২০২৬ বিশ্বকাপ বর্জন করতেই হবে।

  • তাফি এমহাকা আফ্রিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার

    আলজাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত