এক আপসহীন মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়

খালেদা জিয়ার জানাজা উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা হয়ে ওঠে লোকারণ্য

বাংলাদেশের আকাশ কদিন ধরেই ধূসর। চার–পাঁচ দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। যেন প্রকৃতিও জানে বড় কোনো বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে। এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। কোনার বেডে শুয়ে থাকা খালেদা জিয়াকে ঘিরে আলো–আঁধারির এক অপার্থিব পবিত্রতা জুড়ে আছে। শৈশব থেকে প্রৌঢ় পর্যন্ত বিস্তৃত জীবনের অসংখ্য স্মৃতি যেন শেষবারের মতো প্রকাশিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অস্থির। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো সকাল থেকেই বারবার এলোমেলো হয়ে উঠছে। অ্যালার্মের শব্দ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সময়ের সীমা টেনে দিচ্ছে। শীতের তীব্রতায় অসাড় হয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলোও বুঝে উঠতে পারছে না, কত মর্মান্তিক এক সত্য নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে।

দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ীর তৈয়বা ভিলার সামনের ছোট্ট সবুজ লনে এক্কাদোক্কা খেলতে থাকা সেই কিশোরী পুতুল আজ জীবনের আটটি দশক পার করে নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছেন আইসিইউর বিছানায়। দিনাজপুরে কর্মরত কেতাদুরস্ত ক্যাপ্টেন জিয়ার চোখে তিনি এমন গভীরভাবে ধরা দেবেন, তা তখন কেউ কল্পনাও করেনি। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই লাল বেনারসিতে বন্দী হয়ে যায় তাঁর জীবন। রাজনীতি নয়, ক্ষমতা নয়, ইতিহাসের নির্মম দায়ই যেন তাঁকে বেছে নিয়েছিল।

১৯৬৫ সালে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধের অর্থ বা কারণ পুরোপুরি না বুঝলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কোয়ার্টারে পুরো সময়টা একাকী কাটিয়েছেন যুদ্ধে যাওয়া স্বামীর মঙ্গল কামনায়। রাশভারী, স্বল্পভাষী সেই মানুষটি ভালোবাসার উচ্চারণে প্রগলভ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর নীরবতায় ছিল গভীর মমতা আর আস্থার নিরাপত্তা। সংসারে ছিল না কোনো বাহুল্য কিংবা প্রাচুর্যের ছোঁয়া। ছিল সততা, শৃঙ্খলা আর দায়বদ্ধতার নিরাভরণ গর্ব।

দিনাজপুরের ছোট্ট বাড়িটি বারবার হাতছানি দিত দূর থেকে। আকাঙ্ক্ষার বদলির খবরে হঠাৎই জন্মভূমিতে ফেরা। তত দিনে কোলজুড়ে তারেক, আদরের পিনো, আর পরপরই আরাফাত। দুটি নামই বাবার দেওয়া। একাত্তরের শুরুতে সবাই তখন চট্টগ্রামে। দেশজুড়ে আন্দোলনের উত্তাল সময়। বাড়ির ভেতরের বাতাসও থমথমে। ২৫ মার্চ বিকেলে স্বামীর ইউনিটের এক সৈনিক হন্তদন্ত হয়ে এসে জানান, পাকিস্তানি অফিসাররা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সব অস্ত্র নিয়ে যেতে এসেছেন। যিনি কোনো দিন সামরিক বিষয়ে কথা বলেননি, সেই খালেদা জিয়া হঠাৎ নিজের অজান্তেই বলে ফেলেছিলেন, স্যারকে না বলে ওগুলো দেবেন না। সেই একটি বাক্য ইতিহাসের ধারায় ক্ষুদ্র হলেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে রয়ে গেছে।

সেই রাতে স্বামী আর ঘরে ফেরেননি। খবর আসে, সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরীহ মানুষের ওপর। রেজিমেন্টে বিদ্রোহ হয়েছে। নেতৃত্বে তাঁরই স্বামী। পরদিন রেডিওতে ভেসে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। অকল্পনীয় গর্বের সঙ্গে সঙ্গে ভয় আর আতঙ্কে শিউরে উঠেছিলেন তিনি। পরাজয় মানেই নিশ্চিত মৃত্যু, এই বাস্তবতা তখন স্পষ্ট। তারেক আর আরাফাত গভীর ঘুমে। মাসের শেষ, হাতে অর্থ নেই। খবর আসছিল কালুরঘাটে যুদ্ধ চলছে। সেদিনই তিনি বুঝে নিয়েছিলেন, দেশ স্বাধীন না হলে স্বামীর আর ফেরা হবে না।

শুরু হলো গন্তব্যহীন অজানা যাত্রা। আজ এখানে, কাল অন্য কোথাও। উদ্বাস্তু জীবনের সেই দিনগুলোয় সময়ের কোনো মানে ছিল না। জুলাইয়ে পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়লেন দুই শিশুপুত্রসহ। ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী থাকলেন ডিসেম্বরের বিজয় পর্যন্ত। ১৬ ডিসেম্বর এল বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয়। ঘরে ফিরলেন জেড ফোর্স অধিনায়ক জিয়া। ৯ মাসের কষ্টের কথা বলার বা শোনার অবকাশ তখন কারও ছিল না। যুদ্ধের বীরত্বগাথাও শোনা হয়নি তাঁর নিজের কণ্ঠে।

যোগ্যতা আর প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও সেনাপ্রধান না হওয়ার কোনো আক্ষেপ কখনো শুনতে পাননি স্বামীর মুখে। কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় এলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধানের স্ত্রী হয়ে। সময় গড়াতে গড়াতে দেশ তখন দুর্ভিক্ষ আর অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত। ১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর দেশকে দাঁড় করায় নতুন এক ভয়াবহ মোড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো পরিবার গৃহবন্দী হলো। বিচ্ছিন্ন এক অন্ধকার সময়। তারপর হঠাৎই সৈনিকদের উল্লাসে আবার দৃশ্যপট বদলে গেল। একাত্তরের মতো আরেক সন্ধিক্ষণে জাতির নেতৃত্বে উঠে এলেন জিয়াউর রহমান। প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হয়েও খালেদা জিয়া ছিলেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। সংসার আর সন্তানই ছিল তাঁর প্রধান জগৎ। রাষ্ট্রপতির খাবার টেবিলে থাকত রেশনের মোটা চাল, ডাল আর ছোট মাছ। ছেলেরা বাবার পুরোনো শার্ট–প্যান্ট নিজেদের মাপে মানিয়ে নিত। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে জনসমক্ষে গেলেও সলজ্জ নিরাভরণ সেই সৌন্দর্য সব আড়ম্বর ছাপিয়ে যেত।

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হলেন জিয়া। সেই রাতেই তাঁর জীবনের মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। শুরু হয় এক দীর্ঘ একাকী পথচলা। বিপর্যস্ত বিএনপি, এরশাদের ক্ষমতা দখল, দলের শীর্ষ নেতাদের একে একে সরে যাওয়া। এই অনিশ্চয়তার ভিড়ে নেতা–কর্মীদের চাপ উপেক্ষা করতে পারেননি তিনি। রাজনীতির হাল ধরলেন এক অনভিজ্ঞ গৃহবধূ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে দাঁড়ালেন কর্মীদের কাতারে। পুলিশের লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার আর নির্যাতন কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। আপসহীন শব্দটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠল তাঁর নামের সমার্থক।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে এল অভূতপূর্ব বিজয়। জীবনে প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনেই জয়। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১৮টি আসনের প্রতিটিতেই বিজয়। ক্ষমতায় এসেও রাষ্ট্রপতি শাসনের সহজ পথ বেছে নেননি। সংসদীয় ব্যবস্থাকেই গ্রহণ করেছিলেন নীতির প্রশ্নে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। অবাধ নির্বাচনের পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে পদত্যাগ করেন। মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করে নারীশিক্ষায় নতুন দিগন্ত খুলে দেন।

এরপর আসে এক–এগারোর অন্ধকার সময়। দল ভেঙে পড়ে, তিনি কারাবন্দী হন। সন্তানদের ওপর চালানো নির্যাতনের নীরব সাক্ষী হন। মাকে হারান, জ্যেষ্ঠ পুত্র নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। ২০১০ সালে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, ২০১৮ সালে সাজানো মামলায় কারাবাস। সুস্থ মানুষ কারাগারে গিয়ে ফিরে আসেন লিভারে দুরারোগ্য রোগ নিয়ে। দীর্ঘ চিকিৎসা বঞ্চনা আর অবমাননার পর স্বৈরাচারের পতনে মুক্ত হন তিনি। বিদেশে চিকিৎসা, পুত্রসান্নিধ্য, দেশে ফেরা—সবকিছুই হয় দেরিতে। ডিসেম্বরের কুয়াশাঘেরা ভোরে আইসিইউতে ফজরের আজান ভেসে আসে। শক্ত করে ধরা পুত্রের হাতের স্পর্শ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। ইতিহাস দিয়ে এই বিদায়ের পরিমাপ অসম্ভব। রাজনীতি, ত্যাগ আর আপসহীনতার এক জীবন্ত মহাকাব্য এখানে সমাপ্ত হয়। মা আমাদের, তোমার ঋণ শোধ আমাদের সাধ্যাতীত। রইল শুধু উজাড় করা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল

*মতামত লেখকের নিজস্ব